
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের বিদায় সুখকর হয়নি। কর্মকর্তাদের বিক্ষোভ ও আল্টিমেটামের মধ্যে অফিস ছাড়েন তিনি। বুধবার অফিস ছাড়ার পরপরই সরকার তার নিয়োগ বাতিল করে নতুন গভর্নর নিয়োগ দেয়। নতুন গভর্নর নিয়োগের খবরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
এ সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে গভর্নরের উপদেষ্টা আহসান উল্লাহকে বের করে দেন। একই সঙ্গে নিরাপত্তা বিভাগের পরিচালক ফারুক হাওলাদারকেও বের করে দেওয়া হয়। এমন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মোতায়েন করা হয় বাড়তি পুলিশ।
এর আগে সকাল ১১টায় তিন কর্মকর্তার শোকজ নোটিশ বাতিল, বদলি প্রত্যাহার ও অন্যান্য দাবি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের ব্যানারে একটি প্রতিবাদ সভার আয়োজন করা হয়। সেখান থেকে গভর্নরকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়, তিন কর্মকর্তার শোকজ নোটিশ বাতিল, বদলি প্রত্যাহার ও অন্যান্য দাবি না মানলে বৃহস্পতিবার থেকে গভর্নরের পদত্যাগের দাবিতে কলমবিরতিতে যাবেন তারা। এ সময় গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের বিরুদ্ধে ‘ভুয়া, ভুয়া’ স্লোগান দিতে দেখা যায়।
প্রতিবাদ সভায় অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের সভাপতি এ কে এম মাসুম বিল্লাহ বলেন, গভর্নর বিভিন্ন স্বৈরাচারী পদক্ষেপ নিয়েছেন; আমরা এসবের তীব্র নিন্দা জানাই। মঙ্গলবার আমাদের তিনজনকে শোকজ নোটিশের জবাব দেওয়ার আগেই বদলি করা হয়েছে। আমরা বিষয়টি সমাধানের জন্য তার কাছে গেলেও তিনি দেখা করেননি। তাই আমরা আমাদের শোকজ নোটিশ ও বদলি প্রত্যাহারসহ অন্যান্য দাবি আজকের মধ্যে বাস্তবায়নের দাবি জানাচ্ছি। যদি তা বাস্তবায়ন না করা হয়, তাহলে আগামীকাল বৃহস্পতিবার থেকে প্রতীকী কলম বিরতিতে যাব। আর রোববার সর্বস্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক ও সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, আমরা চেয়েছি বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন, কিন্তু পেয়েছি স্বৈরশাসন। এই স্বৈরশাসনে আমরা থাকতে চাই না। আমাদের কিছু ন্যায্য দাবি নিয়ে বারবার গভর্নরের কাছে গিয়েছিলাম, কিন্তু তিনি সেগুলো আমলে নেননি। বরং তিনি দমন–নিপীড়নের আশ্রয় নিয়েছেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে ভরিয়ে ফেলা হয়েছে। তার অনেক উপদেষ্টা ও পরামর্শক প্রয়োজন, কিন্তু এখন পর্যন্ত অর্থনীতির জন্য কোনো কার্যকর নীতি গ্রহণ করতে দেখা যায়নি। তিনি ক্রমাগতভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলে মনোবল ভেঙে দিচ্ছেন। এছাড়া ব্যাংক খাত নিয়ে যে ধরনের মন্তব্য করে যাচ্ছেন, তাতে ব্যাংকিং সেক্টরে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। গভর্নরের ইচ্ছামতো কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলবে না। সবকিছু নিয়ে তাকে জবাবদিহি করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও ডেপুটি হেড অব বিএফআইইউ মফিজুর রহমান খান চৌধুরী বলেন, গত সাত-আট মাস ধরে আমরা ন্যায্য দাবি উত্থাপন করেছি গভর্নরের কাছে। কিন্তু তিনি তা মানেননি। আজ তাই এই প্রতিবাদ সভার আয়োজন করতে হয়েছে। আমরা আশা করি তিনি আমাদের ন্যায্য দাবি মেনে নেবেন। কোনো অন্যায্য দাবি জানানো হয়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মর্যাদা রক্ষায় তিনি যথাযথ পদক্ষেপ নেবেন।
সংবাদ সম্মেলনে আহসান এইচ মনসুর যা বললেন
কর্মকর্তাদের প্রতিবাদ সভার পর আহসান এইচ মনসুর বেলা ২টায় জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডাকেন। সংবাদ সম্মেলনে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের বিক্ষোভকে ‘স্বার্থান্বেষী মহলের ষড়যন্ত্র’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, উত্থাপিত বিষয়গুলো বিশেষ করে কয়েকটি ব্যাংকের একীভূতকরণ, রাষ্ট্রীয় নীতি ও রাজনৈতিক অর্থনীতির বিষয়—কোনো কর্মচারী সংগঠনের আলোচ্য বিষয় নয়। কোনো কর্মকর্তার এসব নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার নেই; এটি তাদের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না। এই ব্যাংকগুলো অধিগ্রহণের প্রক্রিয়ার লক্ষ্য হলো গত দুই বছর ধরে যে ৭৬ লাখ আমানতকারী তাদের অর্থ তুলতে পারেননি, তাদের স্বার্থ রক্ষা করা।
