
টানা দুই বিশ্বকাপে বেশ কয়েকটি রেফারিং সিদ্ধান্ত আর্জেন্টিনার পক্ষে গেছে বলে দাবিতে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কাতারে পাঁচটি পেনাল্টি পাওয়া থেকে শুরু করে এবার আলজেরিয়া ও মিশরের অভিযোগ, এমনকি সুইজারল্যান্ডের ব্রিল এম্বোলোর দ্বিতীয় হলুদ কার্ড, সব মিলিয়ে আর্জেন্টিনাকে ঘিরে প্রশ্ন তুলেছেন অনেক সমর্থক ও বিশ্লেষক।
অনেকের প্রশ্ন ফিফা কী আর্জেন্টিনাকে সুবিধা দিচ্ছে। আজ সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালের পর বিতর্ক আরও জোরালো হয়।
ম্যাচে সুইজারল্যান্ড সমতায় ফেরার পাঁচ মিনিট পর ভিএআরের সহায়তায় লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে দেখানো হলুদ কার্ড বাতিল করে ব্রিল এম্বোলোকে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখান রেফারি। ১০ জনের দলে পরিণত হওয়ার পরও সুইজারল্যান্ড অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যায়, তবে শেষ পর্যন্ত ৩-১ ব্যবধানে হারে।
তবে এসব বিতর্ক থাকলেও, প্রতিটি সিদ্ধান্তই যে ভুল ছিল বা এর মাধ্যমে কোনো ষড়যন্ত্রের প্রমাণ মেলে—এমনটি নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। বরং এসব ঘটনাকে ঘিরেই আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নিচে দুই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ম্যাচে কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্ত তুলে ধরা হলো:
কাতার বিশ্বকাপে সাত ম্যাচে রেকর্ড ৫ পেনাল্টি
২০২২ বিশ্বকাপে শিরোপা জয়ের পথে সৌদি আরব, পোল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, ক্রোয়েশিয়া ও ফ্রান্সের বিপক্ষে মোট পাঁচটি পেনাল্টি পেয়েছিল আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপের এক আসরে এর আগে কোনো দল এত বেশি পেনাল্টি পায়নি। কয়েকটি সিদ্ধান্ত স্পষ্ট হলেও প্রায় প্রতিটি পেনাল্টিই ‘সফট কনটাক্ট’ বা রেফারিং নিয়ে বিতর্ক তৈরি করেছিল।
সৌদি আরব ম্যাচ: পারেদেসকে ধরে রাখার ঘটনায় পেনাল্টি
উদ্বোধনী ম্যাচে কর্নারের সময় সৌদি ডিফেন্ডার সৌদ আবদুল হামিদ বক্সে লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে ধরে রাখেন। রেফারি প্রথমে ঘটনাটি দেখেননি। পরে ভিএআরের পরামর্শে মনিটরে দেখে পেনাল্টি দেন এবং ১০ মিনিটে সেটি থেকে গোল করেন লিওনেল মেসি।
যোগাযোগ (কন্ট্যাক্ট) থাকলেও বলটি অন্যদিকে যাচ্ছিল এবং সেট-পিসে এ ধরনের ধস্তাধস্তি প্রায়ই একাধিক খেলোয়াড়ের মধ্যে দেখা যায়। তাই অনেকেই সিদ্ধান্তটিকে অত্যন্ত কঠোর বলে আখ্যা দেন। যদিও শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা ম্যাচটি ২-১ ব্যবধানে হেরে যায়।
পোল্যান্ড ম্যাচ: শেচনির গ্লাভসের স্পর্শে পেনাল্টি
