
বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল মানেই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মঞ্চ।
এখানে কোনো ছোট দল নেই, কোনো ছোট গল্প নেই, কোনো ছোট স্বপ্ন নেই।
আর্জেন্টিনা ও স্পেন যখন বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় ম্যাচে মুখোমুখি হবে, তখন কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর চোখ থাকবে বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের দিকে।
কিন্তু স্পেনের জার্সিতে এমন একজন খেলোয়াড় আছেন, যিনি বয়সে তরুণ হলেও আর্জেন্টিনার জন্য হয়ে উঠতে পারেন বড় চিন্তার কারণ।
তিনি লামিন ইয়ামাল।
বয়সে তরুণ। কিন্তু ফুটবল মাঠে তাঁর আত্মবিশ্বাস, দক্ষতা এবং পরিপক্বতা অনেক অভিজ্ঞ খেলোয়াড়কেও বিস্মিত করেছে।
স্পেন যখন বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় ম্যাচে নামবে, তখন তাদের অন্যতম বড় ভরসা হবে এই তরুণ প্রতিভা।
আর আর্জেন্টিনার জন্য তিনি হয়ে উঠতে পারেন সবচেয়ে বড় হুমকিগুলোর একটি।
কারণ লামিন ইয়ামালকে শুধু একজন তরুণ ফুটবলার হিসেবে দেখলে ভুল হবে।
তিনি এমন একজন খেলোয়াড়, যিনি একটি মুহূর্তেই ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারেন।
তাঁর গতি আছে।
তাঁর ড্রিবলিং আছে।
তাঁর সাহস আছে।
তাঁর পায়ে বল গেলে তিনি ভয় পান না।
সামনে যত বড় ডিফেন্ডারই থাকুক, যত বড় ম্যাচই হোক, যত বেশি চাপই থাকুক-লামিন ইয়ামাল নিজের ফুটবল খেলতে চান।
এটাই বড় খেলোয়াড়দের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
একজন খেলোয়াড়ের বয়স কেবল ক্যালেন্ডারের হিসাব।
কিন্তু প্রতিভার কোনো বয়স হয় না।
লামিন ইয়ামালের গল্প তাই শুধু একজন ফুটবলারের গল্প নয়।
এটি স্বপ্ন, সংগ্রাম, পরিচয়, পরিবার এবং অসাধারণ প্রতিভার গল্প।
লামিন ইয়ামাল স্পেনে জন্মেছেন। তাঁর বাবা মরক্কোর এবং মা ইকুয়েটোরিয়াল গিনির। তাঁর শৈশবের সময়েই বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ ঘটে।
কিন্তু জীবনের শুরুতেই পারিবারিক পরিবর্তনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেও তিনি নিজের স্বপ্ন থেকে সরে যাননি।
তাঁর জীবনে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। বিশেষ করে তাঁর দাদি ফাতিমার ভূমিকা তাঁর বেড়ে ওঠার গল্পে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
একজন তরুণের জীবন সবসময় সহজ হয় না।
কখনো পরিবারে পরিবর্তন আসে।
কখনো জীবনের বাস্তবতা কঠিন হয়।
কখনো স্বপ্নের পথে সুযোগ সীমিত থাকে।
কিন্তু জীবনের শুরু সবসময় ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না।
একজন মানুষের প্রতিভা, পরিশ্রম, মানসিক শক্তি এবং সুযোগকে কাজে লাগানোর ক্ষমতাই শেষ পর্যন্ত তাকে কোথায় নিয়ে যাবে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
লামিন ইয়ামাল সেই সত্যের একটি অসাধারণ উদাহরণ।
বার্সেলোনার বিখ্যাত লা মাসিয়া একাডেমি থেকে উঠে এসে তিনি অল্প বয়সেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল মঞ্চে জায়গা করে নিয়েছেন।
