যুক্তরাজ্য

১৩ আগস্ট ২০২৬, ২১:০৮
আরও খবর

যুক্তরাজ্যে দৈনিক ১২ ঘণ্টা কাজ করে রোগীদের যথাযথ চিকিৎসা দিতে পারছেন না ডাক্তাররা!

16380_IMG_8206.jpeg

ব্রিটেনে রোগীর চাপ ও অতিরিক্ত কাজের কারণে চিকিৎসাসেবার মান ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরা। দেশটির চিকিৎসা নিয়ন্ত্রক সংস্থা জেনারেল মেডিকেল কাউন্সিলের (GMC) এক জরিপে দেখা গেছে, প্রতি ১০ জন জিপির মধ্যে প্রায় ৬ জনই সপ্তাহে অন্তত একবার রোগীদের প্রয়োজনীয় মানের চিকিৎসা দিতে পারছেন না।

২০২৫ সালের এই জরিপে যুক্তরাজ্যের ৪ হাজার ৬০০-এর বেশি চিকিৎসক অংশ নেন। এতে ৪১ শতাংশ চিকিৎসক জানান, সপ্তাহে অন্তত একবার রোগীদের পর্যাপ্ত চিকিৎসা দেওয়া তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। জিপিদের ক্ষেত্রে এই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬০ শতাংশে। সম্প্রতি চিকিৎসা পেশায় যোগ দেওয়া চিকিৎসকদের মধ্যেও ৫১ শতাংশ একই সমস্যার কথা জানিয়েছেন।

জরিপে আরও দেখা গেছে, ২০২৫ সালে চিকিৎসকদের সামগ্রিক চাকরিসন্তুষ্টি কমেছে এবং ২২ শতাংশ চিকিৎসক অবসর ছাড়া অন্য কারণে স্থায়ীভাবে পেশা ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন। ২০২৪ সালে এই হার ছিল ১৯ শতাংশ।

কাজের চাপের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে কেমব্রিজশায়ারের বটিশামে একটি জিপি প্র্যাকটিস পরিচালনাকারী চিকিৎসক তামারা কিথ জানিয়েছেন, তিনি সপ্তাহে কয়েক দিন সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত কাজ করেন এবং অনেক সময় দুপুরের খাবারের বিরতিও পান না।

তিনি জানান, সোমবার সকালে একটি দিনে ৮৫ থেকে ১০০টি রোগীর অনুরোধ যাচাই করতে হয়, অথচ সরাসরি বা ফোনে দেখার মতো অ্যাপয়েন্টমেন্ট থাকে মাত্র ১৫ থেকে ২০টি। ফলে বাকি রোগীদের বড় একটি অংশের বিষয়ও তাকে নিজেকেই সামলাতে হয়।

তামারা কিথ বলেন, চিকিৎসকদের সংখ্যা ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো না বাড়িয়ে রোগীর অনলাইন অ্যাপয়েন্টমেন্টের অনুরোধ সারাদিন খোলা রাখার নিয়ম চালু করায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে। তার মতে, চিকিৎসকদের মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে কারণ তারা রোগীদের সেই মানের সেবা দিতে পারছেন না, যে সেবা তারা দিতে চান।

GMC-এর প্রধান নির্বাহী চার্লি ম্যাসি বলেন, রোগীরা চিকিৎসকদের কাছ থেকে ভালো সেবা পাওয়ার প্রত্যাশা করেন এবং চিকিৎসকরাও জানেন ভালো চিকিৎসাসেবা কেমন হওয়া উচিত। কিন্তু কর্মপরিবেশ ও অতিরিক্ত চাপের কারণে অনেক চিকিৎসকের পক্ষে সেই মান বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলের পরিস্থিতিতেও পার্থক্য রয়েছে। ইংল্যান্ড ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডে প্রায় ১০ জনের মধ্যে চারজন চিকিৎসক জানিয়েছেন, তারা রোগীদের কাঙ্ক্ষিত মাত্রার চিকিৎসা দিতে পারছেন না। স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসে এই হার প্রায় ৫০ শতাংশ।

ব্রিটিশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি ডা. অমিত কোচহার এই পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, গত দুই বছরে চিকিৎসকদের চাকরিসন্তুষ্টিতে যে সামান্য উন্নতি হয়েছিল, সেটিও এখন হারিয়ে গেছে।

জরিপে চিকিৎসকদের ওপর অতিরিক্ত চাপের মানসিক প্রভাবও উঠে এসেছে। চিকিৎসা দিতে বিলম্ব, হতাশা, অপরাধবোধ, কাজের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অনিশ্চয়তা এবং ‘মোরাল ইনজুরি’ বা পেশাগত মূল্যবোধের সঙ্গে কাজের বাস্তবতার সংঘাতের মতো সমস্যার কথা জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। গত এক বছরে ৫৩ শতাংশ চিকিৎসক রোগীর চিকিৎসা, পরীক্ষা বা সেবা দিতে বিলম্বকে প্রধান বাধা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। জিপিদের ক্ষেত্রে এই হার ৭৩ শতাংশ।

রয়্যাল কলেজ অব জেনারেল প্র্যাকটিশনার্সের তথ্য অনুযায়ী, ইংল্যান্ডে বর্তমানে একজন পূর্ণকালীন যোগ্য জিপির বিপরীতে গড়ে প্রায় ২ হাজার ৩০০ রোগী রয়েছেন। ২০১৫ সালের তুলনায় এই সংখ্যা ১৩ শতাংশ বেড়েছে। অতিরিক্ত কাজের চাপের কারণে গত এক দশকে অনেক অভিজ্ঞ জিপি নির্ধারিত সময়ের আগেই অবসর নিয়েছেন।

ইস্ট লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটসের পারিবারিক চিকিৎসক এবং রয়্যাল কলেজ অব জেনারেল প্র্যাকটিশনার্সের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ভিক্টোরিয়া জোর্তজিউ ব্রাউন বলেন, বিষয়টি চিকিৎসকদের পেশাদারিত্ব বা দায়িত্ববোধের ঘাটতি নয়। রোগীদের প্রয়োজনীয় মানের সেবা দিতে জিপিদের পর্যাপ্ত সময় ও সক্ষমতা প্রয়োজন।

GMC-এর জরিপে হাসপাতাল ও জিপি সেবার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতিও উঠে এসেছে। নতুন একটি প্রশ্নে মাত্র পাঁচজন চিকিৎসকের মধ্যে একজন জানিয়েছেন, প্রাথমিক চিকিৎসা ও হাসপাতালভিত্তিক চিকিৎসাসেবার মধ্যে সমন্বয় বর্তমানে কার্যকর। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চিকিৎসকদের ওপর বাড়তে থাকা চাপ শেষ পর্যন্ত রোগীদের চিকিৎসাসেবার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।


 

সর্বাধিক পঠিত


আরও খবর
ভিডিও