পোল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার গ্রুপ পর্বের ম্যাচে ৩৬ মিনিটে গোলরক্ষক ভয়চেখ শেচনি বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে মেসির মুখে হালকা স্পর্শ করেন। রেফারি ড্যানি ম্যাকেলি প্রথমে খেলা চালিয়ে দিলেও ভিএআর পর্যালোচনার পর পেনাল্টি দেন। অনেক বিশ্লেষক এটিকে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে ‘সফট’ পেনাল্টিগুলোর একটি বলেন। পরে শেচনি মেসির শট ঠেকিয়ে দেন।
নেদারল্যান্ডস ম্যাচ: আকুনিয়ার পেনাল্টি ও মেসির হ্যান্ডবল
মার্কোস আকুনিয়ার ওপর ডেনজেল ডামফ্রিসের চ্যালেঞ্জে রেফারি পেনাল্টি দেন এবং ভিএআরও সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। পাঁচ পেনাল্টির মধ্যে এটি তুলনামূলক কম বিতর্কিত হলেও স্পর্শের মাত্রা ও ঘটনার অবস্থান নিয়ে আলোচনা হয়েছিল।
একই ম্যাচে মেসি ইচ্ছাকৃতভাবে হাতে বল স্পর্শ করলেও হলুদ কার্ড পাননি। পরে প্রতিবাদের কারণে হলুদ কার্ড দেখেন। অনেকের মতে, হ্যান্ডবলের জন্যও কার্ড পেলে সেটিই হতো তার দ্বিতীয় হলুদ।
পারেদেসের ট্যাকল ও ডাচ বেঞ্চে বল মারা
নির্ধারিত সময়ের শেষ দিকে নাথান আকেকে কঠোর ট্যাকল করার পর পারেদেস রেফারির বাঁশি বাজার পর ডাচ বেঞ্চের দিকে জোরে বল মারেন। এতে দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু তিনি মাত্র একটি হলুদ কার্ড পান। অনেকের মতে, তাকে সরাসরি লাল কার্ড অথবা পরপর দুটি হলুদ কার্ড দেওয়া উচিত ছিল।
ক্রোয়েশিয়া ও ফ্রান্স ম্যাচের বিতর্ক
ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে হুলিয়ান আলভারেজ ও গোলরক্ষক ডমিনিক লিভাকোভিচের ধাক্কাধাক্কিতে দেওয়া পেনাল্টি নিয়ে মতভেদ ছিল। কেউ বলেন গোলরক্ষক বাধা দিয়েছেন, আবার কেউ বলেন আলভারেজই গোলরক্ষকের সঙ্গে ধাক্কা খান। ভিএআর রিভিউ না হওয়াও বিতর্ক তৈরি করে।
ফাইনালে উসমান দেম্বেলের স্পর্শে আনহেল দি মারিয়ার পড়ে যাওয়ার ঘটনায় দেওয়া পেনাল্টি নিয়মসঙ্গত হলেও ‘সফট’ বলে অভিহিত করা হয়। অন্যদিকে মার্কাস থুরামের ক্ষেত্রে পেনাল্টির বদলে সিমুলেশনের জন্য হলুদ কার্ড দেখানো হয়।
উল্লেখ্য, ‘সফট পেনাল্টি’ হলো এমন একটি বিতর্কিত পেনাল্টি যা নিয়ম অনুযায়ী সঠিক হলেও, আদতে ফাউলটি খুব সামান্য স্পর্শ বা হালকা প্রকৃতির। ফুটবলে এ ধরনের পেনাল্টি নিয়ে খেলোয়াড় ও দর্শকদের মধ্যে প্রায়শই মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ফুটবল খেলার আইন অনুযায়ী যদি কোনো খেলোয়াড় অসতর্ক বা বেপরোয়াভাবে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ডি-বক্সের ভেতরে ফাউল করে, তবে রেফারি পেনাল্টি প্রদান করেন। তবে যখন কোনো ফাউল খুব হালকা হয় বা বিপক্ষের খেলোয়াড়ের সামান্য ধাক্কায় বা স্পর্শে পড়ে গিয়ে পেনাল্টি আদায় করার চেষ্টা করে, তখন তাকে ‘সফট পেনাল্টি’ বলা হয়।
মেসির গোলের সময় বদলি খেলোয়াড় ও মার্তিনেজের আচরণ
