লন্ডন

কঠোর বিধিনিষেধেও লন্ডনে কমছে না সড়ক দুর্ঘটনা, চাপে মেয়র সাদিক খান

15579_321

লন্ডনের রাস্তায় দুর্ঘটনা ও গুরুতর আহতের সংখ্যা কমাতে ব্যর্থ হওয়ায় নতুন করে সমালোচনার মুখে পড়েছেন লন্ডনের মেয়র সাদিক খান। চালকদের জন্য কঠোর বিধিনিষেধ, জরিমানা এবং গতি সীমা কমানোর মতো পদক্ষেপ নেওয়ার পরও রাজধানীর সড়কগুলোতে গুরুতর দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়েছে বলে জানিয়েছে ট্রান্সপোর্ট ফর লন্ডন (টিএফএল)।

সম্প্রতি প্রকাশিত টিএফএলের তথ্যে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে গুরুতর আহতের সংখ্যা আট শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালে যেখানে গুরুতর আহতের সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৫৯৭, সেখানে ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৯০০-তে।

এই পরিসংখ্যান প্রকাশের পর প্রশ্ন উঠেছে, লন্ডনের বিভিন্ন সড়কে গতি সীমা কমানো, রাস্তার নকশা পরিবর্তন এবং অন্যান্য বিধিনিষেধ আদৌ সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে কি না।

তবে প্রতিবেদনে কিছু ইতিবাচক দিকও উঠে এসেছে। গত বছরে লন্ডনের সড়কে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ১৩ শতাংশ কমেছে। ২০২৪ সালে যেখানে সড়ক দুর্ঘটনায় ১১০ জন নিহত হয়েছিলেন, সেখানে ২০২৫ সালে নিহতের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৯৬ জনে।

টিএফএল জানিয়েছে, সড়কে মৃত্যু ও গুরুতর আহত কমাতে আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। মেয়র সাদিক খানের ‘ভিশন জিরো’ পরিকল্পনার আওতায় রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০ মাইল প্রতি ঘণ্টা গতি সীমা সম্প্রসারণ, ব্যস্ত সড়ক ও হাই স্ট্রিট পুনর্গঠন এবং বিপজ্জনক ড্রাইভিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি।

সংস্থাটি দাবি করেছে, ২০১৫ সাল থেকে এই কর্মসূচির ফলে আনুমানিক ২৬২টি প্রাণহানি রোধ করা সম্ভব হয়েছে। তবে নতুন তথ্য অনুযায়ী, পথচারী, সাইকেল আরোহী এবং মোটরসাইকেল চালকেরাই এখনও সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।

২০২৫ সালে লন্ডনে ছয়জন সাইকেল আরোহী নিহত হয়েছেন। যদিও একই সময়ে রাজধানীতে সাইকেল ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। টিএফএলের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর প্রতিদিন প্রায় ১৫ লাখ সাইকেল যাত্রা হয়েছে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ১২ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি।

টিএফএল বলছে, সাইকেল আরোহীদের মৃত্যুঝুঁকি সামগ্রিকভাবে কমেছে। ২০১০ থেকে ২০১৪ সালের তুলনায় প্রতি ১০ লাখ সাইকেল যাত্রায় হতাহতের হার ২৭ শতাংশ কমেছে।

সক্রিয় যাতায়াতকে উৎসাহ দিতে রাজধানীতে সাইকেল নেটওয়ার্কও সম্প্রসারণ করা হয়েছে। ২০১৬ সালে যেখানে সাইকেল নেটওয়ার্কের দৈর্ঘ্য ছিল ৯০ কিলোমিটার, সেখানে ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৪৪১ কিলোমিটারের বেশি হয়েছে।

তবে সব পরিবর্তনের পরও মারাত্মক ও প্রাণঘাতী দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি জড়িত ছিল ব্যক্তিগত গাড়ি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত গতি এখনও লন্ডনের সড়কে সবচেয়ে বড় ঝুঁকির একটি এবং প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার ৫৭ শতাংশের পেছনে দ্রুতগতিকে দায়ী করা হয়েছে।

বর্তমানে রাজধানীতে টিএফএলের নিয়ন্ত্রণাধীন ২৫০ কিলোমিটারের বেশি সড়কে ২০ মাইল প্রতি ঘণ্টা গতি সীমা কার্যকর রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে আরও অন্তত ৬৫ কিলোমিটার সড়কে এই সীমা কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রতিবেদনে ডেলিভারি ও পরিবহন খাতে কর্মরত চালকদের বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, সময়ের চাপ, দীর্ঘ দূরত্বে যাতায়াত, মোবাইল অ্যাপের বিভ্রান্তি এবং ব্যস্ত নগর সড়কে চলাচল দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়।

টিএফএলের হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে লন্ডনের সড়কে নিহত বা গুরুতর আহতদের প্রায় ৪৫ শতাংশ কোনো না কোনো কর্মরত চালক বা রাইডারের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িত ছিলেন। প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১ হাজার ৭০০ মানুষ এ ধরনের দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, যার মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৪৫০ জন সাধারণ নাগরিক।

টিএফএলের প্রধান সেফটি, হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট কর্মকর্তা লিলি ম্যাটসন বলেন, “আমাদের সড়কে প্রতিটি মৃত্যু বা গুরুতর আঘাতই অগ্রহণযোগ্য। ২০২৫ সালে নিহত ৯৬ জনের পরিবার ও স্বজনদের প্রতি আমরা গভীর সমবেদনা জানাই।”

তিনি আরও বলেন, “মৃত্যুর হার ইতিহাসের অন্যতম নিম্ন পর্যায়ে নেমে আসা ইতিবাচক হলেও গুরুতর আহতের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।”

তবে এই পরিস্থিতির মধ্যেও ২০৪১ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় সব ধরনের প্রাণহানি শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে ‘ভিশন জিরো’ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে জানান তিনি।

লিলি ম্যাটসন বলেন, “বরো কাউন্সিল, পুলিশ ও স্থানীয় কমিউনিটির সঙ্গে সমন্বয় করে আমরা নতুন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি, যাতে সড়কের ঝুঁকি কমানো, গতি নিয়ন্ত্রণ এবং রাজধানীর সব মানুষের জন্য আরও নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা যায়।”

সর্বাধিক পঠিত


ভিডিও