
মাত্র ২০ মিনিটের একটি ডকুফিল্ম। নির্মাণে বরাদ্দ ৩০ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রতি মিনিটে ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। উদ্দেশ্য মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরা।
গত বছরের ডিসেম্বরে ‘শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষার উন্নয়ন’ শীর্ষক ভিডিও নির্মাণের জন্য প্রাথমিকভাবে ৫০ লাখ টাকার একটি প্রস্তাব জমা দেন সরকার ফিল্মসের মালিক ও পরিচালক জয়নাল আবেদীন (জয় সরকার)। পরে মাউশির মনিটরিং অ্যান্ড ইভাল্যুয়েশন উইংয়ের তৎকালীন পরিচালক কাজী কাইয়ুম শিশির বিষয়টি আমলে নেন এবং তার উদ্যোগে ডাকা সভায় প্রস্তাবিত বাজেট কমিয়ে ৩০ লাখ টাকা নির্ধারণ হয়।
জয় সরকারের প্রস্তাবনায় বলা ছিল, প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষার প্রসার, বাল্যবিয়ে, মাউশির অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষার মাধ্যমে দুর্নীতি প্রতিরোধ, মাউশির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ডকুমেন্ট তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মোবাইল প্ল্যাটফর্মে প্রচার করা হবে। ডকুফিল্মে জনপ্রিয় অভিনয়শিল্পী দিলারা জামান, ফজলুল রহমান বাবু, কেয়া পায়েল, খায়রুল বাশার, সাদিয়া আয়মান ও ইয়াশ রোহানকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। শুধু অভিনয়শিল্পীদের জন্যই ব্যয় ধরা হয় ১৫ লাখ টাকা। পরিচালক টিম, ক্যামেরা, ট্রলি ও ড্রোনসহ অন্যান্য খাতেও উল্লেখযোগ্য অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাব ছিল।
কিন্তু নির্মিত ডকুফিল্মটিতে প্রথম সারির কোনো তারকা শিল্পী অভিনয় করেনি বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, নামকাওয়াস্তে কয়েকজন অচেনা মুখ দিয়ে মূল দৃশ্য ধারণ, বাকি পুরোটা সময় জুড়ে মাউশির কর্মকর্তাদের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার রয়েছে ফিল্মটিতে। শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা বৃদ্ধি ও শিক্ষা নজরদারির চিত্র ফুটিয়ে তোলার পরিবর্তে এতে গুণকীর্তন করা হয়েছে মাউশির তৎকালীন মহাপরিচালক ও ৭ পরিচালকের।
এদিকে দেশে এ ধরনের কাজ করার উপযোগী অসংখ্য প্রতিষ্ঠান থাকলেও এক ব্যক্তির আবেদনের ভিত্তিতে একক উৎস (সিঙ্গেল সোর্স) পদ্ধতিতে দেওয়া হয়েছে কাজটি। যা সরকারি ক্রয়বিধির (পিপিআর) সরাসরি লঙ্ঘন বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। দেশে শিক্ষা খাতে যখন বাজেট ঘাটতি ও নানামুখী সংকট প্রকট তখন মাত্র ২০ মিনিটের একটি তথ্যচিত্র (ডকুফিল্ম) তৈরিতে ৩০ লাখ টাকা খরচ করার যোক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
