
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার আবারও রাজনৈতিক অস্বস্তির মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন। বিতর্কিত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার ম্যান্ডেলসনকে ঘিরে দ্বিতীয় দফার গোপন সরকারি নথি সোমবার প্রকাশের কথা রয়েছে। এক হাজারেরও বেশি পৃষ্ঠার এই নথিপত্রে ম্যান্ডেলসন ও সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিদের মধ্যে আদান-প্রদান হওয়া ব্যক্তিগত বার্তা, ইমেইল এবং অন্যান্য যোগাযোগের তথ্য থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সরকারি সূত্র জানিয়েছে, বিকেল সাড়ে দুইটার পর নথিগুলো পার্লামেন্টে জমা দেওয়া হবে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, এসব নথিতে ম্যান্ডেলসনের নিয়োগ নিয়ে উত্থাপিত নিরাপত্তা উদ্বেগ বা সতর্কবার্তা মোকাবিলায় সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে নতুন কোনো ব্যাখ্যা বা স্বস্তিদায়ক তথ্য নাও থাকতে পারে। বিশেষ করে বিদেশি রাষ্ট্রের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছিল, সেগুলোর বিষয়ে সরকারের অবস্থান আরও সমালোচনার মুখে পড়তে পারে।
২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত হিসেবে পিটার ম্যান্ডেলসনের নিয়োগের পর থেকেই তার বিরুদ্ধে নানা বিতর্ক শুরু হয়। বিশেষ করে দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন ওঠে। পরে সংসদ সদস্যদের চাপের মুখে সরকারকে তার নিয়োগ-সংক্রান্ত নথিপত্র প্রকাশে সম্মত হতে হয়।
প্রধানমন্ত্রী স্টারমার একাধিকবার এপস্টেইনের ভুক্তভোগীদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন এবং দাবি করেছেন, ম্যান্ডেলসন তার কাছে প্রকৃত তথ্য গোপন করেছিলেন। তবে বিরোধীরা অভিযোগ করছে, পুরো ঘটনা সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা ও স্টারমারের বিচারবোধকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। লেবার পার্টির ভেতরেও এ নিয়ে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
সরকারের এক মুখপাত্র বলেন, সংসদের নির্দেশনা পূরণে সরকার সম্পূর্ণভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি জানান, দ্বিতীয় দফার এই নথি প্রকাশ পার্লামেন্টের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ নথি প্রকাশ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং পুরো প্রক্রিয়া স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পন্ন করা হয়েছে।
তবে প্রকাশিত নথিগুলোতে কিছু তথ্য গোপন রাখা হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রধান সচিব ড্যারেন জোন্স জানিয়েছেন, জাতীয় নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং নিম্নপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার স্বার্থে কিছু অংশ সম্পাদনা বা মুছে ফেলা হয়েছে। এ ধরনের পদক্ষেপ পূর্ববর্তী সরকারগুলোর অনুসৃত নীতির সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এদিকে লন্ডনের মেট্রোপলিটন পুলিশ সরকারের কাছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়েছে। চলমান তদন্তের স্বার্থে এসব নথি প্রকাশ করা হলে তদন্ত ও সম্ভাব্য বিচারিক কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে পুলিশের আশঙ্কা। বিশেষ করে ম্যান্ডেলসনের নিরাপত্তা যাচাই প্রক্রিয়ার সারসংক্ষেপসহ কিছু নথি আপাতত গোপন রাখার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
মেট্রোপলিটন পুলিশের এক মুখপাত্র বলেন, সরকারি দায়িত্ব পালনে অসদাচরণের অভিযোগে চলমান তদন্তের ক্ষেত্রে যথাযথ আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এমন কোনো তথ্য প্রকাশ করা উচিত নয়, যা তদন্ত বা ভবিষ্যৎ বিচারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ম্যান্ডেলসন কেলেঙ্কারির সূত্রপাত হয় তার রাষ্ট্রদূত নিয়োগের পর। নিরাপত্তা যাচাই সংস্থা ইউকেএসভি প্রথমে তার জন্য উচ্চস্তরের নিরাপত্তা অনুমোদন না দেওয়ার সুপারিশ করলেও পরবর্তীতে পররাষ্ট্র দপ্তর তাকে সেই অনুমোদন দেয়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের একটি কংগ্রেসীয় কমিটি প্রকাশিত নথিতে দেখা যায়, ম্যান্ডেলসন জেফরি এপস্টেইনকে তার “সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু” হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। এরপর পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে ওঠে এবং কয়েক দিনের মধ্যেই তাকে রাষ্ট্রদূতের পদ থেকে অপসারণ করা হয়।
পরবর্তী সময়ে ম্যান্ডেলসন প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ করেন এবং এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখাকে ভুল বলে স্বীকার করেন। তবে অভিযোগ আরও গভীর হলে তিনি লেবার পার্টি থেকেও পদত্যাগ করেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সরকারি দায়িত্ব পালনে অসদাচরণের অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর থেকেই তার নিয়োগ ও নিরাপত্তা অনুমোদন প্রক্রিয়া নিয়ে সরকার তীব্র চাপে রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন নথি প্রকাশের পর কিয়ার স্টারমার সরকারের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে নথিগুলোতে যদি ম্যান্ডেলসনের নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন তথ্য বা অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের বিবরণ উঠে আসে, তবে তা ব্রিটিশ রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।