যুক্তরাজ্য

২৯ মে ২০২৬, ১৭:০৫
আরও খবর

ম্যানচেস্টারে লাফিং গ্যাস সেবন করে ১৩৯ মাইল গতিতে গাড়ি ছুটিয়ে ভিডিও ধারণ, প্রাণ গেল নিরীহ ব্যক্তির

15585_Thumbnail-16~9-(4).jpg

যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টারে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় এক নিরীহ কর্মজীবী ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনায় দুই যুবককে দীর্ঘ কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। পুলিশ বলছে, এটি তাদের দেখা “সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ও চরম বেপরোয়া ড্রাইভিংয়ের” ঘটনাগুলোর একটি।

নিহত সিলভেস্টার আবায়োমি (৫০) গত ৯ মার্চ ভোরে ম্যানচেস্টারের কিংসওয়ে সড়কে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। আদালতে শুনানিতে উঠে আসে, উওয়াইস হুসেইন (২০) ও উসমান মাহমুদ (২৩) একটি ভক্সওয়াগেন গলফ জিটিআই গাড়িতে করে ঘণ্টায় ১৩৯ মাইল গতিতে ছুটছিলেন। পুরো ঘটনাটি তারা মোবাইলে ধারণও করছিলেন। গাড়ির ভেতরে তারা নাইট্রাস অক্সাইড গ্যাস ভর্তি বেলুনে টান দিচ্ছিলেন এবং বিপজ্জনকভাবে গাড়ি চালাচ্ছিলেন।

ম্যানচেস্টার ক্রাউন কোর্ট শুক্রবার হুসেইনকে ১১ বছর ৮ মাস এবং মাহমুদকে ১২ বছর ৯ মাসের কারাদণ্ড দেন। আদালত জানান, দুজনকেই সাজা ভোগের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ সময় কারাগারে থাকতে হবে। পাশাপাশি আট বছরের জন্য তাদের ড্রাইভিং নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

প্রসিকিউটর র‍্যাচেল শেন্টন আদালতে বলেন, দুর্ঘটনার মাত্র পাঁচ সেকেন্ড আগে গাড়িটির গতি ছিল ঘণ্টায় ১৩৯ মাইল। সংঘর্ষের সময়ও সেটি ৯৯ মাইল গতিতে চলছিল। ঘটনার আগে কয়েক ঘণ্টা ধরে হুসেইন এক হাতে গাড়ি চালাচ্ছিলেন, লালবাতি অমান্য করছিলেন এবং দ্রুতগতিতে অন্য গাড়িকে বিপজ্জনকভাবে অতিক্রম করছিলেন।

ভোর সাড়ে চারটার দিকে সিলভেস্টার আবায়োমি নিজের ভলভো এস৪০ গাড়ি নিয়ে সবুজ সংকেত পেয়ে কিংসওয়ে সড়কে উঠছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে লালবাতি অমান্য করে আসা গলফ জিটিআই তার গাড়িটিকে সজোরে ধাক্কা দেয়। গুরুতর আহত অবস্থায় অল্প সময়ের মধ্যেই তার মৃত্যু হয়।

দুর্ঘটনার পর আহত ব্যক্তিকে সাহায্য করার বদলে দুই যুবক পালানোর পরিকল্পনা করতে থাকে। আদালতে জানানো হয়, হুসেইনের অ্যাপল ওয়াচ দুর্ঘটনার অভিঘাতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জরুরি কল করে এবং সেই কলেই তাদের কথোপকথন রেকর্ড হয়।

রেকর্ডিংয়ে মাহমুদকে বলতে শোনা যায়, “তুমি তো আমার গাড়িটাই শেষ করে দিলে।” পরে তারা দ্রুত উবার ডাকার কথা বলে এবং গাড়িটি চুরি হয়েছে বলে পুলিশকে জানানোর পরিকল্পনাও করে। এমনকি গাড়ির এয়ারব্যাগে নিজেদের ডিএনএ থেকে যাওয়ার বিষয় নিয়েও তারা আলোচনা করছিল। তবে কেউই নিহত আবায়োমির খোঁজ নিতে যাননি।

পুলিশ পরে হুসেইনকে একটি বাগানে লুকিয়ে থাকতে দেখে। তাকে আটক করতে টেজার ব্যবহার করতে হয়। গ্রেপ্তারের পর তিনি দাবি করেন, “আমরা সেখানে ছিলামই না। কেউ কি মারা গেছে?” প্রথমদিকে তিনি গাড়ি চালানোর বিষয়টিও অস্বীকার করেন।

অন্যদিকে মাহমুদকেও কাছাকাছি একটি বাগান থেকে আটক করা হয়। ঘটনাস্থলের আশপাশ থেকে বেশ কয়েকটি নাইট্রাস অক্সাইড ক্যানিস্টার উদ্ধার করে পুলিশ।

বিচারক নিকোলাস ডিন কেসি বলেন, “তোমরা অন্য সড়ক ব্যবহারকারীদের জীবনের প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন ছিলে। এই বেপরোয়া আচরণ ছিল নিছক রোমাঞ্চের জন্য।” তিনি আরও বলেন, সিসিটিভি ও মোবাইলের ভিডিও ফুটেজ ছিল “ভীতিকর” এবং সেটি ছিল “যে কোনো বৈধ ও নিরাপদ সীমার বহু গুণ বেশি”।

দুর্ঘটনার পর অভিযুক্তদের আচরণের সমালোচনা করে বিচারক বলেন, “তোমরা সাহায্য করার বদলে পালিয়ে যাওয়ার এবং কীভাবে দায় এড়ানো যায়, সেটি নিয়েই আলোচনা করছিলে।”

আদালতে আবেগঘন বক্তব্য দেন নিহতের সঙ্গী ডেনিস ডয়েল। তিনি বলেন, সেদিন সকালে কাজে যাওয়ার আগে সিলভেস্টার তাকে চুমু দিয়ে বলেছিলেন, “আমি তোমাকে ভালোবাসি।” কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমি কখনও ভাবিনি এটাই হবে শেষ দেখা।”

হাসপাতালে তার মরদেহ দেখার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ডয়েল বলেন, “এটা যেন দুঃস্বপ্ন ছিল। মনে হচ্ছিল আমি অন্ধকারে আটকে গেছি। সে শুধু আমার সঙ্গী ছিল না, সে ছিল আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু এবং ভবিষ্যৎ।”

তিনি আরও বলেন, “সিলভেস্টার ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু ও প্রাণবন্ত একজন মানুষ। তার চলে যাওয়ার পর আমার জীবন পুরোপুরি বদলে গেছে। এই শূন্যতা কখনও পূরণ হওয়ার নয়।”

রায়ের পর গ্রেটার ম্যানচেস্টার পুলিশের ডিটেকটিভ সার্জেন্ট থমাস জনসন বলেন, “এটি আমাদের দেখা সবচেয়ে চরম বিপজ্জনক ড্রাইভিংয়ের ঘটনাগুলোর একটি। দুই অভিযুক্তের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের কারণে একজন নিরীহ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। কোনো সাজাই এই ক্ষতি পূরণ করতে পারবে না।”

তিনি জনগণকে বেপরোয়া ড্রাইভিংয়ের বিরুদ্ধে সচেতন হওয়ার এবং এমন ঘটনা দেখলে দ্রুত পুলিশকে জানানোর আহ্বান জানান।
 

সর্বাধিক পঠিত


আরও খবর
ভিডিও