ইউরোপ

ব্রেক্সিটে বিপাকে ব্রিটিশ বৃদ্ধা; ২১ বছর সুইডেনে থেকেও দেশ ছাড়ার নির্দেশ!

16342_545.jpg

ব্রেক্সিট-পরবর্তী বসবাসের আবেদন দেরিতে করায় ২১ বছর ধরে সুইডেনে বসবাসকারী ৭৮ বছর বয়সী ব্রিটিশ বিধবা জয়েস থমাসকে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এখন উচ্চতর আদালতে লড়ছেন অবসরপ্রাপ্ত এই নার্স। তার ঘটনা সুইডেনে বসবাসরত ব্রিটিশ নাগরিকদের প্রতি দেশটির কঠোর অবস্থান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

৭৮ বছর বয়সী জয়েস থমাস গত ২১ বছর ধরে সুইডেনে বসবাস করছেন। স্বামী গুইন ২০২৩ সালে ক্যানসারে মারা যাওয়ার পর তিনি তার কুকুরকে নিয়ে হ্যামারোতে একটি অ্যাপার্টমেন্টে বসবাস করছেন। সেখানে তার ছেলে ও নাতি-নাতনিরা কাছাকাছি থাকেন। তার প্রয়াত স্বামীর কবরও রয়েছে ওই এলাকাতেই।

কিন্তু ব্রেক্সিটের পর সুইডেনে বসবাসের জন্য প্রয়োজনীয় আবেদন করতে দেরি হওয়ায় এখন তাকে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গত বছরের নভেম্বর মাসে তাকে মাত্র চার সপ্তাহের মধ্যে সুইডেন ত্যাগ করতে বলা হয়। ২১ বছর ধরে যে দেশে বসবাস করছেন, সেখান থেকে চলে যাওয়ার নির্দেশ তার জন্য চরম মানসিক চাপ ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

জয়েস বলেন, তার বয়সে এত বছর একটি দেশে বসবাস করার পর কোনো অন্যায় না করেও দেশ ছাড়তে বলা অবিশ্বাস্য। তার কোনো অপরাধের রেকর্ড নেই, গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রেও কোনো জরিমানা নেই এবং তিনি সবসময় নিজের আর্থিক সামর্থ্যের ওপর নির্ভর করেই সুইডেনে বসবাস করেছেন। তার মতে, কেউ তার পরিস্থিতি যথাযথভাবে বিবেচনা করেনি।

২০২৩ সালে স্বামী গুইনের মৃত্যুর পর জয়েসের জীবনে এমনিতেই বড় পরিবর্তন আসে। তাদের দাম্পত্য জীবন ছিল ৫৫ বছরের। জয়েসের ভাষায়, গুইন ছিলেন তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু এবং জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি সুইডেনেই থাকার সিদ্ধান্ত নেন, কারণ তার ছেলে ও নাতি-নাতনিরা সেখানে থাকেন এবং স্বামীর কবরও কাছেই।

২০২২ সালে স্বামীর সঙ্গে যুক্তরাজ্যে গিয়ে তাদের দ্বিতীয় ছেলে, যিনি ব্রাইটনে থাকেন, তার সঙ্গে দেখা করার পর সুইডেনে ফেরার সময় তারা প্রথম জানতে পারেন যে ব্রেক্সিটের পর ব্রিটিশ নাগরিকদের সুইডেনে বসবাসের জন্য আনুষ্ঠানিক আবেদন করা প্রয়োজন ছিল। জয়েস জানান, তার স্বামী ব্রিটিশ নাগরিকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়মিত অনুসরণ করতেন এবং পরিবারের প্রশাসনিক বিষয়গুলোও তিনিই দেখতেন। বিষয়টি আগে জানা থাকলে তিনি অবশ্যই নির্ধারিত সময়ে আবেদন করতেন বলে জয়েসের বিশ্বাস।

ব্রেক্সিট-পরবর্তী যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রত্যাহার চুক্তি অনুযায়ী, নির্দিষ্ট ‘যুক্তিসংগত কারণ’ থাকলে নির্ধারিত সময়ের পরও বসবাসের আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু জয়েসের আবেদন ২০২৪ সালে প্রত্যাখ্যান করা হয়। সুইডিশ কর্তৃপক্ষ জানায়, নির্ধারিত সময়ের পরে আবেদন করার যথেষ্ট যুক্তিসংগত কারণ তিনি প্রমাণ করতে পারেননি।

এরপর সুইডেনের জাতীয় অভিবাসন আইনের আওতায় দেশটিতে থাকার জন্য নতুন করে আবেদন করেন জয়েস। সেই আবেদনও প্রত্যাখ্যান করা হয়। বর্তমানে বিনা পারিশ্রমিকে মামলা পরিচালনা করা আইনজীবীদের সহায়তায় তিনি উচ্চতর আদালতে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন।

জয়েস বলেন, স্বামীর মৃত্যু ছিল তার জীবনের সবচেয়ে কষ্টের ঘটনা। তারা ৫৫ বছর একসঙ্গে ছিলেন। কিন্তু স্বামীর মৃত্যু ছিল একটি সমাপ্তি। অন্যদিকে এখন যে অনিশ্চয়তার মধ্যে তাকে রাখা হয়েছে, সেটি তার কাছে অসহনীয়। তিনি বলেন, তিনি আর তরুণ নন। ইতোমধ্যে একটি বাড়ি ছেড়ে অ্যাপার্টমেন্টে উঠেছেন। আবার নতুন করে অন্য দেশে গিয়ে বাড়ি খোঁজা ও জীবন শুরু করা তার পক্ষে অত্যন্ত কঠিন।

