খেলাধুলা

অভিবাসনের গল্প থেকে বিশ্বমঞ্চে ইয়ামাল-নিকোর উজ্জ্বল উত্থান

16118_IMG_8190.jpeg

নতুন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন দলের দুই তরুণ তারকা লামিন ইয়ামাল ও নিকো উইলিয়ামস শুধু মাঠের পারফরম্যান্সেই নয়, অভিবাসী পরিবারের সংগ্রাম থেকে উঠে এসে সাফল্যের শিখরে পৌঁছানোর গল্প দিয়েও আলোচনায় রয়েছেন। নিকো উইলিয়ামস ১২ জুলাই ২৪ বছরে পা দিয়েছেন, আর লামিন ইয়ামাল ১৩ জুলাই পূর্ণ করেছেন ১৯ বছর। অল্প বয়সেই তারা আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত দুটি শিরোপা—২০২৪ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ ও ২০২৬ বিশ্বকাপ—জয় করেছেন। মাঠের বাইরে ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে পরিচিত এই দুই ফুটবলারকে অনেকেই আধুনিক স্পেনের প্রতীক হিসেবে দেখেন। নেতৃত্ব ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মোইসেস রুইসের ভাষায়, তারা নতুন স্পেনের ইতিবাচক প্রতীক এবং প্রতিকূলতা জয় করে উঠে আসা দুই তরুণ।

ভালো জীবনের খোঁজে উইলিয়ামস পরিবার

নিকো ও তার বড় ভাই ইনিয়াকি উইলিয়ামসের জন্ম ও বেড়ে ওঠা স্পেনে হলেও তাদের বাবা-মা ঘানা থেকে উন্নত জীবনের আশায় ইউরোপে পাড়ি জমান। ১৯৯৪ সালে মারিয়া ও ফেলিক্স উইলিয়ামস দীর্ঘ ও কষ্টকর পথ পাড়ি দিয়ে স্পেনে পৌঁছান। যাত্রাপথে তারা সাহারা মরুভূমির অংশ হেঁটে অতিক্রম করেন।

পরবর্তীতে কারিতাসের সহায়তায় তারা বিলবাওয়ে বসবাস শুরু করেন। পরে কাজের খোঁজে পরিবারটি পাম্পলোনায় চলে যায়। সেখানে ২০০২ সালে জন্ম নেন নিকো উইলিয়ামস।

নিকো এক সাক্ষাৎকারে বলেন, তার বাবা-মা নিজেদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলেছিলেন যাতে তিনি ও তার ভাই ভালো ভবিষ্যৎ পান। তাদের সংগ্রাম, কঠোর পরিশ্রম ও আত্মত্যাগের জন্য তিনি সবসময় কৃতজ্ঞ।

পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে নিকোর বাবা দীর্ঘ সময় লন্ডনে কাজ করেন। এ সময় বড় ভাই ইনিয়াকি নিকোর দেখাশোনার দায়িত্ব নেন। স্কুলে আনা-নেওয়া থেকে শুরু করে ফুটবলার হিসেবে গড়ে ওঠার পথেও ইনিয়াকি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। দুই ভাইই পরে অ্যাথলেটিক বিলবাওয়ের হয়ে খেলেন। ইনিয়াকি পরবর্তীতে ঘানার জাতীয় দলের হয়ে খেললেও নিকো স্পেনের প্রতিনিধিত্ব করেন।

ইয়ামালের শিকড়েও অভিবাসনের গল্প

লামিন ইয়ামালের পরিবারও আফ্রিকান অভিবাসী। তার বাবা মুনির নাসরাউই মরক্কো থেকে এবং মা শেইলা এবানা ইকুয়েটোরিয়াল গিনি থেকে স্পেনে আসেন। পরিবারের প্রথম সদস্য হিসেবে তার দাদি ফাতিমা মরক্কো থেকে একাই স্পেনে পাড়ি জমান এবং কঠোর পরিশ্রম করে পরিবারের অন্য সদস্যদের সেখানে নিয়ে আসেন।

পরবর্তীতে পরিবারটি বার্সেলোনার উপকণ্ঠের শ্রমজীবী এলাকা রোকাফোন্দায় বসবাস শুরু করে। এই এলাকাকেই নিজের পরিচয়ের অংশ হিসেবে দেখেন ইয়ামাল। গোল উদযাপনের সময় তিনি প্রায়ই এলাকার পোস্টাল কোড ‘৩০৪’ আঙুল দিয়ে প্রদর্শন করেন। শৈশবেই বার্সেলোনার একাডেমি লা মাসিয়ায় সুযোগ পান ইয়ামাল। সেখানে তার প্রতিভার বিকাশ ঘটে এবং অল্প বয়সেই তিনি বার্সেলোনা ও স্পেন জাতীয় দলের ইতিহাসে একাধিক রেকর্ড গড়েন।

 

বন্ধুত্ব ও অনুপ্রেরণা

স্পেন জাতীয় দলে যোগ দেওয়ার পর থেকেই নিকো উইলিয়ামস ও লামিন ইয়ামালের মধ্যে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে প্রথমদিকে তরুণ ইয়ামালের দেখভালের দায়িত্ব নিকোর ওপর দিয়েছিলেন। সেই সম্পর্ক পরে মাঠ ও মাঠের বাইরেও আরও দৃঢ় হয়। গোল উদযাপনের নাচ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একসঙ্গে উপস্থিতি এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা তাদের বন্ধুত্বকে আরও জনপ্রিয় করে তুলেছে। নিকো নিজেও মজা করে বলেছেন, ইয়ামালকে তিনি নিজের ছোট ভাইয়ের মতোই দেখেন।

বিশ্লেষকদের মতে, নিকো উইলিয়ামস ও লামিন ইয়ামালের গল্প শুধু ফুটবলের নয়; এটি অভিবাসী পরিবারের সংগ্রাম, সুযোগের সদ্ব্যবহার, কঠোর পরিশ্রম এবং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনেরও প্রতীক।

সর্বাধিক পঠিত


ভিডিও