রাজনীতি

ওসমান হাদীকে হত্যাচেষ্টা: শুটারকে নিজেদের ’এজেন্ট’ দাবি করে ভারতীয়দের উল্লাস

13034_osman-hadi-121225-1765529449.jpg

অনলাইনে এবং মোবাইল ফোনে অব্যাহত হত্যার হুমকির মধ্যেই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিন ১২ ডিসেম্বর ঢাকার ব্যস্ত রাস্তায় গুলিবিদ্ধ হন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা–৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদী। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, পেছন মোটরসাইকেলে চড়ে এসে দুইজন সন্ত্রাসী ওসমান হাদীকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ‘আশঙ্কাজনক’ অবস্থায় ওসমান হাদী এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

হত্যাচেষ্টার পর স্বাধীন অনুসন্ধানী গণমাধ্যম দ্য ডিসেন্ট হত্যাচেষ্টাকারীদের পরিচয় প্রকাশ করে।

হাদীর ওপর হামলার ঘটনায় রাজনৈতিক অঙ্গনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার এবং সকল রাজনৈতিক দল ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। কিন্তু এর ঠিক বিপরীত প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনার দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক অনলাইন একটিভিস্টরা।

দ্য ডিসেন্ট গত দুইদিনে এক্সে অনুসন্ধান চালিয়ে ভারত থেকে পরিচালিত বেশ কিছু অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করেছে, যারা হাদীর হত্যাচেষ্টার পর উল্লাস করেছে এবং এই আক্রমণকারীদেরকে ভারতীয় স্বার্থরক্ষাকারী ‘এজেন্ট’ হিসেবে আখ্যায়িত করে ধন্যবাদ জানিয়েছে। এছাড়াও ওসমান হাদীর একটি ফেসবুক পোস্টকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে হত্যাকে সমর্থন ও ‘প্রয়োজনীয়’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে।

ভারতের সাবেক সেনাকর্মকর্তা এবং ভারতীয় ক্যাম্পেইন গ্রুপ Youth4Nation – TN Chapter-এর সাধারণ সম্পাদক মেজর মাধান কুমার (অব.) এক্স পোস্টে দাবি করেছেন, ওসমান হাদী ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চল দখল করে ‘গ্রেটার বাংলাদেশ’ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন এবং ঢাকায় অজ্ঞাতনামাদের দ্বারা গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।

মেজর মাধান কুমারের সাম্প্রতিক এক্স পোস্টগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তিনি ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপির) পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, শনিবার সকাল থেকে একযোগে কয়েক ডজন ভারতীয় এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে “ওসমান হাদী ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চল দখল করতে চেয়েছিলেন”—এমন দাবি ছড়িয়ে দেওয়া হয়।

ভারতীয় অ্যাকাউন্ট BhikuMhatre এক এক্স পোস্টে একই দাবি করেন। এছাড়াও তিনি দাবি করেন, ভারতীয়রা কিছু #Dhurandar-এর জন্য নিরাপদ আছে। পোস্টটির সঙ্গে তিনি একটি চলচ্চিত্রের দৃশ্য যুক্ত করেন, যেখানে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’–কে প্রশংসা করা হয়।

"ওসমান হাদীর ওপর হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বহু পোস্টে #Dhurandar হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে হামলাকারীদেরকে ’ধন্যবাদ’ জানানো হয়েছে।”

উগ্র হিন্দুত্ববাদী অ্যাকটিভিস্ট এবং বিজেপির ক্যাম্পেইনার ড. রাজেশ পাটিল এক দীর্ঘ পোস্টে ওসমান হাদীর তথাকথিত ভারত দখলের মনগড়া পরিকল্পনা বর্ণনা করে দাবি করেন, একজন #Dhurandar হাদীকে তার ভারতবিরোধিতার জন্য হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। এছাড়াও তিনি দাবি করেন, যারা ভারতবিরোধিতা করবে, #Dhurandar তাদের দেখে নেবে এবং ভারত যেভাবে বাংলাদেশ তৈরি করছে, সেভাবে চাইলে ধ্বংস করতেও পারে।

Bhakt Prahlad নামের আরেক ভারতীয় অ্যাকটিভিস্ট ওসমান হাদীকে ভারতবিরোধী দাবি করে লেখেন, “এটা নতুন ভারত—#Dhurandhar তোমার জায়গায় গিয়ে তোমাকে হত্যা করবে।”

#Dhurandhar-কে ধন্যবাদ জানিয়ে একই দাবি করেছে আরেক ভারতীয় TARUN।

India Strikes নামে আরেক ভারতীয় দাবি করেছেন, DHURANDHAR বাংলাদেশে সক্রিয় এবং ওসমান হাদী যে ভারত দখল করতে চেয়েছিলেন, সে কারণেই তাকে গুলি করা হয়েছে।

 

#Dhurandhar হ্যাশট্যাগ কেন?