জয়েস থমাসের ঘটনা সুইডেনে বসবাসরত ব্রিটিশ নাগরিকদের নিয়ে দেশটির কঠোর অবস্থান নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। ব্রেক্সিটের পর সুইডেনে প্রায় ২ হাজার ৫০০ ব্রিটিশ নাগরিককে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি সদস্য দেশের মধ্যে ব্রেক্সিট-সম্পর্কিত দেশত্যাগের নির্দেশের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা সর্বোচ্চ।

ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে ব্রেক্সিট-পরবর্তী ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার পর থেকে সুইডেনে ২ হাজার ৫০০ ব্রিটিশ নাগরিককে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সব সদস্য দেশের মধ্যে জারি হওয়া এ ধরনের নির্দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই সুইডেনে দেওয়া হয়েছে।

যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র, কমনওয়েলথ ও উন্নয়ন দপ্তরও সুইডেনের এই কঠোর অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। দপ্তরটি জানিয়েছে, ব্রিটিশ নাগরিকদের অধিকার রক্ষার বিষয়টি তারা সুইডিশ কর্তৃপক্ষ এবং ইউরোপীয় কমিশনের কাছে নিয়মিত তুলে ধরছে।

ব্রিটিশ সরকারের সূত্রগুলোর দাবি, ব্রেক্সিট-পরবর্তী বসবাসের অধিকার নিয়ে সুইডেন অন্য অনেক ইউরোপীয় দেশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ফলে নির্ধারিত সময়ের পরে আবেদন করা ব্যক্তিদের ‘যুক্তিসংগত কারণ’ গ্রহণ করার সুযোগ বাস্তবে অনেক সীমিত হয়ে পড়েছে।

ইউরোপীয় কমিশনের সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সুইডেনে ব্রেক্সিট-পরবর্তী বসবাসের মর্যাদার জন্য প্রায় ১৪ হাজার ২০০টি আবেদন করা হয়েছিল। এর মধ্যে প্রায় ৪ হাজার আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়। অন্যদিকে প্রায় ১৬ হাজার আবেদন পাওয়া বুলগেরিয়ায় মাত্র পাঁচটি আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল। বেলজিয়ামে প্রায় ১৩ হাজার আবেদনের মধ্যে ৬০৫টি আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়।

যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সুইডেনে আবেদন প্রত্যাখ্যানের হার প্রায় ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ। এই হার অন্য যেকোনো ইউরোপীয় ইউনিয়ন সদস্য দেশের তুলনায় অন্তত তিন গুণ বেশি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের গড় প্রত্যাখ্যানের হার যেখানে প্রায় ৩ থেকে ৪ শতাংশ, সেখানে সুইডেনের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

সুইডেনের অভিবাসন কর্তৃপক্ষ মিগ্রেশনসভেরকেট জানিয়েছে, বিশেষ পরিস্থিতিতে নির্ধারিত সময়ের পরও আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। তবে আবেদনকারীকে লিখিতভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে কেন তিনি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন করতে পারেননি। শুধু আবেদনকারী আবেদনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জানতেন না—এমন দাবি একাই যথেষ্ট ব্যাখ্যা হিসেবে বিবেচিত হবে না বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

তবে ব্রেক্সিট-পরবর্তী প্রত্যাহার চুক্তিতে বসবাসের অধিকার বাতিলের সিদ্ধান্ত ‘আনুপাতিক’ হওয়ার কথাও বলা হয়েছে। জয়েসের পরিবারকে সহায়তা করা চিকিৎসক ও পরিবারের বন্ধু ফেলিক্স অ্যান্ডলার প্রশ্ন তুলেছেন, নির্ধারিত সময়ে একটি আবেদনপত্র জমা না দেওয়ার কারণে একজন মানুষের পুরো জীবন ওলটপালট করে দেওয়া কীভাবে আনুপাতিক সিদ্ধান্ত হতে পারে।

জয়েসের ঘটনা নিয়ে ব্রাইটনের এমপি ও সাবেক ব্যবসাবিষয়ক মন্ত্রী পিটার কাইলও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, ব্রেক্সিটের আগে অবাধ চলাচলের অধিকার প্রয়োগ করা যুক্তরাজ্যের নাগরিকদের অধিকার ন্যায়সঙ্গত ও মানবিকভাবে বিবেচনা করা উচিত। তিনি সুইডিশ কর্তৃপক্ষকে জয়েসের দীর্ঘদিনের বসবাস, পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক এবং মানবিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে তার আবেদনটি পুনরায় পর্যালোচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন।

এখন উচ্চতর আদালতের রায়ের অপেক্ষায় রয়েছেন জয়েস থমাস। ২১ বছর ধরে যে দেশকে নিজের বাড়ি হিসেবে গড়ে তুলেছেন, জীবনের শেষ সময়ে সেখানেই ছেলে, নাতি-নাতনি এবং স্বামীর কবরের কাছাকাছি থাকতে পারবেন কি না, সেই সিদ্ধান্ত এখন আদালতের হাতে।

সর্বাধিক পঠিত


ভিডিও