
যুক্তরাজ্যে ১৬ বছরের নিচে শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপের দিকে এগোচ্ছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার এতদিন পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে অনাগ্রহী থাকলেও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও জনমতের চাপে তিনি এই বিষয়ে অবস্থান পরিবর্তনের দিকে ঝুঁকছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং ইতোমধ্যে অস্ট্রেলিয়ায় চালু হওয়া ১৬ বছরের নিচে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা নিয়ে গবেষণা করার নির্দেশ দিয়েছেন। গত ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া ওই নীতির প্রভাব ও কার্যকারিতা পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগ এমন এক সময়ে নেওয়া হলো, যখন কনজারভেটিভ পার্টি লর্ডস কক্ষে একটি সংশোধনী উত্থাপন করে লেবার সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে চাপ সৃষ্টি করছে।
কনজারভেটিভ পিয়াররা চিলড্রেনস ওয়েলবিয়িং অ্যান্ড স্কুলস বিলের সঙ্গে সংশোধনী যুক্ত করে স্কুলে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব দিয়েছেন। প্রত্যাশা করা হচ্ছে, এই সংশোধনী লর্ডসে পাস হলে কমন্সে তা নিয়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হবে এবং এতে লেবার দলের ভেতরে বিদ্রোহের আশঙ্কাও রয়েছে। দলীয় এমপিদের সতর্ক থাকার বার্তা দেওয়া হলেও ডাউনিং স্ট্রিট পরিস্থিতি সামাল দিতে আগেভাগেই পদক্ষেপ নিতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলছে।
লেবার দলের একাধিক এমপি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপের পক্ষে মত দিয়েছেন। তাঁদের মতে, গত এক দশকে অনলাইন পরিবেশ এমনভাবে গড়ে উঠেছে, যা শিশুদের জন্য বাস্তব ক্ষতির কারণ হচ্ছে। রাজনৈতিক কৌশলের অভিযোগ থাকলেও শিশুদের সুরক্ষায় দ্রুত ও শক্ত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন তারা।
এর আগে কনজারভেটিভ পার্টি ঘোষণা দেয়, তারা ক্ষমতায় এলে ১৬ বছরের নিচে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে এবং স্কুলে স্মার্টফোন নিষিদ্ধ করবে। দলনেতা কেমি ব্যাডেনক বলেন, শিশুদের মানসিক ও সামাজিক সুরক্ষার জন্য এই সিদ্ধান্ত জরুরি। তবে লেবার সরকার ইংল্যান্ডজুড়ে স্কুলে ফোন নিষিদ্ধ করার পরিবর্তে স্কুলপ্রধানদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার পক্ষে রয়েছে।
এদিকে শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা সংস্থা এনএসপিসিসি একটি পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করেছে। সংস্থাটির নীতিবিষয়ক প্রধান আনা এডমন্ডসন বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি হলেও ১৬ বছরের নিচে সবার জন্য একযোগে নিষেধাজ্ঞা জটিল সমস্যার সহজ সমাধান নয়।
তবে জনমত সরকারের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। ইউগভ পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, ৭৪ শতাংশ মানুষ ১৬ বছরের নিচে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধের পক্ষে। পাশাপাশি গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহ্যামও কনজারভেটিভ নেত্রী কেমি ব্যাডেনকের অবস্থানের সঙ্গে একমত পোষণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
অন্যদিকে অনলাইনে নারী ও শিশুদের যৌন হয়রানি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের মাধ্যমে আপত্তিকর ছবি তৈরির ঘটনা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে ইলন মাস্কের মালিকানাধীন এক্স প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের বিষয় ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উঠেছে। সংসদে প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার জানিয়েছেন, যুক্তরাজ্যের আইন মেনে চলতে এক্স কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে, তবে সরকার কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা অফকমের তদন্ত চলবে।
প্রযুক্তিমন্ত্রী লিজ কেন্ডালও জানিয়েছেন, অফকমের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পূর্ণ সমর্থন রয়েছে এবং প্রয়োজনে যুক্তরাজ্যে কোনো প্ল্যাটফর্ম ব্লক করার ক্ষমতাও প্রয়োগ করা হবে। পাশাপাশি সম্মতি ছাড়া অন্তরঙ্গ ছবি তৈরি বা চাওয়াকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে নতুন আইন আনার কথাও নিশ্চিত করেছেন তিনি।
এই প্রেক্ষাপটে শিশুদের অনলাইন সুরক্ষা নিশ্চিত করতে যুক্তরাজ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে কঠোর নীতিমালা আরোপের দিকে সরকার দ্রুত এগোচ্ছে বলে ধারণা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।