
২০২৭ সালের হজযাত্রায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশ্বের যেকোনো দেশ থেকে প্রবাসী বাংলাদেশিরা নিবন্ধন করে বাংলাদেশের হজ কোটায় পবিত্র হজ পালনের সুযোগ পাবেন। ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বাংলাদেশ সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন যুক্তরাজ্যে কর্মরত কয়েকজন হজ ও ট্রাভেল ব্যবসায়ী।
এ উপলক্ষে লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আল হিদমাহ ট্রাভেলস লিমিটেড লন্ডনের পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াহিদ এবং আর রাহমান ট্রাভেলস ইউকে লিমিটেডের পরিচালক হাজী হাবীব বলেন, প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সহজ, স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত হজসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তারা গত ২১ জুন ২০২৬ ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মুনসি আলাউদ্দিন আল আজাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে একটি আবেদন দেন।
আবেদনে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য পৃথক হজ কোটা, ইকোনমি, প্রিমিয়াম ও ডিলাক্স ধরনের হজ প্যাকেজ, সম্পূর্ণ অনলাইন নিবন্ধন ও প্যাকেজ নির্বাচন, ওয়ান-স্টপ সার্ভিস, সরকারি নির্ধারিত ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে আর্থিক লেনদেন এবং অনলাইন ট্র্যাকিং ও অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তাদের দাবি, এসব ব্যবস্থা চালু হলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাদেশি হজযাত্রীরা আরও সহজে, স্বচ্ছভাবে ও হয়রানিমুক্ত পরিবেশে হজ পালনের সুযোগ পাবেন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত ১৩ জুলাই ২০২৬ ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সভায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের হজ পালনের বিষয়টি আলোচনা ও পর্যালোচনা করা হয়। পরে ২৬ জুলাই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানিয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছে একটি চিঠি পাঠানো হয়। ওই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৭ সালের হজে প্রবাসী বাংলাদেশিরা বিশ্বের যেকোনো দেশ থেকে নিবন্ধন করে বাংলাদেশের হজ কোটায় পবিত্র হজ পালন করতে পারবেন।
আয়োজকরা জানান, বাংলাদেশের জন্য ২০২৬ সালের হজযাত্রীর কোটা ছিল ১ লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জন। তবে ওই বছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৭৮ হাজার ৫০০ জন হজ পালন করেন। ফলে নির্ধারিত কোটা পূর্ণ হয়নি। এ কারণে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য আলাদা হজ কোটা সংরক্ষণের প্রয়োজন নেই বলে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তাদের জানানো হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, ২০২৬ সালের হজে প্রবাসী বাংলাদেশিরা নিজ নিজ দেশ থেকে সরাসরি হজে যেতে পারবেন কি না, তা জানতে গত ১৮ জানুয়ারি তৎকালীন ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা এ এফ এম খালিদ হোসেনের কাছে উকিল নোটিশ পাঠানো হয়েছিল। পরে গত ১২ মার্চ বর্তমান সরকারের ধর্মবিষয়ক মন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেইন কায়কোবাদের কাছেও এ বিষয়ে আবেদন করা হয়। দীর্ঘদিনের এই প্রচেষ্টার পর ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তকে প্রবাসীদের হজযাত্রার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন উদ্যোক্তারা।