যে বয়সে অধিকাংশ তরুণ ফুটবলার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে, সেই বয়সেই লামিন ইয়ামাল বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের সঙ্গে একই মাঠে খেলেছেন।
তিনি শুধু মাঠে নামেননি।
তিনি প্রভাব তৈরি করেছেন।
তিনি ম্যাচের গতিপথ বদলেছেন।
তিনি বড় বড় দলের রক্ষণভাগকে সমস্যায় ফেলেছেন।
এখানেই তাঁর গল্পের অসাধারণত্ব।
তিনি শুধু প্রতিভাবান নন।
তিনি সাহসী।
কারণ বড় মঞ্চে খেলার জন্য শুধু পায়ে দক্ষতা থাকলেই হয় না।
প্রয়োজন মানসিক শক্তি।
প্রয়োজন চাপ সামলানোর ক্ষমতা।
প্রয়োজন ব্যর্থতার ভয়কে জয় করার সাহস।
লামিন ইয়ামালের মধ্যে সেই সাহসটি আছে।
আর তাঁর গল্পের আরেকটি দিক আমাকে ব্যক্তিগতভাবে বিশেষভাবে স্পর্শ করে।
তিনি একজন মুসলিম।
একজন মুসলিম তরুণ হিসেবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল মঞ্চে তাঁর উত্থান অনেক মানুষের জন্য অনুপ্রেরণার বিষয়।
অবশ্যই একজন মানুষের সাফল্যকে শুধু তার ধর্মীয় পরিচয়ের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায় না।
প্রতিভা, পরিশ্রম, প্রশিক্ষণ, পরিবার, সুযোগ এবং কঠোর অনুশীলন-সবকিছু মিলেই একজন খেলোয়াড় তৈরি হয়।
তবুও একজন বিশ্বাসী মানুষ হিসেবে আমরা এটাও বিশ্বাস করি, মানুষের জীবনে প্রতিভা, সুযোগ এবং সম্মান আল্লাহর পক্ষ থেকে পাওয়া এক ধরনের নিয়ামত।
সেই নিয়ামতকে কাজে লাগানো মানুষের দায়িত্ব।
লামিন ইয়ামাল যেন সেই দায়িত্বের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।
আল্লাহ কাউকে যে প্রতিভা দেন, সেটিকে পরিশ্রম, শৃঙ্খলা ও সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে পূর্ণতা দেওয়া মানুষের দায়িত্ব।
লামিন ইয়ামাল সেই পথেই এগিয়ে চলেছেন।
তাঁর জীবনের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়-জীবনের শুরু সবসময় ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না।
পারিবারিক বিচ্ছেদ, কঠিন বাস্তবতা কিংবা সাধারণ পরিবেশ কোনো কিছুই একজন মানুষের স্বপ্নকে থামিয়ে দিতে পারে না, যদি তার মধ্যে প্রতিভা, পরিশ্রম এবং এগিয়ে যাওয়ার সাহস থাকে।
আজ তিনি বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছেন।
কিন্তু তাঁর গল্পের শুরু ছিল অনেক ছোট জায়গা থেকে।
একটি স্থানীয় মাঠ।
একটি ফুটবল।
একটি স্বপ্ন।
আর সেই স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে চলা এক তরুণ।
এই কারণেই লামিন ইয়ামালের গল্প শুধু স্পেনের গল্প নয়।
এটি তাঁর মরক্কোর শিকড়েরও গল্প।
এটি তাঁর মায়ের ইকুয়েটোরিয়াল গিনির শিকড়েরও গল্প।
এটি স্পেনেরও গর্বের গল্প।
এবং বিশ্বের কোটি কোটি মুসলিম তরুণের জন্যও এটি অনুপ্রেরণার গল্প।
একজন মানুষ একই সঙ্গে একাধিক পরিচয় ধারণ করতে পারেন।
তিনি স্প্যানিশ হতে পারেন।
তাঁর শিকড় মরক্কো ও ইকুয়েটোরিয়াল গিনির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
তিনি মুসলিম হতে পারেন।
আর একই সঙ্গে বিশ্বের সেরা ফুটবলারদের একজন হয়ে উঠতে পারেন।
পরিচয় কখনো মানুষকে ছোট করে না।
বরং সঠিকভাবে ধারণ করলে পরিচয় মানুষকে আরও সমৃদ্ধ করে।