তিনি বলেন, একটি ‘কুচক্রী মহল’ মার্জার হওয়া ব্যাংকগুলোর পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া ব্যর্থ করতে অপপ্রচার চালাচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে এসব ব্যাংক আবার আগের মালিকদের হাতে ফিরে যেতে পারে।
পদত্যাগের দাবির বিষয়ে প্রশ্ন করলে আহসান এইচ মনসুর সাংবাদিকদের বলেন, ‘পদত্যাগ কোনো ইস্যু নয়। আমি এখানে চাকরি করতে আসিনি, সেবা দিতে এসেছি। প্রয়োজন হলে দুই সেকেন্ড সময় লাগবে না পদত্যাগ করতে। তবে আমরা প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেব।’
তিনি আরো বলেন, ‘একটি প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতে হলে শৃঙ্খলা মেনে চলতে হবে। চাকরি করব, কিন্তু প্রতিষ্ঠানের নিয়ম মানব না—এটি গ্রহণযোগ্য নয়।’
আহসান এইচ মনসুরের সংবাদ সম্মেলনের পরই গণমাধ্যমে খবর আসে, সরকার নতুন গভর্নর নিয়োগ করেছে। এরপর বেলা ২টার দিকে তিনি অফিস থেকে বের হয়ে যান। বের হওয়ার সময় সাংবাদিকদের বলেন, তিনি পদত্যাগ করেননি; বরং কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেলে নতুন গভর্নর নিয়োগের খবর দেখে অফিস ত্যাগ করেছেন।
বিশৃঙ্খলা তৈরি করে বের করা হলো গভর্নরের উপদেষ্টাকে
আহসান এইচ মনসুর বাংলাদেশ ব্যাংকে সংবাদ সম্মেলন করার পরই আলোচনা শুরু হয় নতুন গভর্নর নিয়োগের। এরপরই আহসান এইচ মনসুর বাসায় চলে যান। বাসায় চলে যাওয়ার সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা তাকে বিদায় জানান। তিনি বেরিয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরে হট্টগোল শুরু হয়। কর্মকর্তারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে গভর্নরের উপদেষ্টা আহসান উল্লাহকে বের করে দেন। তিনি যখন গাড়িতে উঠে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, এ সময় আহসান উল্লার ঘাড় ধরে গাড়িতে তোলায় নেতৃত্ব দেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালক তৌহিদুল ইসলাম। এ সময় আক্রমণাত্মক আচরণ করা তৌহিদুল ইসলামকে আঙুল উঁচিয়ে আহসান উল্লাহকে শাসাতে এবং অকথ্য ভাষায় গালাগালি করতে দেখা যায়।
এছাড়া নির্বাহী পরিচালক সরোয়ার হোসেন, পরিচালক নওশাদ মোস্তফা, অতিরিক্ত পরিচালক তানভীর আহমেদসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রায় ৩০ জন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় অনেকে ‘ধর ধর’ বলে স্লোগান দেন। কেউ কেউ গায়ে হাত তোলার চেষ্টা করেন।
জানা গেছে, গত ১৬ ফেব্রুয়ারি দুর্বল ব্যাংকের সঙ্গে এক্সিম ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করা, ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগসহ বিভিন্ন ইস্যুতে গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকে ‘স্বৈরাচার’ আখ্যা দিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের নেতারা। এর জেরে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীল দলের সাধারণ সম্পাদক এবং এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস বিভাগের পরিচালক নওশাদ মোস্তফা, অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের সভাপতি ও বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক এ কে এম মাসুম বিল্লাহ এবং কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা শ্রাবণকে শোকজ করা হয়। শোকজের একদিন পর তাদের ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়।
তবে আজ নতুন গভর্নর নিয়োগের খবরে তিন কর্মকর্তার বদলি প্রত্যাহার করে নিজ নিজ বিভাগে পুনর্বহাল করে বাংলাদেশ ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগ-১।