এদিকে ২০২৭ সালের হজ প্যাকেজের প্রচারণা নিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে সংবাদ সম্মেলন থেকে। আয়োজকরা বলেন, বিভিন্ন দেশ ও বিভিন্ন মাধ্যমে ইতোমধ্যে ২০২৭ সালের হজ প্যাকেজের প্রচারণা শুরু হয়েছে। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, লিফলেট কিংবা অন্যান্য প্রচারণা দেখে কোনো প্যাকেজ বুকিং বা অর্থ প্রদানের আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বৈধতা যাচাই করা জরুরি।
তারা বলেন, যুক্তরাজ্যে ট্রাভেল ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে দেশটির আইন ও বিধিবিধান মেনে চলতে হয়। তাই হজ প্যাকেজ কেনার আগে প্রতিষ্ঠানের কোম্পানিজ হাউসের নিবন্ধন, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে এটিওএল ও আইএটিএ অনুমোদন, অফিসের ঠিকানা, পূর্বের ব্যবসায়িক রেকর্ড, লিখিত চুক্তিপত্র এবং প্যাকেজে অন্তর্ভুক্ত সেবাগুলো যাচাই করা উচিত। শুধু আকর্ষণীয় প্রচারণা কিংবা অস্বাভাবিক কম দামের অফার দেখে হজ প্যাকেজ কেনার সিদ্ধান্ত না নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
তবে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া তাদের উদ্দেশ্য নয় বলেও সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট করা হয়। আয়োজকদের ভাষ্য, তাদের মূল লক্ষ্য হলো প্রবাসী বাংলাদেশি হজযাত্রীরা যেন প্রতারণা, হয়রানি বা আর্থিক ক্ষতির শিকার না হন এবং নিরাপদ, স্বচ্ছ ও আইনসম্মতভাবে পবিত্র হজ পালন করতে পারেন।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের হজসেবা আরও সংগঠিত ও মানসম্মত করার লক্ষ্যে একটি শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ প্রবাসী হজ এজেন্সি অ্যাসোসিয়েশন গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। এ বিষয়ে আল কিবলা ট্রাভেলসের পরিচালক আনোয়ার আলী ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুবুর রহমান চৌধুরীর সঙ্গে পরামর্শের পর ফ্লাই ভিউ ট্রাভেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বসির আহমেদ, ব্লু স্টোন ট্রাভেলসের পরিচালক রুবেল আহমেদ এবং বিএমটি ট্রাভেলসের পরিচালক মশহুদ চৌধুরীর সঙ্গে প্রাথমিক বৈঠক করা হয়েছে।
উদ্যোক্তারা জানান, সময়ের স্বল্পতার কারণে প্রাথমিক বৈঠকে যুক্তরাজ্যের আরও অনেক ট্রাভেল এজেন্টকে আমন্ত্রণ জানানো সম্ভব হয়নি। তবে আগামী ১৫ আগস্ট শনিবার লন্ডনের গ্র্যান্ড রসই রেস্টুরেন্টে বৃহত্তর পরিসরে সংশ্লিষ্ট ট্রাভেল এজেন্টদের নিয়ে একটি সভার আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে প্রবাসী হজ এজেন্সি অ্যাসোসিয়েশন গঠন এবং ভবিষ্যতে হজযাত্রীদের জন্য আরও উন্নত ও নিরাপদ সেবা নিশ্চিত করার বিষয়ে আলোচনা ও মতামত নেওয়া হবে।
সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যে কর্মরত সব সংশ্লিষ্ট ট্রাভেল এজেন্টকে এ উদ্যোগে অংশ নেওয়া এবং নিজেদের মূল্যবান মতামত ও পরামর্শ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। আয়োজকরা বলেন, এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা করা নয়; বরং প্রবাসী বাংলাদেশি হজযাত্রীদের স্বার্থ, নিরাপত্তা, অধিকার এবং মানসম্মত হজসেবা নিশ্চিত করা।
সবশেষে ২০২৭ সালের হজে প্রবাসী বাংলাদেশিদের বাংলাদেশের হজ কোটায় নিবন্ধনের সুযোগ করে দেওয়ায় বাংলাদেশ সরকারের ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন আয়োজকরা। তারা আশা প্রকাশ করেন, সরকার, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়, সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশি দূতাবাস ও হাইকমিশন এবং প্রবাসী ট্রাভেল এজেন্টরা সমন্বিতভাবে কাজ করলে আগামী দিনে প্রবাসী বাংলাদেশিদের হজযাত্রা আরও সহজ, নিরাপদ, স্বচ্ছ ও সুশৃঙ্খল হবে।