
যুক্তরাজ্যে ১১ বছরের মেইশন টার্নার-পটারের শরীরে থাকা টিউমারকে প্রথমে বুলিংয়ের আঘাতের দাগ বলে মনে করা হয়েছিল। পরে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ধরা পড়ে, তার শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে স্টেজ-৪ ক্যানসার। চিকিৎসকদের ভুলে রোগ শনাক্তে দেরি হওয়ার অভিযোগের মধ্যেই বন্ধুকে বাঁচাতে ১০ বছরের অস্কার স্টিয়ার্সের ৩০ দিনের দৌড়ের উদ্যোগে এখন পর্যন্ত উঠেছে £৬৫ হাজারের বেশি।
যুক্তরাজ্যের ওয়েস্ট সাসেক্সের চিচেস্টারের মেইশন টার্নার-পটার এখন জীবন-মৃত্যুর লড়াই করছে। মাত্র দুই মাস আগে তার শরীরে ধরা পড়ে র্যাবডোমায়োসারকোমা নামের বিরল ও আক্রমণাত্মক ক্যানসার। বর্তমানে কেমোথেরাপির কঠিন চিকিৎসার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে ১১ বছরের এই শিশু। চিকিৎসকদের মতে, তার সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা মাত্র ২০ শতাংশ।
মেইশনের পরিবার জানিয়েছে, শুরু থেকেই ছেলের শরীরের ব্যথা ও অস্বাভাবিক দাগ নিয়ে তারা চিকিৎসকদের কাছে গিয়েছিল। কিন্তু মেইশনের শরীরে থাকা দাগগুলোকে বুলিংয়ের কারণে তৈরি হওয়া আঘাত বা কালশিটে হিসেবে দেখা হয়েছিল। তার ব্যথার অভিযোগও একাধিকবার গুরুত্ব পায়নি। মেইশন অটিজমে আক্রান্ত হওয়ায় তার কিছু আচরণ ও শারীরিক সমস্যাকে অটিজমের বৈশিষ্ট্য হিসেবেও ব্যাখ্যা করা হয়েছিল বলে পরিবারের অভিযোগ।
পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে থাকলে মেইশনের স্কুল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং হাসপাতালকে আরও বিস্তারিত পরীক্ষা করার জন্য চাপ দেয়। এরপর চিকিৎসকেরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করলে তার পায়ে একটি বড় টিউমার শনাক্ত হয়। পরবর্তী পরীক্ষায় ভয়াবহ সত্য সামনে আসে; ক্যানসার ইতোমধ্যে তার কুঁচকি, বুক ও মেরুদণ্ডে ছড়িয়ে পড়েছে।
মেইশনের মা এলি জানিয়েছেন, স্কুলের পক্ষ থেকে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে না বলা হলে হয়তো আরও দেরি হয়ে যেত। তিনি বলেন, মেইশন জানিয়েছিল তার শরীর ব্যথা করছে, কিন্তু চিকিৎসকেরা প্রথমে মনে করেছিলেন তার শরীরে থাকা দাগগুলো বুলিংয়ের কারণে হয়েছে। মেইশনের অটিজমের বিষয়টিও তার সমস্যাগুলো ব্যাখ্যা করতে ব্যবহার করা হয়েছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন।
এখন মেইশনের সামনে সবচেয়ে বড় লড়াই ক্যানসারের বিরুদ্ধে। তার শরীরে কেমোথেরাপি দেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসায় কিছুটা সাড়া মিললেও কয়েকটি টিউমার নিয়ে চিকিৎসকেরা বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন। মেরুদণ্ডে থাকা একটি টিউমার ভবিষ্যতে তাকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে দিতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে। কেমোথেরাপির কারণে মেইশন শারীরিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং বর্তমানে আবারও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
তবে এই কঠিন সময়ে মেইশনের পাশে দাঁড়িয়েছে তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু ১০ বছরের অস্কার স্টিয়ার্স। পাঁচ বছর বয়সে চের্টসি থেকে চিচেস্টারে যাওয়ার পর স্কুলের প্রথম দিনেই মেইশনের সঙ্গে অস্কারের বন্ধুত্ব হয়। এরপর থেকে দুজনের বন্ধুত্ব আরও গভীর হয়েছে। বন্ধুর ক্যানসারের খবর জানার পর অস্কার ঠিক করে, সে মেইশনের জন্য কিছু একটা করবে।
