দক্ষিণ ইংল্যান্ডের সাউদাম্পটনে ছুরিকাঘাতে নিহত ১৮ বছর বয়সী ছাত্র হেনরি নোভাক মৃত্যুর আগে পুলিশকে বারবার জানিয়েছিলেন যে তিনি শ্বাস নিতে পারছেন না এবং তাকে ছুরি মারা হয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত পুলিশ কর্মকর্তাদের বডিক্যাম ফুটেজে এই মর্মান্তিক ঘটনার বিস্তারিত উঠে এসেছে।
২০২৫ সালে সংঘটিত ওই ঘটনায় হত্যাকারী ভিকরুম দিগওয়া ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশকে বিভ্রান্ত করে দাবি করেছিলেন যে তিনি বর্ণবাদী হামলার শিকার হয়েছেন। তার এই বক্তব্যের ভিত্তিতে পুলিশ গুরুতর আহত হেনরি নোভাককেই সন্দেহভাজন হিসেবে হাতকড়া পরায়। ফুটেজে দেখা যায়, মাটিতে শুয়ে থাকা নোভাক বারবার বলছেন, “আমাকে ছুরি মারা হয়েছে” এবং “আমি শ্বাস নিতে পারছি না”। কিন্তু এক পর্যায়ে একজন পুলিশ কর্মকর্তা তাকে বলেন, “আমার মনে হয় না তোমাকে ছুরি মারা হয়েছে।”
তদন্তে জানা যায়, নোভাকের পায়ে একাধিক ছুরিকাঘাতের পাশাপাশি হৃদপিণ্ডে একটি মারাত্মক আঘাত করা হয়েছিল। দিগওয়া ২১ সেন্টিমিটার দীর্ঘ একটি ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা চালিয়েছিলেন। আদালত তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে এবং কমপক্ষে ২১ বছর কারাভোগের নির্দেশ দিয়েছে।
নোভাকের পরিবার পুলিশের আচরণকে “অমানবিক ও অপমানজনক” বলে আখ্যায়িত করেছে। তার বাবা মার্ক নোভাক বলেন, “হেনরি নয়বার বলেছিল যে সে শ্বাস নিতে পারছে না। চারবার বলেছিল তাকে ছুরি মারা হয়েছে। তবুও তাকে মাটির ওপর টেনে নিয়ে হাতকড়া পরানো হয়।” তিনি আরও বলেন, তার ছেলের প্রতি এবং দিগওয়ার প্রতি পুলিশের আচরণের পার্থক্য ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক।
প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, একজন পুলিশ কর্মকর্তা আহত নোভাকের পরিচয় জানতে চাইলে তিনি দুর্বল কণ্ঠে নিজের নাম বলেন। এরপর দিগওয়া সামনে এসে অভিযোগ করেন যে নোভাক তার পাগড়ি খুলে ফেলেছিলেন এবং চুল টেনেছিলেন। পুলিশ তখন দিগওয়ার আঘাতের বিষয়ে জানতে চায়, আর তিনি চোখের কাছে ফোলা ও সামান্য আঘাতের কথা উল্লেখ করেন।
এরপর পুলিশ নোভাকের দিকে মনোযোগ দেয়। তিনি বারবার বলেন যে তাকে ছুরি মারা হয়েছে এবং তিনি শ্বাস নিতে পারছেন না। পুলিশ তার শরীরের সামান্য অংশ পরীক্ষা করলেও গুরুতর আঘাত শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়। এক পর্যায়ে একজন নারী কর্মকর্তা প্রশ্ন করেন, “তার কোথায় ছুরি মারা হয়েছে বলে মনে হয়? মুখে?” জবাবে আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, “তাকে ছুরি মারা হয়নি।”
অচেতন হয়ে পড়ার আগেই নোভাককে হামলার অভিযোগে গ্রেপ্তারের কথা জানানো হয়। পরে তার অবস্থার অবনতি হলে পুলিশ সিপিআর শুরু করে। হ্যাম্পশায়ার পুলিশের ডেপুটি চিফ কনস্টেবল রবার্ট ফ্রান্স জানান, কর্মকর্তারা নোভাকের সঙ্গে যোগাযোগের তিন মিনিটের মধ্যেই তাকে বাঁচানোর চেষ্টা শুরু করেছিলেন। তিনি বলেন, “এটি একটি ভয়াবহ ট্র্যাজেডি। হেনরিকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি বলে আমি দুঃখিত। তিনি অচেতন হওয়ার সময় হাতকড়া পরা ও গ্রেপ্তার অবস্থায় ছিলেন, এ বিষয়েও আমি দুঃখ প্রকাশ করছি।”
ফ্রান্স আরও জানান, আদালতে সাক্ষ্য দেওয়া প্যাথলজিস্টের মতে নোভাকের আঘাত এতটাই গভীর ও অভ্যন্তরীণ ছিল যে ঘটনাস্থলে উপস্থিত কর্মকর্তাদের পক্ষে তার জীবন রক্ষা করা সম্ভব ছিল না।
ঘটনাটি নিয়ে স্বাধীন পুলিশ আচরণ তদারকি সংস্থা (আইওপিসি) পৃথক তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, তারা ঘটনাস্থলের সমস্ত বডিক্যাম ফুটেজ, আদালতে উপস্থাপিত প্রমাণ এবং অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করে পুলিশের ভূমিকা পর্যালোচনা করছে।
এদিকে ব্রিটিশ অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় জানিয়েছে, দিগওয়ার সাজা যথেষ্ট কঠোর হয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখার জন্য একাধিক আবেদন জমা পড়েছে। আইন অনুযায়ী বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য কর্তৃপক্ষের হাতে ২৮ দিন সময় রয়েছে।
ঘটনাটি ব্রিটেনজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়েভেট কুপার সংসদে একে “ভয়াবহ ও মর্মান্তিক” ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারও একে “ভয়ঙ্কর ও হৃদয়বিদারক” বলে অভিহিত করে ছুরি হামলা প্রতিরোধে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
দিগওয়া দাবি করেছিলেন যে তিনি শিখ ধর্মীয় বিশ্বাসের অংশ হিসেবে অস্ত্রটি বহন করতেন। তবে শিখ সংগঠনগুলো স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্রটি ঐতিহ্যগত ‘কিরপান’ ছিল না। তারা এই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, অভিযুক্তের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে শিখ ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই।
হেনরি নোভাকের পরিবার এখনো ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় রয়েছে। তাদের দাবি, ছেলেটির মৃত্যুর আগে তার আর্তনাদ যথাযথ গুরুত্ব পেলে অন্তত ঘটনাটির চিত্র ভিন্ন হতে পারত। পুলিশের ভূমিকা নিয়ে চলমান তদন্তের ফলাফলের দিকে এখন তাকিয়ে আছে পুরো দেশ।