যুক্তরাজ্য

১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:০৪
আরও খবর

বিবিসির অনুসন্ধান: যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশিসহ শত অভিবাসীকে ভুয়া সমকামী বানাচ্ছে 'ল ফার্ম'

15082_IMG_0448.jpeg

যুক্তরাজ্যে বৈধভাবে বসবাসের অনুমতি বা ভিসা পেতে এক শ্রেণির আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান অভিবাসীদের ভুয়া সমকামী পরিচয় সাজানোর পরামর্শ দিচ্ছে। এই সেবার বিনিময়ে তারা অভিবাসীদের কাছ থেকে কয়েক হাজার পাউন্ড পর্যন্ত আদায় করছে। বিবিসির দীর্ঘ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।

এই জালিয়াতির ফাঁদে পড়া অভিবাসীদের একটি বড় অংশ পাকিস্তান ও বাংলাদেশের নাগরিক। তারা পড়াশোনা, কাজ বা ভ্রমণ ভিসায় যুক্তরাজ্যে গিয়েছিলেন। পরে ভিসার মেয়াদ শেষ হলে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেন। সেই আবেদনে দাবি করা হয়, তারা সমকামী এবং নিজ দেশে ফিরলে জীবন বিপন্ন হতে পারে।

যুক্তরাজ্যের আশ্রয় প্রক্রিয়া মূলত তাদের সুরক্ষা দেয়, যারা নিজ দেশে ফিরলে নিপীড়ন বা মৃত্যুর মুখোমুখি হতে পারেন। বিবিসির অনুসন্ধানে দেখা গেছে, একশ্রেণির আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এই সুরক্ষাব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে রীতিমতো ব্যবসা ফেঁদে বসেছে। গত বছর যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়েছে। সেই আবেদনকারীদের মধ্যে ৩৫ শতাংশই পড়াশোনা, কাজ বা ভ্রমণ ভিসায় দেশটিতে প্রবেশ করেছিলেন।

বিবিসির আন্ডারকভার সাংবাদিকরা নিজেদের পাকিস্তান ও বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচয় দিয়ে কয়েকটি আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানে যান। সেখান থেকে যেসব তথ্য উঠে এসেছে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। একটি ল ফার্ম ভুয়া আশ্রয় আবেদন তৈরি করে দিতে সাত হাজার পাউন্ড পর্যন্ত দাবি করেছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় দশ লাখ টাকারও বেশি। সেই প্রতিষ্ঠানটি আবার দাবি করেছে, যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই আবেদন বাতিল করার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, ভুয়া আশ্রয়প্রার্থীরা সাধারণ চিকিৎসকের কাছে গিয়ে নিজেদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত বলে উপস্থাপন করেন এবং সেই সনদ আশ্রয় আবেদনে ব্যবহার করেন। এমনকি একজন আবেদনকারীকে এইচআইভি পজিটিভ হিসেবে মিথ্যা পরিচয় দিতেও দেখা গেছে। একজন পরামর্শক দাবি করেন, তিনি ১৭ বছর ধরে এই ভুয়া আবেদন তৈরির কাজ করছেন এবং আবেদনকারী যে সমকামী তা প্রমাণ করতে ভুয়া সাক্ষীও জোগাড় করে দিতে পারবেন।

একটি ল ফার্মের সঙ্গে যুক্ত এক আইনজীবী ছদ্মবেশী সাংবাদিককে জানান, তিনি অনেককে সমকামী বা নাস্তিক পরিচয় সাজিয়ে সফলভাবে রাজনৈতিক আশ্রয় পাইয়ে দিয়েছেন। ওই আইনজীবী দেড় হাজার পাউন্ডে ভুয়া আবেদন এবং আরও দুই থেকে তিন হাজার পাউন্ডের বিনিময়ে ভুয়া প্রমাণপত্র তৈরি করে দেওয়ার প্রস্তাবও দেন। এক পরামর্শক আবার প্রতিশ্রুতি দেন, পাকিস্তানে থাকা আবেদনকারীর স্ত্রীকেও নারী সমকামী সাজিয়ে যুক্তরাজ্যে আনার ব্যবস্থা করা হবে।

গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে পূর্ব লন্ডনের বেকটনের একটি কমিউনিটি সেন্টারে ওরচেস্টার এলজিবিটি নামের একটি সংগঠনের আয়োজনে এক অনুষ্ঠানে ১৭৫ জনের বেশি ব্যক্তি জড়ো হন। সংগঠনটি নিজেদের প্রকৃত সমকামী আশ্রয়প্রার্থীদের সহায়তাকারী হিসেবে পরিচয় দেয়। কিন্তু বিবিসির ছদ্মবেশী সাংবাদিকরা সেখানে গিয়ে দেখেন বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। অনুষ্ঠানে আসা পুরুষদের মধ্যে কয়েকজন সরাসরি জানান, তারা আসলে সমকামী নন। ফাহার নামের একজন বলেন যে অনুষ্ঠানে আসা অধিকাংশ মানুষই সমকামী নয়। আরেকজন, জিসান, বলেন যে সেখানে কেউই সমকামী নয়, এমনকি এক শতাংশও নয়।

এই সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা মাজেদুল হাসান শাকিল বার্মিংহাম ও লন্ডনভিত্তিক একটি ইমিগ্রেশন ল ফার্মের প্যারালিগ্যাল হিসেবে কর্মরত। ছদ্মবেশী সাংবাদিককে ফোনে তিনি জানান, রাজনৈতিক আশ্রয় পেতে হলে নির্যাতনের শিকার হওয়ার প্রমাণ দরকার। পরে তানিশা খান নামের এক নারী সেই সাংবাদিককে ফোন করেন, যিনি ওরচেস্টার এলজিবিটির একজন উপদেষ্টা। সাংবাদিক যখন জানান তিনি আসলে সমকামী নন, তখন তানিশা বলেন যে বর্তমানে যুক্তরাজ্যে টিকে থাকার একটাই উপায় আছে এবং সবাই সেই পদ্ধতিই অনুসরণ করছে।

ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যৌন পরিচয়ের ভিত্তিতে রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়ার ক্ষেত্রে পাকিস্তানি নাগরিকরা সবার আগে এবং দ্বিতীয় অবস্থানে বাংলাদেশিরা। ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, এ ধরনের মোট আবেদনের মধ্যে ৪২ শতাংশই পাকিস্তানি নাগরিকদের করা। বাংলাদেশি আবেদনকারীর সংখ্যা ১৭৫ জন, যা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। ওই বছর যৌন পরিচয়ের ভিত্তিতে করা আশ্রয় আবেদনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ প্রাথমিক পর্যায়েই অনুমোদন পায়।

লুটন শহরভিত্তিক মুসলিম এলজিবিটি নেটওয়ার্কের প্রতিষ্ঠাতা এজেল খান এই পরিস্থিতিকে বিশাল সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি জানান, অনেকেই তার সংস্থাকে অর্থ দিয়ে সুপারিশনামা কিনতে চেয়েছেন। তবে তিনি কখনো তা নেননি। এজেল খান আরও জানান, অনেকে তার কাছে সরাসরি স্বীকার করেছেন যে তারা সমকামী নন, তবু যুক্তরাজ্যে থাকতে চান।

এ বিষয়ে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আশ্রয় সুরক্ষাব্যবস্থার যেকোনো অপব্যবহারকারীকে কঠোরতম শাস্তির মুখোমুখি করা হবে। প্রয়োজনে তাদের যুক্তরাজ্য থেকে বহিষ্কার করা হবে।

সর্বাধিক পঠিত


আরও খবর
ভিডিও