
১৮ বছরের কম বয়সী শিশু-কিশোরদের স্মার্টফোন ও অন্যান্য ডিভাইসে নগ্ন বা যৌন স্পষ্টতাসম্পন্ন ছবি দেখা, তোলা কিংবা শেয়ার করার সুযোগ বন্ধে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যাপল ও গুগলসহ বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর প্রতি কঠোর অবস্থান নিয়েছে যুক্তরাজ্য সরকার। প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার জানিয়েছেন, আগামী তিন মাসের মধ্যে স্বেচ্ছায় প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর না করলে সরকার এ বিষয়ে আইন প্রণয়ন করবে।
লন্ডন টেক উইকে দেওয়া এক বক্তব্যে স্টারমার বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে উদ্ভাবনী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এটি কোনো অসম্ভব কাজ নয়। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা প্রযুক্তিগত সমাধান বের করতে সক্ষম। তিনি জানান, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের বিদ্যমান নিরাপত্তা সুবিধা চালু করতে হবে অথবা সফটওয়্যার হালনাগাদ করে এমন ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে অপ্রাপ্তবয়স্করা নগ্ন বা যৌন স্পষ্টতাসম্পন্ন ছবি দেখতে, পাঠাতে বা গ্রহণ করতে না পারে।
সরকার জানিয়েছে, নতুন ও বর্তমানে ব্যবহৃত—উভয় ধরনের স্মার্টফোন ও ট্যাবলেটের ক্ষেত্রেই এই ব্যবস্থা কার্যকর করা হবে। প্রয়োজন হলে আইন করে অপারেটিং সিস্টেম নির্মাতা, ডিভাইস সরবরাহকারী এবং খুচরা বিক্রেতাদেরও এর আওতায় আনা হতে পারে। তবে বয়স যাচাই করা প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে এসব বিধিনিষেধ প্রযোজ্য হবে না।
প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গুগল এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গভীরভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং যুক্তরাজ্য সরকারের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে কাজ করছে, যাতে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করে ক্ষতিকর কনটেন্টের বিস্তার রোধ করা যায়।
অন্যদিকে অ্যাপল ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্যে ব্যবহারকারীদের বয়স যাচাইয়ের ব্যবস্থা চালু করেছে। প্রতিষ্ঠানটির ‘কমিউনিকেশন সেফটি’ ফিচার শিশুদের কাছে নগ্ন ছবি বা ভিডিও পাঠানো বা গ্রহণের সময় সতর্কবার্তা প্রদান করে। এই সুবিধা ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু থাকে এবং অভিভাবকেরা পারিবারিক সেটিংসের মাধ্যমে তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।
শিশু সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে সরকারকে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছে। তাদের মতে, অনলাইন গ্রুমিং, যৌন হয়রানি ও ‘সেক্সটরশন’-এর মতো অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে শিশুদের দ্বারা তৈরি ও শেয়ার করা যৌনধর্মী ছবির ভূমিকা উদ্বেগজনক।
সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে অনলাইনে শিশু যৌন নির্যাতন সংক্রান্ত রিপোর্টগুলোর ৯১ শতাংশেই শিশুদের নিজের তৈরি করা ছবি বা ভিডিও ছিল। এছাড়া বর্তমানে গড়ে ১৩ বছর বয়সের মধ্যেই অধিকাংশ শিশু পর্নোগ্রাফির সংস্পর্শে আসছে।
এদিকে শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ওপরও নতুন বিধিনিষেধ আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নতুন নীতিমালার ঘোষণা দিতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। সরকারের বিবেচনায় থাকা প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা এবং বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের আসক্তিমূলক ফিচার নিষিদ্ধ করা।
তবে সরকারের এই উদ্যোগের সমালোচনাও শুরু হয়েছে। নাগরিক অধিকারবিষয়ক সংগঠন বিগ ব্রাদার ওয়াচের পরিচালক সিলকি কার্লো অভিযোগ করেছেন, শিশুদের সুরক্ষার নামে সরকার কার্যত ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্য পরিচয়পত্র যাচাইয়ের ব্যবস্থা চালু করতে চাইছে, যা ব্যক্তিগত স্বাধীনতার জন্য উদ্বেগজনক।
একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ওপেন রাইটস গ্রুপ। সংগঠনটির প্ল্যাটফর্ম পাওয়ার প্রোগ্রাম ম্যানেজার জেমস বেকার বলেন, এ ধরনের ব্যবস্থা প্রতিটি স্মার্টফোনকে নজরদারির যন্ত্রে পরিণত করতে পারে। তবে সরকার এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, নতুন নীতিমালার উদ্দেশ্য নজরদারি নয়, বরং শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
শিশু কল্যাণ সংস্থা এনএসপিসিসির প্রধান নির্বাহী ক্রিস শেরউড সরকারের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার সময় এসে গেছে। শিশুদের নিরাপত্তার স্বার্থে দ্রুত কার্যকর পরিবর্তন বাস্তবায়নের আহ্বান জানান তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর সরকারের এই চাপ শিশু সুরক্ষায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। তবে একই সঙ্গে এটি গোপনীয়তা, স্বাধীনতা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের অধিকার নিয়ে নতুন বিতর্কও সৃষ্টি করবে।