আগামীকালের বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের অন্যতম বড় অস্ত্র হতে পারেন লামিন ইয়ামাল।
আর আর্জেন্টিনার জন্য তিনি হয়ে উঠতে পারেন সবচেয়ে বড় চিন্তার কারণগুলোর একটি।
আর্জেন্টিনা জানে, লামিন ইয়ামালকে শুধু একজন তরুণ প্রতিভা হিসেবে দেখলে ভুল হবে।
তিনি এমন একজন খেলোয়াড়, যিনি একটি মুহূর্তেই ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারেন।
তাঁর প্রতিটি দৌড়, প্রতিটি ড্রিবলিং এবং প্রতিটি আক্রমণাত্মক সিদ্ধান্ত আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলতে পারে।
একজন তরুণ খেলোয়াড়ের সবচেয়ে বড় শক্তি কখনো কখনো তার নির্ভীকতাই।
সে সবসময় অতীতের ভার নিয়ে মাঠে নামে না।
সে কিংবদন্তিদের ভয় পায় না।
সে বড় ম্যাচকে বড় করে দেখে না।
সে শুধু খেলে।
লামিন ইয়ামালের মধ্যে সেই নির্ভীকতা রয়েছে।
আর্জেন্টিনার অভিজ্ঞতা আছে।
আর্জেন্টিনার ইতিহাস আছে।
আর্জেন্টিনার বড় ম্যাচ খেলার ঐতিহ্য আছে।
কিন্তু স্পেনের হাতে আছে তারুণ্যের শক্তি।
আর সেই তারুণ্যের অন্যতম প্রতীক লামিন ইয়ামাল।
ফুটবলে অবশ্য কোনো ফলাফল আগে থেকে লেখা থাকে না।
মাঠে ৯০ মিনিট খেলতে হয়।
কখনো অতিরিক্ত সময় আসে।
কখনো পেনাল্টি আসে।
কখনো প্রিয় দল জেতে, কখনো হারে।
কিন্তু কিছু গল্প ফলাফলের বাইরেও বেঁচে থাকে।
লামিন ইয়ামালের গল্প তেমনই একটি গল্প।
একজন তরুণ, যিনি বয়সের সীমা অতিক্রম করেছেন।
একজন মুসলিম, যিনি নিজের পরিচয় নিয়ে বিশ্বের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।
একজন সন্তান, যিনি জীবনের পরিবর্তিত পারিবারিক বাস্তবতার মধ্যেও নিজের স্বপ্নকে হারিয়ে ফেলেননি।
একজন ফুটবলার, যিনি প্রমাণ করেছেন-প্রতিভার কোনো বয়স হয় না।
আর একজন তরুণ, যার সামনে এখনও পুরো ফুটবল জীবন পড়ে আছে।
আগামীকাল স্পেন হয়তো বিশ্বকাপ জিতবে।
হয়তো আর্জেন্টিনা জিতবে।
কিন্তু যে ফলই হোক, লামিন ইয়ামালের গল্প ইতোমধ্যেই ফুটবল ইতিহাসের একটি বিশেষ অধ্যায় হয়ে গেছে।
আজকের এই তরুণ প্রতিভা হয়তো আগামী দিনের কিংবদন্তি।
আজ আমরা তাকে মাঠে খেলতে দেখছি।
হয়তো কয়েক বছর পর মানুষ বলবে-
আমরা সেই সময়ের সাক্ষী ছিলাম, যখন লামিন ইয়ামালের কিংবদন্তির শুরু হয়েছিল।
আর একজন মুসলিম হিসেবে, একজন ফুটবলপ্রেমী হিসেবে এবং একজন মানুষ হিসেবে আমি শুধু এটুকুই বলতে চাই-যে প্রতিভা আল্লাহ কাউকে দিয়েছেন, সেটিকে সম্মান করার সবচেয়ে সুন্দর উপায় হলো তাকে পরিশ্রম দিয়ে পূর্ণতা দেওয়া।
লামিন ইয়ামাল সেই পথেই হাঁটছেন।
আগামীকাল বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের সবচেয়ে বড় ভরসাগুলোর একজন হবেন তিনি।
কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, তিনি ইতোমধ্যেই প্রমাণ করেছেন-স্বপ্নের বয়স হয় না।
প্রতিভার বয়স হয় না।
আর বড় হয়ে ওঠার জন্য সবসময় বড় পরিবার, বড় শহর কিংবা বড় সুযোগের প্রয়োজন হয় না।
কখনো কখনো একজন তরুণের পায়ে একটি ফুটবল, চোখে একটি স্বপ্ন এবং হৃদয়ে অদম্য বিশ্বাসই যথেষ্ট।
লামিন ইয়ামাল সেই স্বপ্নেরই নাম।
– নূর আলম সিদ্দিকী রাসেল
আইনবিদ, কলামিস্ট ও বিশ্লেষক