
গত চার বছরে (২০২২-২০২৬) যুক্তরাজ্য চারজন প্রধানমন্ত্রী দেখেছে: বরিস জনসন, লিজ ট্রাস, ঋষি সুনাক এবং কিয়ার স্টারমার। স্টারমারের সাম্প্রতিক পদত্যাগের ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে এই ঘন ঘন পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ব্রেক্সিট-পরবর্তী এক দশকে ছয়জনের বেশি প্রধানমন্ত্রী বদল হয়েছে। এটি আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং ব্রিটিশ রাজনীতির নতুন বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কেন এত দ্রুত পরিবর্তন?
প্রধান কারণ ব্রেক্সিটের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব। ২০১৬ সালের গণভোটের পর দেশটি গভীর রাজনৈতিক বিভাজনে পড়ে যায়। থেরেসা মে ব্রেক্সিট চুক্তি পাস করাতে ব্যর্থ হন এবং পদত্যাগ করেন। বরিস জনসন চুক্তি সম্পন্ন করলেও ‘পার্টিগেট’ কেলেঙ্কারি, অভ্যন্তরীণ দলীয় বিদ্রোহ এবং অর্থনৈতিক চাপে টিকতে পারেননি।
তারপর লিজ ট্রাসের মাত্র ৪৫ দিনের শাসনকালে ‘মিনি-বাজেট’ বাজারে বড় ধস নামিয়ে তাঁকে ইতিহাসের সবচেয়ে স্বল্পকালীন প্রধানমন্ত্রী বানিয়ে দেয়। ঋষি সুনাক স্থিতিশীলতা আনার চেষ্টা করেও মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হন। ২০২৪ সালে কিয়ার স্টারমার লেবার পার্টিকে বিপুল জয় এনে দিলেও দুই বছরের মাথায় স্থানীয় নির্বাচনে ভরাডুবি ও দলীয় চাপে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
গভীর কাঠামোগত সমস্যা
এই পরিবর্তনের পেছনে শুধু ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, কয়েকটি গভীর কারণ রয়েছে। প্রথমত, সোশ্যাল মিডিয়া ও ২৪ ঘণ্টার সংবাদচক্র ভোটারদের ধৈর্য অনেক কমিয়ে দিয়েছে। জটিল সমস্যা যেমন-অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, এনএইচএসের সংকট, আবাসন ও অভিবাসন-রাতারাতি সমাধান সম্ভব নয়, কিন্তু মানুষ দ্রুত ফল দেখতে চায়।
দ্বিতীয়ত, দলীয় নেতৃত্ব নির্বাচন পদ্ধতি। কনজারভেটিভ ও লেবার উভয় দলেই সংসদীয় দলের চাপে নেতা সহজেই বদল হয়। তৃতীয়ত, এটি পশ্চিমা গণতন্ত্রের বৃহত্তর সংকটের অংশ। ইউরোপজুড়ে ঐতিহ্যবাহী দলগুলো চাপে পড়ছে এবং জনতাবাদী শক্তি উঠে আসছে।
এর প্রভাব কতটা গুরুতর?
ঘন ঘন নেতৃত্ব পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদি নীতি গ্রহণকে কঠিন করে তোলে। আমলাতন্ত্র, ব্যবসায়ী সমাজ ও আন্তর্জাতিক অংশীদাররা স্থিতিশীলতার অভাবে ভোগেন। ব্রিটেনের বৈশ্বিক প্রভাবও কমে যায়। তবে এর একটি ইতিবাচক দিকও আছে-এটি জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে।
পরিশেষে বলতে হয়,ব্রিটেন এখন একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। নতুন নেতা (সম্ভাব্য অ্যান্ডি বার্নহাম বা অন্য কেউ) যতই আসুন, মূল চ্যালেঞ্জ একই রয়ে গেছে। ব্রেক্সিট-পরবর্তী ব্রিটেনকে একটি স্থিতিশীল, সমৃদ্ধ ও ঐক্যবদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব কি না। যদি না হয়, তাহলে এই ঘূর্ণায়মান দরজা আরও দীর্ঘদিন চলতে থাকবে।
নূর আলম সিদ্দিকী রাসেল
আইনবিদ, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক