
গ্রীষ্মকাল মানেই দীর্ঘ দিন, উষ্ণ সন্ধ্যা এবং বাইরে সময় কাটানোর আনন্দ। তবে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বেড়ে গেলে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। আবহাওয়া পূর্বাভাসে চলতি গ্রীষ্মে তাপপ্রবাহের সম্ভাবনা বাড়ার ইঙ্গিত দেওয়ায় এখন থেকেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত গরমে মানুষের শরীরে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে হৃদ্যন্ত্র, রক্তনালি এবং ফুসফুস-সংক্রান্ত রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ওপর। স্বাভাবিক অবস্থায় শরীর ঘাম এবং ত্বকে রক্তপ্রবাহ বৃদ্ধি করে নিজেকে ঠান্ডা রাখে। কিন্তু বাইরের তাপমাত্রা যখন ত্বকের তাপমাত্রার চেয়েও বেশি হয়ে যায়, তখন ঘামই শরীর ঠান্ডা রাখার একমাত্র কার্যকর উপায়। ফলে শরীরে পানিশূন্যতা, বাতাস চলাচলের অভাব, আঁটসাঁট পোশাক, কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কিংবা ঘাম উৎপাদনে বাধা সৃষ্টি করে এমন শারীরিক সমস্যার কারণে শরীর দ্রুত অতিরিক্ত গরম হয়ে যেতে পারে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, উচ্চ তাপমাত্রা শুধু বয়স্ক বা অসুস্থদের নয়, যে কাউকেই আক্রান্ত করতে পারে। তাপজনিত অবসাদ (হিট এক্সহস্টশন) এবং হিটস্ট্রোক উভয়ই গুরুতর এবং প্রাণঘাতী হতে পারে। তাই এসব অবস্থার লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং প্রয়োজনে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
গরমের সময় পরিবারের বয়স্ক সদস্য, প্রতিবেশী, বন্ধু কিংবা যাদের অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি বেশি, তাদের খোঁজখবর রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে যারা নিজেরাও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছেন, তাদেরও প্রয়োজনে অন্যদের সহযোগিতা নিতে বলা হয়েছে।
তীব্র গরমে সুস্থ থাকতে বিশেষজ্ঞরা দুপুর ১১টা থেকে বিকেল ৩টার মধ্যে অপ্রয়োজনীয়ভাবে রোদে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। বাইরে বের হলে উচ্চমাত্রার সানস্ক্রিন ব্যবহার, প্রশস্ত কিনারাযুক্ত টুপি পরা এবং ছায়াযুক্ত স্থানে থাকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দিনের বেলায় রোদ পড়ে এমন কক্ষের জানালা ও পর্দা বন্ধ রাখা এবং রাতে বাইরের বাতাস ঠান্ডা হলে জানালা খুলে ঘরের ভেতরে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম এড়িয়ে চলা, প্রয়োজনে সকাল বা সন্ধ্যায় ব্যায়াম বা অন্যান্য কাজ করা, দীর্ঘ সময় গরম ও বন্ধ জায়গায় অবস্থান না করা এবং বিশেষ করে পার্ক করা গাড়ির ভেতরে না থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। ঢিলেঢালা, হালকা রঙের এবং সুতি বা লিনেনের মতো প্রাকৃতিক কাপড়ের পোশাক পরার পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি পান করতে বলা হয়েছে। অতিরিক্ত ঘাম হলে শরীরের লবণ ও খনিজের ভারসাম্য বজায় রাখতে প্রয়োজনে রিহাইড্রেশন পানীয় গ্রহণেরও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ক্যাফেইন ও অ্যালকোহলজাতীয় পানীয় সীমিত রাখার কথা বলা হয়েছে, কারণ এগুলো শরীরে পানিশূন্যতা বাড়াতে পারে।
গরম থেকে স্বস্তি পেতে ঠান্ডা পানি দিয়ে শরীর মুছে নেওয়া, ত্বকে পানি স্প্রে করা কিংবা কাপড়ে মোড়ানো ঠান্ডা প্যাক ঘাড় বা বগলের নিচে ব্যবহার করা যেতে পারে। অপ্রয়োজনীয় টেলিভিশন, ল্যাপটপ, চার্জারসহ বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি বন্ধ রাখলেও ঘরের তাপমাত্রা কিছুটা কম রাখা সম্ভব।
আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, চলতি গ্রীষ্মে যুক্তরাজ্যে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি গরম পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও এর অর্থ এই নয় যে পুরো মৌসুমজুড়ে শুধু গরমই থাকবে; মাঝেমধ্যে বৃষ্টি ও পরিবর্তনশীল আবহাওয়াও দেখা যেতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তাপপ্রবাহ আরও তীব্র, দীর্ঘস্থায়ী এবং ঘন ঘন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাপমাত্রা খুব বেশি না হলেও স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা থাকলে আগাম ‘হিট হেলথ অ্যালার্ট’ জারি করা হয়। হলুদ, অ্যাম্বার ও লাল—এই তিনটি স্তরে প্রকাশিত এসব সতর্কবার্তার উদ্দেশ্য হলো ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে আগেভাগে সতর্ক করা। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি, শিশু এবং আগে থেকেই বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত মানুষের জন্য অপেক্ষাকৃত কম তাপমাত্রাও বিপজ্জনক হতে পারে।
এদিকে বিশেষজ্ঞরা ‘থান্ডারস্টর্ম অ্যাজমা’ নিয়েও সতর্ক করেছেন। তাদের মতে, বজ্রঝড়ের সময় প্রবল বাতাসে পরাগরেণু ও ছত্রাকের স্পোর বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এবং বৃষ্টির মাধ্যমে ক্ষুদ্র কণায় ভেঙে শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে প্রবেশ করতে পারে। এতে হাঁপানি বা অ্যালার্জিজনিত শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি বেড়ে যায়। যাদের হাঁপানি বা হে ফিভার রয়েছে, তাদের এ সময় বিশেষ সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, তীব্র গরমে নিজের পাশাপাশি আশপাশের ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের খোঁজখবর নেওয়া এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে অনেক প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব। সময়মতো সতর্কবার্তা অনুসরণ এবং সাধারণ কিছু স্বাস্থ্যসচেতনতা মেনে চললেই গ্রীষ্মকাল নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক হয়ে উঠতে পারে।