
ইংল্যান্ডের বিভিন্ন স্কুলে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে ভ্যাপ বা ই-সিগারেটের ব্যবহার ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। শিক্ষার্থীদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়া, স্কুল টয়লেটে লুকিয়ে ভ্যাপ সেবন, এমনকি হাজার হাজার পাউন্ড খরচ করে ভ্যাপ শনাক্তকারী যন্ত্র বসানো—সব মিলিয়ে পরিস্থিতিকে শিক্ষকরা একটি ‘জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা’ হিসেবে বর্ণনা করছেন। তবে এই সংকট মোকাবিলায় তারা নিজেদের একা ও অসহায় মনে করছেন।
বিবিসির কমিশনে পরিচালিত একটি জরিপে ইংল্যান্ডের প্রায় সাত হাজার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক অংশ নেন। জরিপে দেখা গেছে, ৫২ শতাংশ শিক্ষক মনে করেন তাদের স্কুলে ভ্যাপ একটি গুরুতর সমস্যা। প্রায় এক-পঞ্চমাংশ স্কুলে ভ্যাপ ডিটেক্টর বসানো হয়েছে এবং ৩৫ শতাংশ স্কুলে অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগ দিয়ে শিক্ষাঙ্গন টহল দেওয়া হচ্ছে। যদিও গত বছরের তুলনায় সমস্যার মাত্রা কিছুটা কমেছে, তবুও শিক্ষকরা বলছেন, এটি এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
দক্ষিণ ইয়র্কশায়ারের রদারহামের ওয়েলস হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক লিসা ম্যাককল জানান, এক শিক্ষার্থী অবৈধ পদার্থ মেশানো ভ্যাপ সেবনের পর গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনার পর তারা কঠোর ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হন। ওই শিক্ষার্থী পরে সুস্থ হলেও ঘটনায় জড়িতদের স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়। এরপর স্কুলটি তিনটি ভ্যাপ ডিটেক্টর বসাতে প্রায় তিন হাজার পাউন্ড ব্যয় করে, করিডোরে নজরদারি বাড়ায় এবং মেটাল ডিটেক্টর ব্যবহার শুরু করে। ম্যাককল বলেন, “এই অর্থ আমরা শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি বা জনবল বাড়াতে ব্যবহার করতে পারতাম। এখন এসব ব্যবস্থা আমাদের মূল কাজ—শিক্ষাদান থেকে মনোযোগ সরিয়ে নিচ্ছে।”
অনেক শিক্ষক জানিয়েছেন, কিছু শিক্ষার্থী স্পষ্টভাবেই নিকোটিনে আসক্ত। ক্লাসে অস্থিরতা, বারবার বাইরে যাওয়ার চেষ্টা—এসব লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। বিজ্ঞান শিক্ষক ম্যাথিউ ডে বলেন, শিক্ষার্থীদের সহায়তার জন্য পর্যাপ্ত সেবা নেই এবং সমস্যার ব্যাপ্তি এখনো পুরোপুরি অনুধাবন করা হয়নি।
শিক্ষার্থীদের একটি অংশ স্বীকার করেছে, তারা ১০ বা ১১ বছর বয়সেই সহপাঠীদের চাপে ভ্যাপ শুরু করে এবং পরে আর ছাড়তে পারেনি। কেউ কেউ দিনে ৪০০ থেকে ৫০০ পাফ নেওয়ার কথাও জানিয়েছে। যদিও অনেক অভিভাবক বিষয়টি জানেন, তারা কার্যকরভাবে কিছু করতে পারছেন না। আবার কিছু অভিভাবক মনে করেন, ধূমপানের চেয়ে ভ্যাপ কম ক্ষতিকর—যা স্কুল কর্তৃপক্ষের উদ্যোগকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিশুরা প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় নয় গুণ বেশি ভ্যাপ ব্যবহার করছে। বিশ্বজুড়ে ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়সী প্রায় দেড় কোটি শিশু ই-সিগারেট ব্যবহার করছে, যা নিকোটিন আসক্তির নতুন ঢেউ তৈরি করছে এবং জনস্বাস্থ্যে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
শিক্ষক সংগঠনগুলো সরকারের কাছে স্কুলভিত্তিক সচেতনতামূলক কর্মসূচির জন্য অর্থায়ন, স্পষ্ট দিকনির্দেশনা এবং ভ্যাপকে স্কুলে নিষিদ্ধ সামগ্রীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছে। তাদের মতে, এতে ব্যয়বহুল ডিটেক্টরের প্রয়োজন কমবে। এদিকে সরকার জানিয়েছে, তরুণদের মধ্যে ভ্যাপের উদ্বেগজনক বৃদ্ধি ঠেকাতে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এবং প্রস্তাবিত ‘তামাক ও ভ্যাপ বিল’ কার্যকর হলে ১৮ বছরের নিচে ভ্যাপ বিক্রি ও বিপণন আরও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে।
তবে স্কুল কর্তৃপক্ষের মতে, আইনই যথেষ্ট নয়। অভিভাবক, স্থানীয় সমাজ এবং ব্যবসায়ীদের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই ‘একাকী লড়াই’ জেতা কঠিন।