সংশ্লিষ্ট নথি বলছে, মাউশিতে এ ধরনের ডকুমেন্ট ফিল্ম আগে কখনও তৈরি হয়নি কিংবা এ সংক্রান্ত বাজেটও ছিল না। উদ্যোগটি সরকারি কোনো পরিকল্পনা বা বার্ষিক কর্মসূচি হিসেবে নয়, বরং একজন ব্যক্তির প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে শুরু হয়। মাউশির তৎকালীন এক পরিচালকের উদ্যোগে প্রস্তাবটি দ্রুত অনুমোদনের পথে এগোয়।
ডিসেম্বর-জানুয়রি মাসে দেশ যখন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে ব্যস্ত তখনই গোপনে কাজটি অনুমোদন দেওয়া হয়। নির্বাচনের ৫ দিন আগে ৮ ফেব্রুয়ারি কাজ দেওয়ার সিদ্ধান্তের পর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এ জন্য বিশেষ কোডে ৩০ লাখ টাকা বরাদ্দও নেওয়া হয়। তবে পুরো প্রক্রিয়ায় ই-টেন্ডার না হওয়া, সিঙ্গেল সোর্স ব্যবহার, প্রস্তাবনা ও বাস্তব কাজের মধ্যে অমিল এমন ইস্যু সামনে আসার পর প্রশ্ন উঠেছে এর ক্রয় প্রক্রিয়া নিয়ে।
এ বিষয়ে ফিল্মটির পরিচালক জয় সরকার আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘যে বাজেট অনুমোদন হয়েছে, তাতে ওই শিল্পীদের নিয়ে কাজ করা সম্ভব হয়নি। মাউশি চাইলে তাদের দিয়ে আবার কাজ করে দিতে পারি।’
অনুসন্ধানে জানা যায়, কাজ পাওয়ার পর সরকার ফিল্মস কাজটি তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি করে দেয়। নিজে পুরো কাজ না করে অন্যদের মাধ্যমে শুটিং করায়। বিষয়টি স্বীকার করে জয় সরকার বললেন, নির্বাচনী প্রচারণা ও ব্যক্তিগত ব্যস্ততার কারণে অন্যদের দিয়ে শুটিং করিয়েছি।
ডকুফিল্ম নির্মাণ শেষে গত এপ্রিল মাসে বিল জমা দেওয়া হয়। তবে মাউশির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, জমা দেওয়া ভিডিওর সঙ্গে অনুমোদিত প্রস্তাবনার বেশ কিছু অমিল পাওয়ায় বিল পরিশোধ করা হয়নি। এরমধ্যে সরকার পরিবর্তনের ফলে মাউশিতে প্রশাসনিক পরিবর্তনও ঘটে। তৎকালীন পরিচালক কাজী কাইয়ুম শিশির এবং তৎকালীন মহাপরিচালক অধ্যাপক বি এম হান্নান ওএসডি হন।
বিল ছাড় করাতে গিয়ে মাউশির কর্মকর্তারা ঘুষ দাবি করেছেন এমন অভিযোগও ওঠে। তবে ঘুষ দাবির অভিযোগটি অস্বীকার করে জয় সরকার বলেছেন, ‘আমার কাছে কেউ ঘুষ চায়নি। বর্তমান মহাপরিচালকের সঙ্গে আমার কোনদিন দেখাই হয়নি। তাহলে ঘুষের প্রসঙ্গ কেন আসছে?’ ই-টেন্ডারের বদলে সিঙ্গেল সোর্সে কাজ নেওয়ার প্রসঙ্গে তার দাবি, ‘বিষয়টি আমার জানা ছিল না। দলীয় বিবেচনায় মাউশির একজন পরিচালক আমাকে সহযোগিতা করে কাজ পাইয়ে দিয়েছেন। আর আমি বিএনপি করি এবং জুলাই যোদ্ধা, সে হিসেবে কাজ পেতেই পারি।’
মাউশির অর্থ ও ক্রয় শাখার পরিচালক অধ্যাপক মনির হোসেন পাটওয়ারী আগামীর সময়কে বলেছেন, এ কাজে দরপত্রই হয়নি, তাহলে বিল জমা দেওয়ার বিষয়টি কোথায় থেকে আসে? তাহলে জয় সরকার কীভাবে কাজ করলেন—এমন প্রশ্নে তিনি বললেন, ‘সেটি উনিই ভালো বলতে পারবেন।’
