
যুক্তরাজ্যের সাবেক মন্ত্রী ও কূটনীতিক পিটার ম্যান্ডেলসনকে যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ এবং পরবর্তীতে তাকে অপসারণের ঘটনাকে ঘিরে এক হাজারেরও বেশি পৃষ্ঠার সরকারি নথি প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সরকার। প্রকাশিত নথিগুলোতে ম্যান্ডেলসনের নিয়োগ প্রক্রিয়া, অভ্যন্তরীণ আলোচনা, উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মতামত এবং তার অপসারণ-পরবর্তী আর্থিক দাবির বিষয় উঠে এসেছে।
সরকারি নথি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারকে ম্যান্ডেলসনকে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগের আগে সতর্ক করা হয়েছিল যে, দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে তার অতীত সম্পর্ক সরকারের জন্য ‘সাধারণ সুনামগত ঝুঁকি’ তৈরি করতে পারে। তবুও ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তাকে যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
নথিতে আরও দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জোনাথন পাওয়েল একটি তথ্যানুসন্ধানী আলোচনায় এই নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ‘অস্বাভাবিকভাবে তাড়াহুড়ো করা’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। তিনি নিয়োগের গতি ও পদ্ধতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
এদিকে ম্যান্ডেলসনের চাকরিচ্যুতি-পরবর্তী আর্থিক দাবিও আলোচনায় এসেছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তিনি চাকরি হারানোর পর ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৫ লাখ ৪৭ হাজার ২০১ পাউন্ড দাবি করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। তবে বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, ম্যান্ডেলসন এ দাবির সঙ্গে একমত নন। তার দাবি, তিনি কখনোই কর্মসংস্থান ট্রাইব্যুনালে যাওয়ার পরিকল্পনা করেননি এবং বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ ট্রেজারি তাকে ৭৫ হাজার পাউন্ড পরিশোধে সম্মত হয়।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্যরা ম্যান্ডেলসনের নিয়োগসংক্রান্ত নথি প্রকাশের পক্ষে ভোট দেন। শুরুতে প্রধানমন্ত্রী স্টারমার জাতীয় নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষতির আশঙ্কা দেখিয়ে নথি প্রকাশে অনীহা প্রকাশ করলেও পরে দলীয় ও রাজনৈতিক চাপের মুখে অবস্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হন। সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রেইনারসহ লেবার পার্টির একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা নথি প্রকাশের পক্ষে মত দেন।
পরবর্তীতে সরকার বিষয়টি তদারকির জন্য সংসদের বহুদলীয় গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা কমিটি (আইএসসি)-কে সম্পৃক্ত করে। সংবেদনশীল নথিগুলো পর্যালোচনা করে কোন তথ্য প্রকাশ করা যাবে এবং কোনটি গোপন রাখা হবে, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয় কমিটিকে। এর আগে মার্চ মাসে প্রথম দফায় কিছু নথি প্রকাশ করা হয়েছিল।
সর্বশেষ প্রকাশিত নথিগুলো তিনটি পৃথক খণ্ডে সাজানো হয়েছে। প্রথম খণ্ডে ৫৯৮ পৃষ্ঠা, দ্বিতীয় খণ্ডে ৫৫৪ পৃষ্ঠা এবং তৃতীয় খণ্ডে ৩৫২ পৃষ্ঠা রয়েছে। এসব নথির মধ্যে হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা, ই-মেইল, সরকারি চিঠিপত্র এবং রাজনীতিকদের পারস্পরিক যোগাযোগের রেকর্ড অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
নথিগুলোর একটি অংশে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে উপহার দেওয়ার জন্য ব্রিটিশ সরকারের ঐতিহ্যবাহী ‘রেড ডিসপ্যাচ বক্স’ তৈরির পরিকল্পনার কথাও উঠে এসেছে। এ নিয়ে ম্যান্ডেলসন ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা হয়েছিল। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জটিলতা দেখা দিলে ম্যান্ডেলসন এক বার্তায় পুরো ঘটনাকে জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যঙ্গধর্মী টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘দ্য থিক অব ইট’-এর কাহিনির সঙ্গে তুলনা করেন। তৎকালীন পররাষ্ট্র দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তা অলি রবিনস মত দেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের জন্য ব্রিটিশ মন্ত্রীদের ব্যবহৃত লাল বাক্সের আদলে একটি বিশেষ উপহার তৈরি করা হলে সেটি ট্রাম্পের কাছে অত্যন্ত অর্থবহ হবে।
উল্লেখ্য, ম্যান্ডেলসনকে রাষ্ট্রদূতের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার নয় মাস পর তার বিরুদ্ধে সরকারি পদে অসদাচরণের অভিযোগে ফৌজদারি তদন্ত শুরু হয়। যদিও তিনি বারবার দাবি করে আসছেন যে, তিনি কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না, ব্যক্তিগত লাভের জন্য ক্ষমতার অপব্যবহার করেননি এবং তদন্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পূর্ণ সহযোগিতা করছেন।
নতুন প্রকাশিত নথিগুলো যুক্তরাজ্যের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য সামনে আনবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা।