
লন্ডনের ৩২টি বারাতে মেয়র থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা মূলত আনুষ্ঠানিক। তারা ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও চেইন পরিধান করে বিভিন্ন নাগরিক অনুষ্ঠানে অংশ নেন এবং তাদের দায়িত্ব সীমিত থাকে সম্মানসূচক কর্মকাণ্ডে। তবে নির্বাচিত মেয়রের ক্ষমতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। একজন নির্বাচিত মেয়র সংশ্লিষ্ট বারার রাজনৈতিক নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং বাস্তব প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করেন।
নির্বাচিত মেয়র জনগণের ভোটে নিজস্ব ম্যানিফেস্টোর ভিত্তিতে নির্বাচিত হন এবং একটি কেবিনেট গঠন করেন, যেখানে নির্বাচিত কাউন্সিলরদের বিভিন্ন দপ্তরের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর মধ্যে থাকে অর্থ, কমিউনিটি নিরাপত্তা ও শিশু সেবা খাতসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ। পাশাপাশি মেয়রের নিয়ন্ত্রণে থাকে স্থানীয় প্রশাসনের মূল খাতসমূহ, যেমন আবাসন, নগর পুনর্গঠন, সাশ্রয়ী বাসস্থানের লক্ষ্য নির্ধারণ, পরিকল্পনা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। সাধারণত মেয়র ও কাউন্সিল নির্বাচন একই সময়ে অনুষ্ঠিত হয়।
অন্যদিকে, সমগ্র লন্ডনের জন্য পৃথক একজন মেয়র থাকেন, যিনি পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, পরিবহন ব্যবস্থা এবং শহরের সার্বিক কৌশলগত বিষয়গুলো পরিচালনা করেন, যা সব বারার ওপর প্রভাব বিস্তার করে।
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাজ্যের বাংলাদেশি-অধ্যুষিত টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের আসন্ন মেয়র নির্বাচন ঘিরে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। আগামী ৭ মে অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচনে সিলেট বংশোদ্ভূত চারজন প্রার্থী মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন।
বর্তমান মেয়র ও অ্যাসপায়ার পার্টির প্রার্থী লুৎফুর রহমান, যিনি সিলেটের সন্তান এবং পেশায় সলিসিটর, ইতোমধ্যে টাওয়ার হ্যামলেটসের নির্বাচিত নির্বাহী মেয়র হিসেবে তিন দফা দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি এবারের নির্বাচনে উন্নয়ন কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং স্থিতিশীল প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে ভোটারদের সামনে হাজির হয়েছেন।
লেবার পার্টির প্রার্থী সিরাজুল ইসলাম, টানা সাতবারের নির্বাচিত কাউন্সিলর এবং দীর্ঘ তিন দশকের অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ, এ নির্বাচনে লুৎফুর রহমানের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। তিনি নির্বাচিত হলে আবাসন সংকট মোকাবিলায় পাঁচ হাজার নতুন ঘর নির্মাণের অঙ্গীকার করেছেন।
স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার জামি আলী, যিনি সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরের সন্তান, প্রশাসনে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি ক্ষমতায় গেলে প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে ব্যয়ের একটি স্বাধীন অডিট পরিচালনার ঘোষণা দিয়েছেন।
লিবারেল ডেমোক্র্যাটসের প্রার্থী মোহাম্মদ আবদুল হান্নান, মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার সন্তান এবং পেশায় ইঞ্জিনিয়ার ও ব্যবসায়ী, উন্নয়ন ও সুশাসনের অঙ্গীকার নিয়ে নির্বাচনী লড়াইয়ে অংশ নিয়েছেন।
এদিকে পূর্ব লন্ডনের নিউহাম কাউন্সিলেও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থীর অংশগ্রহণ নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সেখানে লেবার পার্টির মনোনয়ন পেয়েছেন ফরহাদ হোসেন, যিনি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। নিউহামের ইতিহাসে তিনিই প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থী যিনি লেবার পার্টির মনোনয়ন পেয়েছেন।
আগামী ৭ মে অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচনে তিনি কনজারভেটিভ, গ্রীন, লিবারেল ডেমোক্র্যাটসহ মোট সাতজন প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। বহুজাতিক এই বারাতে দুই শতাধিক ভাষাভাষীর মানুষ বসবাস করে, যার মধ্যে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বাসিন্দা রয়েছে, যা স্থানীয় জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ।
সব মিলিয়ে টাওয়ার হ্যামলেটস ও নিউহামের আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশি কমিউনিটিতে রাজনৈতিক উত্তাপ ও আগ্রহ এখন তুঙ্গে পৌঁছেছে।