বাংলাদেশ

হঠাৎ ফেসবুকে কেন ট্রেন্ডিং ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’, কীভাবে এল এই স্লোগান?

14311_IMG_2877.jpeg

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে জনপ্রিয় স্লোগান ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’। হঠাৎ করেই এটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। রাজনৈতিক নেতা, ছাত্রসংগঠনের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তির পোস্টে শব্দবন্ধটি ঘুরেফিরে আসছে। এর পেছনে রয়েছে ভাষা ও পরিচয়বিষয়ক বিতর্ক। 

শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসনের আয়োজনে মহান শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে এটিকে নতুন করে আলোচনায় আনেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপির এই সংসদ সদস্য বলেন, 'নিজের ভাষা ও নিজের সম্পদকে ভালবাসুন। নিজের যা আছে, সেটাকে ভালবাসুন। বাংলাকে যদি ধারণ করতে হয়, বাংলাকে যদি আমার মায়ের ভাষা বলতে হয় তাহলে ইনকিলাব জিন্দাবাদ চলবে না। ইনকিলাব আমাদের ভাষা না।'

ভাষার উৎকর্ষ সাধনের মাধ্যমে দেশপ্রেম বাড়ানোর তাগিদ দেন টুকু। তিনি বলেন, 'গণতন্ত্র উত্তরণ হয়েছে, আমরা গণতন্ত্রের পথে হাঁটছি। মাতৃভাষা দিবসে মাতৃভাষার কদর বুঝতে হবে। ভাষার উৎকর্ষ সাধনের মাধ্যমে দেশ প্রেম বাড়াতে হবে এবং কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন ঘটাতে হবে।'

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রীর বক্তব্যের পরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ লিখে পোস্ট দিতে শুরু করেন বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা। তবে প্রশ্ন উঠে, প্রবল আলোচিত ইনকিলাব জিন্দাবাদ স্লোগানটি কোথা থেকে এল?

প্রখ্যাত ভারতীয় ইতিহাসবিদ ইরফান হাবিবের এক লেখায় উঠে এসেছে এ স্লোগানের আদ্যোপান্ত। ২০২২ সালের ২৯ মে ভারতীয় পত্রিকা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে এক লেখায় তিনি উল্লেখ করেছেন, ১৯২১ সালে মাওলানা হাসরাত মোহানি (১৮৭৫-১৯৫১) প্রথম স্লোগানটি ব্যবহার করেন। এরপরে এ স্লোগান ঠাঁই করে নেয় উপনিবেশবিরোধী সশস্ত্র সংগ্রামের নেতা ভগত সিংয়ের কণ্ঠেও।

নানা পরিচয়ে পরিচিত ছিলেন হাসরাত মোহানি। উর্দু ভাষার এ কবি ছিলেন শ্রমিকনেতা, ছিলেন ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সদস্যও। হাসরাত মোহানি ভারতের উত্তর প্রদেশের উন্নাও জেলার মোহন নামের একটি শহরে জন্মগ্রহণ করেন। 

ইরফান হাবিব লিখেছেন, জন্মের পর হাসরাত মোহানির নাম রাখা হয় ফজলুল হাসান। এ নামেই তিনি বেড়ে ওঠেন। একজন বিপ্লবী উর্দু কবি হিসেবে ‘হাসরাত’ ছিল তার কলমি নাম, যা একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবেও তাকে পরিচিতি দিয়েছিল। তিনি ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির এক নেতার সঙ্গে প্রথম ভারতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে পূর্ণ স্বরাজ বা পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি উত্থাপন করেছিলেন।

ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর হাসরাত মোহানি গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ভারতীয় সংবিধানের খসড়া প্রণয়ন কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগানটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অংশ হিসেবে দিয়েছিলেন হাসরাত মোহানি।

ইরফান হাবিবের লেখায় দেখা যাচ্ছে, ১৯২৯ সালে আদালতে দেয়া এক জবানবন্দিতে ভগত সিং বলেন, ’ ইনকিলাব বা বিপ্লব বোমা বা পিস্তলের সংস্কৃতি নয়। আমাদের বিপ্লবের অর্থ হলো প্রকাশ্য অন্যায়ের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে থাকা বর্তমান পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়া।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ড. মোহাম্মদ আজম বলেন, ইনকিলাব অর্থ বিপ্লব। আর জিন্দাবাদ মানে অভিনন্দন জানানো। ফলে ইনকিলাব জিন্দাবাদ স্লোগানের মানে হলো বিপ্লবকে অভিনন্দন জানানো।

তবে মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর বক্তব্যের পর ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ শব্দবন্ধটি ভাষা, জাতীয়তাবাদ ও রাজনৈতিক পরিচয়ের বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এক পক্ষ এটিকে বাংলা ভাষার পরিপন্থী বলে দাবি করছে, অন্য পক্ষ বলছে শব্দের উৎপত্তি যেখানেই হোক, ব্যবহারের মধ্য দিয়েই তা ভাষার অংশ হয়ে ওঠে।

সর্বাধিক পঠিত


ভিডিও