
লন্ডনের ব্যস্ত রেলস্টেশনগুলোতে অপরাধী শনাক্ত করতে চালু করা লাইভ ফেসিয়াল রিকগনিশন (এলএফআর) প্রযুক্তি নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ব্রিটিশ ট্রান্সপোর্ট পুলিশের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি থেকে রাজধানীর বিভিন্ন স্টেশনে প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার যাত্রীর মুখ স্ক্যান করা হলেও একজনও প্রকৃত অপরাধী শনাক্ত করা যায়নি। বরং যে একজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, পরবর্তীতে সেটিও ভুল শনাক্তকরণ বলে প্রমাণিত হয়েছে।
অপরাধপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত লন্ডনের ব্যস্ততম রেলস্টেশনগুলোতে এই প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করে ব্রিটিশ ট্রান্সপোর্ট পুলিশ। এ পর্যন্ত ১৩টি পৃথক অভিযানে প্রায় ৫০ ঘণ্টা ধরে ক্যামেরা পরিচালনা করা হয়েছে। তবে এত বড় পরিসরে নজরদারি চালিয়েও কোনো ওয়ান্টেড অপরাধীকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
পুলিশের তথ্যমতে, ওয়াটারলু স্টেশনে ৯২ হাজার ৭৮৪ জন, ইউস্টনে ৭১ হাজার ৯৪৫ জন, ভিক্টোরিয়ায় ৫১ হাজার ৯৪৮ জন, কিংস ক্রসে ৪৫ হাজার ৩৩২ জন, সেন্ট প্যানক্রাসে ১৭ হাজার ৪৭৮ জন, লিভারপুল স্ট্রিটে ১৭ হাজার ২১৯ জন এবং লন্ডন ব্রিজ স্টেশনে ১৬ হাজার ১৫৬ জনের মুখমণ্ডল স্ক্যান করা হয়েছে।
কিংস ক্রস স্টেশনে ফেব্রুয়ারি মাসে একজন ব্যক্তির মুখ প্রযুক্তির মাধ্যমে সন্দেহজনক হিসেবে শনাক্ত হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী যাচাই-বাছাইয়ে দেখা যায়, সেটি ছিল একটি ভুল সংকেত বা ‘ফলস অ্যালার্ম’।
নাগরিক অধিকার সংগঠন বিগ ব্রাদার ওয়াচ এই ফলাফলকে উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছে। সংগঠনটির মতে, প্রতিদিন লাখো লন্ডনবাসী স্টেশন ব্যবহার করেন এবং তাদের অনেকেই না জেনেই ডিজিটাল পুলিশি নজরদারির আওতায় চলে যাচ্ছেন। নিরীহ মানুষকে তাদের দৈনন্দিন যাতায়াতের সময় এমন অনুপ্রবেশমূলক পরিচয় যাচাইয়ের মুখোমুখি করা নাগরিক স্বাধীনতার জন্য হুমকিস্বরূপ।
তবে ব্রিটিশ ট্রান্সপোর্ট পুলিশ বলছে, ভুল শনাক্তকরণ এড়াতে তারা ইচ্ছাকৃতভাবে উচ্চ মাত্রার নির্ভুলতার মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে। কোনো সতর্ক সংকেত পাওয়া গেলেও কর্মকর্তারা সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়ার আগে তা মানবিকভাবে যাচাই করেন। তাদের দাবি, এই প্রযুক্তি এককভাবে নয়, বরং অতিরিক্ত পুলিশি উপস্থিতি ও অন্যান্য নিরাপত্তা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
পুলিশ আরও জানিয়েছে, ফেসিয়াল রিকগনিশন অভিযানের সময় মোট ১৩ জনকে বিভিন্ন অপরাধে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া অন্য পুলিশ বাহিনীর খোঁজে থাকা আরও চারজনকে শনাক্ত করে আটক করা হয়। যদিও এসব গ্রেপ্তার সরাসরি ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তির মাধ্যমে নয়, বরং মাঠপর্যায়ের পুলিশি তৎপরতার ফলে হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
এদিকে রেলস্টেশন ছাড়াও যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন খুচরা বিক্রয় প্রতিষ্ঠানে ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ফেসওয়াচের পরিচালিত এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে দোকানে প্রবেশকারী ক্রেতাদের মুখ স্ক্যান করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি ৯৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ নির্ভুলতার দাবি করলেও বাস্তবে একাধিক ভুল শনাক্তকরণের ঘটনা সামনে এসেছে।
সম্প্রতি উলউইচের একটি স্পোর্টস ডাইরেক্ট শাখায় আনামারিয়া নামে এক মাকে প্রকাশ্যে চোর বলে অভিযুক্ত করা হয়। পরে তিনি প্রমাণ করেন যে অভিযোগটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ছিল। একইভাবে ফেব্রুয়ারিতে সাইনসবারির এক ক্রেতাকে ভুলবশত চোর সন্দেহে দোকান থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনাও ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।
অন্যদিকে লন্ডনের মেট্রোপলিটন পুলিশ, যারা দেশটিতে প্রথম স্থায়ী লাইভ ফেসিয়াল রিকগনিশন ক্যামেরা স্থাপন করেছে, তারা এই কর্মসূচি আরও সম্প্রসারণের ঘোষণা দিয়েছে। পুলিশের দাবি, ক্রয়ডনে ছয় মাসের ব্যবহারে এই প্রযুক্তির সহায়তায় ১৭৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যার মধ্যে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে পলাতক থাকা এক নারীও ছিলেন।
যদিও প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে, তবু অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোর অনেক বাসিন্দা এটিকে সমর্থন করছেন। তাদের মতে, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত নজরদারি প্রয়োজন। তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, যখন অনেক অপরাধী মুখ ঢেকে চলাফেরা করে, তখন এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা কতটা বাস্তবসম্মত, সেই উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।