অতিরিক্ত সময়ে মেসির গোলের সময় আর্জেন্টিনার অন্তত দুই বদলি খেলোয়াড়কে মাঠে ঢুকে উদ্যাপন করতে দেখা যায়। পরে আইএফএবি নিয়মে স্পষ্ট করা হয়, খেলায় প্রভাব না ফেললে এমন ঘটনায় গোল বাতিল হবে না।
টাইব্রেকারে গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজের মনস্তাত্ত্বিক কৌশল নিয়েও সমালোচনা হয়। পরবর্তীতে ফিফা এমন আচরণ নিষিদ্ধ করে।
২০২৬ বিশ্বকাপ: নতুন বিতর্ক
আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে আইসা মান্দির পায়ের পেছনে মেসির ‘স্ট্যাম্প’ করার ঘটনায় কোনো কার্ড না দেখানোয় আলজেরিয়া ফিফার কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করে।
অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে প্রথম গোলের আগে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের ফাউল ভিএআর পর্যালোচনা না করায় সাবেক ডেনিশ গোলরক্ষক পিটার স্মাইকেল এটিকে স্পষ্ট ভুল বলে মন্তব্য করেন।
কেপ ভার্দের বিপক্ষে দ্রুত ফ্রি-কিক নেওয়ার চেষ্টা নিয়েও বিতর্ক হয়। যদিও রেফারি বাঁশির নির্দেশ না দিলে দ্রুত খেলা শুরু করা নিয়মসিদ্ধ।
মিশরের বিপক্ষে গোল বাতিলের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত
মিশরের বিপক্ষে মোস্তফা জিজোর একটি গোল দীর্ঘ ভিএআর পর্যালোচনার পর বাতিল করা হয়। আক্রমণ শুরুর অনেক আগের একটি ফাউলের কারণে গোলটি বাতিল হওয়ায় মিশর ফুটবল ফেডারেশন আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানায়। তবে ফিফার রেফারিং প্রধান পিয়েরলুইজি কলিনা বলেন, ভিএআর প্রোটোকল অনুযায়ী সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিল।
সুইজারল্যান্ড ম্যাচ: এম্বোলোর দ্বিতীয় হলুদ
৬৭ মিনিটে সুইজারল্যান্ড সমতায় ফেরার পর পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ব্রিল এম্বোলো পারেদেসের ট্যাকলে পড়ে যান। রেফারি প্রথমে পারেদেসকে হলুদ কার্ড দেখান। পরে ভিএআর ‘মিসটেকেন আইডেন্টিটি’ পর্যালোচনার সুপারিশ করে। রিপ্লেতে দেখা যায়, ধাক্কা লাগার আগেই এম্বোলো পড়ে যেতে শুরু করেছিলেন। এরপর পারেদেসের হলুদ কার্ড বাতিল করে এম্বোলোকে সিমুলেশনের জন্য দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখানো হয় এবং তিনি মাঠ ছাড়েন।
এবারের বিশ্বকাপের আগে আইএফএবি ভিএআরের ক্ষমতা বাড়িয়ে এমন পরিস্থিতিতেও হস্তক্ষেপের সুযোগ দেয়। তবে সুইজারল্যান্ডের কোচ মুরাত ইয়াকিন এই সিদ্ধান্তকে ‘বোধগম্য নয়’ বলে মন্তব্য করেন এবং বলেন, নতুন নিয়মটি ‘খেলাটিকেই নষ্ট করেছে’। রেমো ফ্রয়লারও প্রশ্ন তোলেন, একই ধরনের আরও অনেক ট্যাকল থাকা সত্ত্বেও কেন এই ঘটনাতেই ভিএআর হস্তক্ষেপ করল।
পরে ১০ জনের দল নিয়ে সুইজারল্যান্ড নিয়মিত সময় ও অতিরিক্ত সময়ের বেশির ভাগ সময় খেললেও ১১২ মিনিটে হুলিয়ান আলভারেজ এবং পরে লাউতারো মার্তিনেজের গোলে ৩-১ ব্যবধানে জয় পায় আর্জেন্টিনা।