
ব্রিটেনে অবৈধ মিনি-মার্ট, ভেপ শপ ও বারবারশপের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে নতুন আইন আনতে যাচ্ছে সরকার। নতুন এই আইনের আওতায় অপরাধে জড়িত দোকানগুলোকে সর্বোচ্চ ১২ মাস পর্যন্ত বন্ধ রাখার ক্ষমতা পাবে কর্তৃপক্ষ। বিবিসি নিউজের দীর্ঘ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পর সরকার এই পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
গত কয়েক মাসে বিবিসির একাধিক অনুসন্ধানে উঠে আসে, ব্রিটেনের বিভিন্ন শহরের বহু দোকানকে কেন্দ্র করে মাদক ব্যবসা, শিশু যৌন শোষণ, অর্থপাচার ও অবৈধ অভিবাসনসংক্রান্ত অপরাধ পরিচালিত হচ্ছে। বিশেষ করে অবৈধ সিগারেট, ভেপ ও মাদক বিক্রির সঙ্গে সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের জড়িত থাকার তথ্য প্রকাশ্যে আসে।
বর্তমানে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে বিদ্যমান আইনে কোনো দোকান সর্বোচ্চ তিন মাসের জন্য বন্ধ করা যায়, যা বিশেষ পরিস্থিতিতে ছয় মাস পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব। তবে নতুন আইনের মাধ্যমে সেই সময়সীমা দ্বিগুণ করে ১২ মাস পর্যন্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে ব্রিটেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ বলেন, দেশের অনেক মানুষ মনে করছেন যে তাদের এলাকার হাই স্ট্রিটগুলো ধীরে ধীরে সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র ও অভিবাসন-সংশ্লিষ্ট অপরাধের দখলে চলে যাচ্ছে। সরকার এ ধরনের পরিস্থিতি কোনোভাবেই মেনে নেবে না। তিনি বলেন, এ ধরনের অপরাধ সাধারণ মানুষের শুধু নিজ এলাকার প্রতি নয়, বরং গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতিও আস্থা নষ্ট করে দেয়।
ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতে, দীর্ঘ সময় দোকান বন্ধ রাখার সুযোগ পেলে তদন্তকারী সংস্থাগুলো অপরাধের প্রমাণ সংগ্রহ, মালিকদের শনাক্তকরণ এবং বিচারের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য আরও বেশি সময় পাবে। একই সঙ্গে অপরাধীরা সাময়িক বন্ধের পর পুনরায় দোকান খুলে অবৈধ কার্যক্রম চালানোর সুযোগও কমে যাবে।
এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন ট্রেডিং স্ট্যান্ডার্ডস কর্মকর্তারা। চার্টার্ড ট্রেডিং স্ট্যান্ডার্ডস ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহী জন হেরিমান বলেন, সন্দেহজনক ও অবৈধ দোকানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে “ক্লোজার অর্ডার” অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি হাতিয়ার। তার মতে, নতুন এই ক্ষমতার পক্ষে প্রায় সর্বসম্মত সমর্থন রয়েছে।
সম্প্রতি বিবিসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদের সঙ্গে বার্মিংহামের হ্যান্ডসওর্থ এলাকার সোহো রোডে পরিচালিত একাধিক অভিযানে অংশ নেয়। ওই এলাকায় পরিচালিত অভিযানে পুলিশ ও ট্রেডিং স্ট্যান্ডার্ডস কর্মকর্তারা একটি দোকান থেকে অবৈধ সিগারেট ও নিষিদ্ধ তামাকজাত দ্রব্য উদ্ধার করেন। এছাড়া দোকানের কাউন্টারের নিচ থেকে পেরেক লাগানো একটি কাঠের অস্ত্রও পাওয়া যায়। এ ঘটনায় এক দোকানকর্মীকে আটক করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, সোহো রোড এলাকায় প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি, যৌন শোষণ, সহিংসতা ও অবৈধ ব্যবসা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ওয়েস্ট মিডল্যান্ডস পুলিশের কর্মকর্তা ভিক্টোরিয়া গন্ট বলেন, তিনি তার কর্মজীবনে এত খারাপ পরিস্থিতি আর কোথাও দেখেননি। তার দাবি, ওই এলাকার দোকানগুলোতে প্রেসক্রিপশন ওষুধ থেকে শুরু করে কোকেন, হেরোইন ও গাঁজাও বিক্রি হচ্ছে।
বিবিসির এক আন্ডারকভার প্রতিবেদক সোহো রোডের প্রায় এক ডজন দোকানে গিয়ে মাত্র ৩ পাউন্ডে নকল সিগারেট বিক্রির প্রমাণ পান, যেখানে বৈধ সিগারেটের একটি প্যাকেটের দাম ১৬ থেকে ১৯ পাউন্ডের মধ্যে।
গত ১৪ মাস ধরে বিবিসির ধারাবাহিক অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, কীভাবে সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র ব্রিটেনের বিভিন্ন শহরের হাই স্ট্রিটগুলো নিয়ন্ত্রণে নিচ্ছে। এর মধ্যে গোপন ভূগর্ভস্থ টানেলের মাধ্যমে অবৈধ সিগারেট সরবরাহ, নগদ টাকায় দোকান কেনাবেচা এবং কুর্দি অপরাধচক্রের দেশজুড়ে নেটওয়ার্ক পরিচালনার তথ্যও প্রকাশ পেয়েছে।
এর আগে সরকার দেশজুড়ে সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে ৩০ মিলিয়ন পাউন্ড ব্যয়ে নতুন “হাই স্ট্রিট অর্গানাইজড ক্রাইম ইউনিট” গঠনের ঘোষণা দেয়। নতুন ইউনিটের আওতায় অতিরিক্ত পুলিশ, ট্রেডিং স্ট্যান্ডার্ডস কর্মকর্তা, কর অভিযান এবং অবৈধ কর্মসংস্থানের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হবে।
ব্রিটিশ সরকার জানিয়েছে, নতুন এই আইন চলতি বছরের শেষ নাগাদ কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে এবং ২০২৭ সালের শুরু থেকে তা বাস্তবায়ন শুরু হতে পারে।