
যুক্তরাজ্যের সড়কজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক নজরদারি ক্যামেরার ব্যবহার দ্রুত বাড়ানো হচ্ছে। এর ফলে বিভিন্ন ধরনের ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে চালকদের সর্বোচ্চ এক হাজার পাউন্ড পর্যন্ত জরিমানার মুখে পড়তে হতে পারে বলে সতর্ক করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
বর্তমানে যুক্তরাজ্যে প্রায় ১২ হাজার স্বয়ংক্রিয় নম্বরপ্লেট শনাক্তকারী (এএনপিআর) ক্যামেরা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব ক্যামেরা প্রতিদিন ১০ কোটিরও বেশি গাড়ির নম্বরপ্লেট স্ক্যান করে। স্ক্যানের মাধ্যমে কোনো গাড়ির বৈধ বীমা, রোড ট্যাক্স এবং এমওটি (যানবাহনের নিরাপত্তা পরীক্ষার সনদ) রয়েছে কি না, তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাচাই করা হয়।
শুধু যানবাহনের নথিপত্রই নয়, বিভিন্ন স্থানীয় কাউন্সিল এখন এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনাও শনাক্ত করছে। গ্লুচেস্টারশায়ারে নতুন এএনপিআর ক্যামেরার মাধ্যমে অবৈধভাবে মোড় নেওয়া, বাস লেনে গাড়ি চালানো এবং ইয়েলো বক্স জংশনে অযথা গাড়ি থামানোর মতো অপরাধ নজরদারিতে রাখা হচ্ছে।
এই প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে এএনপিআর ক্যামেরার অবস্থান জানতে মানুষের আগ্রহও বেড়েছে। গত এক বছরে এসব ক্যামেরার অবস্থান সম্পর্কিত অনলাইন অনুসন্ধান ৩৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
এদিকে নতুন সড়ক নিরাপত্তা কৌশলের অংশ হিসেবে যানবাহনের রোড ট্যাক্স বা ভেহিকেল এক্সসাইজ ডিউটি পরিশোধ না করা চালকদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে যুক্তরাজ্য সরকার। পরিবহন বিভাগের প্রস্তাব অনুযায়ী, ট্যাক্সবিহীন গাড়ি চালাতে ধরা পড়লে জরিমানার পাশাপাশি চালকের লাইসেন্সে পেনাল্টি পয়েন্ট যোগ হতে পারে। একই সঙ্গে প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সংশ্লিষ্ট যানবাহন জব্দ করার অতিরিক্ত ক্ষমতাও দেওয়া হতে পারে।
বর্তমানে ট্যাক্স ছাড়া গাড়ি চালানোর জন্য ৮০ পাউন্ড নির্ধারিত জরিমানা রয়েছে। তবে বিষয়টি আদালতে গেলে জরিমানার পরিমাণ এক হাজার পাউন্ড অথবা বকেয়া করের পাঁচ গুণ—যেটি বেশি, সেটি পর্যন্ত হতে পারে।
কঠোর নজরদারির কারণে চালকদের মধ্যে রোড ট্যাক্স সময়মতো পরিশোধের প্রবণতাও বেড়েছে। গত এক বছরে মাসিক কিস্তিতে রোড ট্যাক্স পরিশোধ সম্পর্কিত অনলাইন অনুসন্ধান ১ হাজার ৬১৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, অনেক চালক এককালীন অর্থ পরিশোধের পরিবর্তে মাসিক কিস্তির সুবিধা নিয়ে আইন মেনে চলতে আগ্রহী হচ্ছেন।
অন্যদিকে মোটরযান-সংক্রান্ত মামলার নিষ্পত্তিতেও আগের তুলনায় বেশি সময় লাগছে। বিচার মন্ত্রণালয়ের অপরাধ আদালতের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১৬ সালের তুলনায় বর্তমানে বিচারাধীন মোটরযান-সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা ২৯ শতাংশ বেড়েছে। একই সঙ্গে এসব মামলার নিষ্পত্তির গড় সময় দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। ফলে এক দশক আগের তুলনায় অনেক চালককে এখন প্রায় তিন মাস বেশি অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
ভার্টু বিওয়াইডি হার্টলপুলের জেনারেল ম্যানেজার জ্যাক রহমান বলেছেন, এএনপিআর ক্যামেরার সংখ্যা বাড়তে থাকায় চালকদের উচিত গাড়ির সব নথিপত্র হালনাগাদ রাখা। তার ভাষায়, বর্তমানে অনলাইনে গাড়ির ট্যাক্স পরিশোধ বা এমওটির সময়সীমার আগে মোবাইলে রিমাইন্ডার সেট করা খুবই সহজ। মাত্র কয়েক মিনিট সময় ব্যয় করেই ভবিষ্যতে বড় ধরনের ঝামেলা এড়ানো সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, অনেকেই মনে করেন নম্বরপ্লেট মানুষের চোখে পড়ার মতো পরিষ্কার থাকলেই যথেষ্ট। কিন্তু এএনপিআর ক্যামেরা মানুষের মতো করে নম্বরপ্লেট পড়ে না। নম্বরপ্লেটের ওপর ধুলাবালি, ভুল জায়গায় লাগানো স্ক্রু, বোল্টের ঢাকনা বা প্রতিফলক স্তরের ক্ষয় ক্যামেরার জন্য নম্বর শনাক্ত করা কঠিন করে তুলতে পারে। এর ফলে অপ্রত্যাশিত আইনি জটিলতাও সৃষ্টি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, চালকেরা বাড়িতেই সহজে নম্বরপ্লেট পরীক্ষা করতে পারেন। একটি টর্চের আলো ব্যবহার করে প্রায় ২০ মিটার দূর থেকে দেখে নিশ্চিত হওয়া উচিত যে নম্বরপ্লেটটি স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে এবং সহজে পড়া যাচ্ছে। একই সঙ্গে স্ক্রু বা বোল্টের অবস্থান যেন কোনো অক্ষর বা সংখ্যা আড়াল না করে, সেদিকেও নজর রাখতে হবে। কারণ ভুলভাবে লাগানো একটি স্ক্রুর কারণে ৮ সংখ্যাটি ‘বি’ বা ০ সংখ্যাটি ‘সি’ বলে শনাক্ত হতে পারে।
যাদের ব্যক্তিগতকৃত নম্বরপ্লেট রয়েছে, তাদের অবশ্যই নির্ধারিত ব্যবধান ও আইন অনুযায়ী নির্ধারিত ‘চার্লস রাইট’ ফন্ট ব্যবহার করতে হবে। এছাড়া বিশেষজ্ঞরা নিয়মিত গরম সাবান পানি দিয়ে নম্বরপ্লেট পরিষ্কার রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। বিশেষ করে থ্রিডি ও ফোরডি নম্বরপ্লেটের উঁচু অক্ষর ও সংখ্যার চারপাশে সহজেই ময়লা জমে যায়, যা ক্যামেরার মাধ্যমে সঠিকভাবে নম্বর শনাক্তে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।