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাজেট শাখার কর্মকর্তারা জানান, মাউশিতে ডকুমেন্টারি নির্মাণের জন্য নিয়মিত কোনো বাজেট ছিল না। গত বছর মাউশি থেকে এ সংক্রান্ত বরাদ্দ চাওয়ার পর আলাদা কোড সৃষ্টি করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মতিতে ৩০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে অবশ্যই সরকারি ক্রয়বিধি অনুসরণ করার কথা ছিল। পিপিআর বাইরে গিয়ে একক সোর্সে কাউকে কাজ দেওয়ার কোনো বিধান নেই। ‘আমরা কেবল অর্থ বরাদ্দ দিয়েছি। কীভাবে ব্যয় হবে, সেটি মাউশির দায়িত্ব। তবে পিপিআর মেনেই ব্যয় করতে হবে। যারা সিঙ্গেল সোর্সে কাজ দিয়েছেন তাদের জবাব দিতে হবে।’
মাউশির প্রকিউরমেন্ট শাখার কর্মকর্তারা বলেছেন, পিপিআর অনুযায়ী ৭৫ হাজার টাকার বেশি সরকারি কেনাকাটায় উন্মুক্ত দরপত্র (ই-জিপি) আহ্বান বাধ্যতামূলক। তবে পিপিআর-২০০৮-এর বিধি ৭৪ অনুযায়ী বিশেষ ও জরুরি পরিস্থিতিতে সরাসরি ক্রয় (সিঙ্গেল সোর্স/ডিপিএম) পদ্ধতি অনুসরণ করা যায়। এ পদ্ধতি কেবল তখনই প্রযোজ্য যখন সংশ্লিষ্ট সেবা বা পণ্য একমাত্র কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেই পাওয়া সম্ভব। অথবা পেটেন্ট, কারিগরি স্বত্ব, একচ্ছত্র অধিকার কিংবা জরুরি ও দুর্যোগ পরিস্থিতির মতো ব্যতিক্রমী কারণ থাকে।
‘কিন্তু ডকুমেন্টারি নির্মাণে সক্ষম একাধিক প্রতিষ্ঠান দেশে থাকা সত্ত্বেও একক উৎস থেকে কাজ দেওয়া হয়েছে যা সরাসরি পিপিআরের লঙ্ঘন। মূলত পছন্দের একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে এ পদ্ধতিতে যান তৎকালীন পরিচালক। কাজ তদারকির জন্য কাজী কাইয়ুমের নেত্বেত্বে ৩ সদস্যের বিশেষ কমিটি করা হলেও কমিটি সরকারি অর্থের এই অপচয় ও পিপিআর লঙ্ঘনের বিষয়ে তদারকির বদলে নীরব ভূমিকায় ছিল।’
পছন্দের ব্যক্তিকে কাজ দেওয়ার অভিযোগের প্রসঙ্গে মনিটরিং অ্যান্ড ইভালুয়েশন উইংয়ের তৎকালীন পরিচালক কাজী কাইয়ুম শিশির আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘জয় সরকারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন ডিজির দায়িত্বে থাকা আব্দুল হান্নানের সম্মতি নিয়েই কাজ দেওয়া হয়।’
এ বিষয়ে তৎকালীন মহাপরিচালকের দায়িত্বে থাকা অধ্যাপক বি এম আব্দুল হান্নান আগামীর সময়কে বললেন, ‘ডকুমেন্ট তৈরি করার বাজেটের জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয় এবং মন্ত্রণালয় সেই পরিপ্রেক্ষিতে বরাদ্দ দেয়। কিন্তু টেন্ডার ছাড়া কাউকে কাজ দেওয়ার বিষয়টি আমার জানা ছিল না।’
মাউশির বর্তমান মহাপরিচালক অধ্যাপক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘এটি আমার দায়িত্ব গ্রহণের আগের ঘটনা। এ-সংক্রান্ত কোনো ফাইল বর্তমানে ক্রয় শাখায় নেই।’