#DHURANDHAR মূলত ২০২৫ সালের বলিউড স্পাই অ্যাকশন ফিল্ম “ধুরন্ধর”-এর হ্যাশট্যাগ, যেখানে রণবীর সিং পাকিস্তানি ‘সন্ত্রাস নেটওয়ার্কের’ বিরুদ্ধে ভারতের গোপন অভিযানের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

ওসমান হাদীকে ভারতবিরোধী হিসেবে আখ্যায়িত করে তার হত্যাচেষ্টাকেও ভারতের স্বার্থরক্ষার্থে ভারতীয় গুপ্তচর কর্তৃক পরিচালিত হত্যাচেষ্টা হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। এছাড়াও ভারতের বিরুদ্ধে যারা কথা বলবে, তাদের সবাইকেই এই তথাকথিত DHURANDHAR হত্যা করবে বলে হুমকিও দেওয়া হচ্ছে।

 

’ওসমান হাদী ভারত দখল করতে চেয়েছেন’ শীর্ষক ভুল দাবি প্রচার

ভারত থেকে পরিচালিত একাধিক হিন্দুত্ববাদী অ্যাকাউন্ট থেকে দাবি করা হয়েছে, ওসমান হাদী ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চল দখল করে ‘গ্রেটার বাংলাদেশ’ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন এবং এজন্যই তাকে হত্যা করা হয়েছে।

ভারতীয় অ্যাকটিভিস্টরা ওসমান হাদীর “ভারত দখলের” তথাকথিত অভিযোগের প্রমাণ হিসেবে ১২ ডিসেম্বর ওসমান হাদীর একটি ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশট প্রচার করেন।

স্ক্রিনশটে দেখা যায়, ওসমান হাদী ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের আয়োজনে “বাংলা ও বাঙালির শুরুর গল্প” নামক আলোচনা অনুষ্ঠানের ব্যানার শেয়ার করেছেন। আলোচনা বাঙালি জাতির ইতিহাস ও উৎসকে ঘিরে হওয়ায় বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমারসহ একাধিক দেশের মানচিত্র প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিটি দেশ ও অঞ্চলের মানচিত্র আলাদা রঙে নির্দেশ করা হলেও ভারতীয় অ্যাকটিভিস্টরা দাবি করেন, এর মাধ্যমে ওসমান হাদী ভারতকে বাংলাদেশের মানচিত্রে একীভূত করে ভারত দখল করতে চেয়েছিলেন। অথচ ছবিতেই স্পষ্ট ভারত ও বাংলাদেশের মানচিত্র আলাদা রঙে চিহ্নিত করা হয়েছে।

“গ্রেটার বাংলাদেশ” ঘিরে ভারতীয় অপপ্রচার নতুন নয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পতনের পর নানা সময়ে অসত্য দাবিতে এই অপপ্রচার চালানো হয়েছে। স্বাধীন ফ্যাক্টচেকাররা, গণমাধ্যম এবং বাংলাদেশ সরকার একাধিকবার এই ভারতীয় প্রচারণাকে অসত্য প্রমাণ করেছে।

অর্থাৎ, ‘গ্রেটার বাংলাদেশ’ ঘিরে অপপ্রচার নতুন নয়; বরং হাসিনার পতনের পর থেকেই একশ্রেণির ভারতীয় ক্রমাগতভাবে এই অসত্য দাবি প্রচার করে আসছে।

এছাড়াও কোনো তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই ওসমান হাদীকে নিষিদ্ধ ঘোষিত হিজবুত তাহরিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে দাবি করা হয়েছে।

 

Source: The Dissent

সর্বাধিক পঠিত


ভিডিও