মায়ের সহযোগিতায় অস্কার শুরু করে ‘মাইলস ফর মেইশন’ নামে ৩০ দিনের একটি দৌড়ের চ্যালেঞ্জ। তার লক্ষ্য ছিল প্রতিদিন এক মাইল দৌড়ে মোট £১,০০০ সংগ্রহ করা, যাতে মেইশনের চিকিৎসার জন্য সহায়তা করা যায়। কিন্তু অস্কারের এই ছোট উদ্যোগ অল্প সময়ের মধ্যেই বড় আকার ধারণ করে। তার তহবিল সংগ্রহের লক্ষ্য মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই পূরণ হয়ে যায় এবং মানুষের ব্যাপক সহায়তায় সংগ্রহের পরিমাণ এখন £৬৫ হাজার ছাড়িয়েছে।
দুই তাপপ্রবাহের মধ্যেও অস্কার প্রতিদিন দৌড় চালিয়ে গেছে। এক মাসে তার দৌড়ের দূরত্ব একটি ম্যারাথনের চেয়েও বেশি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার উদ্যোগ ছড়িয়ে পড়ার পর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও মানুষ মেইশনের জন্য অর্থ সহায়তা করেছেন।
অস্কার জানিয়েছে, মেইশন তার স্কুলজীবনের প্রথম বন্ধু এবং তার কাছে সবসময়ই বিশেষ একজন। বন্ধুর অসুস্থতার খবর জানার পর সে শুধু কিছু একটা করে তাকে সাহায্য করতে চেয়েছিল। মেইশন যখন তার দৌড়ের ভিডিও দেখে হাসে, তখন সেটিই তার সবচেয়ে বড় আনন্দ বলে জানিয়েছে অস্কার। সে জানে, নিজের হাতে বন্ধুকে সুস্থ করে তোলার ক্ষমতা তার নেই, কিন্তু মেইশনকে হাসাতে এবং তাকে ভালোবাসে এমন মানুষের সংখ্যা বোঝাতে পারাটাই তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
অস্কারের মা এলি বলেন, অস্কার নিজেও দৌড়াতে খুব একটা পছন্দ করে না। তারপরও প্রচণ্ড গরমের মধ্যে প্রতিদিন এক মাইল করে দৌড়ানোর জন্য তার যে আগ্রহ, তা দেখে তারা গর্বিত। তিনি বলেন, একজন শিশুর হৃদয়ে এমন কষ্ট থাকা উচিত নয়। শুরুতে তিনি শুধু মেইশনকে দেখানোর মতো কিছু দিতে চেয়েছিলেন, যাতে সে ভিডিও দেখে হাসতে পারে। কিন্তু রাতারাতি সেই উদ্যোগ এত বড় হয়ে যায় যে এখন তা মেইশনের চিকিৎসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়তায় পরিণত হয়েছে।
মেইশনের পরিবারের আশা, অস্কারের সংগ্রহ করা অর্থ দিয়ে দেশ-বিদেশে সম্ভাব্য উন্নত চিকিৎসার সুযোগ খুঁজে দেখা যাবে। ক্যানসার চিকিৎসার এমন কিছু ব্যয়বহুল ও আধুনিক পদ্ধতি রয়েছে, যা যুক্তরাজ্যের বাইরে পাওয়া যেতে পারে। সেই সম্ভাবনাগুলোও খতিয়ে দেখতে চায় পরিবার।
মেইশনের মা কারেন বলেন, মাত্র সাত সপ্তাহের মধ্যে তাদের পুরো পৃথিবী বদলে গেছে। ছেলের সামান্য খুঁড়িয়ে হাঁটা থেকে শুরু করে স্টেজ-৪ র্যাবডোমায়োসারকোমা শনাক্ত হওয়া পর্যন্ত ঘটনাগুলো তাদের জন্য ছিল অকল্পনীয়। এমন পরিস্থিতির জন্য কোনো পরিবারই প্রস্তুত থাকে না।
তিনি আরও বলেন, এই অন্ধকার সময়ে অস্কার ও তার পরিবারের ভালোবাসা এবং সহযোগিতা মেইশনের জীবনে অনেক আনন্দ নিয়ে এসেছে। ছেলেকে এমন একজন বন্ধু পাওয়ার জন্য তারা অত্যন্ত কৃতজ্ঞ।
র্যাবডোমায়োসারকোমা শিশুদের মধ্যে দেখা দেওয়া একটি বিরল ও আক্রমণাত্মক সফট টিস্যু ক্যানসার। সাধারণত ছোট শিশু ও কিশোরদের মধ্যে এ রোগ দেখা যায়। মেইশনের ক্ষেত্রে ক্যানসার ইতোমধ্যে শরীরের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অংশে ছড়িয়ে পড়ায় তার চিকিৎসা আরও জটিল হয়ে উঠেছে। চিকিৎসকদের দেওয়া কঠিন পরিসংখ্যানের মধ্যেও মেইশনের পরিবার ও বন্ধুরা আশা ছাড়তে রাজি নয়। অস্কারের ভাষায়, প্রতিদিন এক মাইল দৌড়ানো মেইশনের লড়াইয়ের তুলনায় কিছুই নয়—তবু তারা সেই পরিসংখ্যানকে ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা করে যাবে।