
তীব্র গরমের মধ্যে কাজের পরিবেশ নিয়ে বিরোধের জেরে লন্ডনে শুরু হয়েছে বাসচালকদের ধর্মঘট। এর ফলে আজ ও আগামীকাল রাজধানীর ৪২টি বাস রুটে বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হয়েছে। যাত্রীদের সতর্ক করেছে ট্রান্সপোর্ট ফর লন্ডন (টিএফএল), কিছু রুটে ‘সামান্য বা কোনো পরিষেবাই’ নাও থাকতে পারে।
লন্ডনে চলমান তাপপ্রবাহের মধ্যেই কাজের পরিবেশ নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে অ্যারিভা বাসচালকদের ধর্মঘট শুরু হয়েছে। ইউনাইটে ইউনিয়নের ডাকে শুক্রবার ভোর ৪টা থেকে শুরু হওয়া এই ধর্মঘট শনিবার ভোর ৪টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত চলবে। এর প্রভাব পড়েছে সাধারণ বাসের পাশাপাশি রাতের বাস এবং সুপারলুপ পরিষেবাতেও।
উত্তর লন্ডন ও এসেক্সের বিভিন্ন এলাকায় এই ধর্মঘটের কারণে বাস চলাচলে ব্যাপক বিঘ্ন তৈরি হয়েছে। ধর্মঘটে অংশ নিচ্ছেন অ্যারিভা নর্থ লন্ডনের চালকরা। অ্যারিভা টিএফএলের হয়ে বাস পরিষেবা পরিচালনা করে।
ইউনাইটের অভিযোগ, গরম আবহাওয়ায় বাসের ভেতরে চালকদের কাজের পরিবেশ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করা হলেও অ্যারিভা নর্থ লন্ডন যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি। সাম্প্রতিক তাপপ্রবাহে বাসের চালকদের কেবিনের তাপমাত্রা প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছানোর অভিযোগ উঠেছে।
ধর্মঘটের কারণে মোট ৪২টি বাস রুট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে দুটি সুপারলুপ রুট এবং চারটি রাতের বাস রুট রয়েছে। বার্কিং, এডমন্টন, এনফিল্ড, গ্রেইস, পামার্স গ্রিন, স্ট্যামফোর্ড হিল, টটেনহ্যাম ও উড গ্রিনের বাস গ্যারেজের চালকরাও ধর্মঘটে অংশ নিচ্ছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত রুটগুলোর মধ্যে ১৯ নম্বর বাস ফিন্সবেরি পার্ক থেকে ব্যাটারসি ব্রিজ, ২৯ নম্বর উড গ্রিন থেকে ট্রাফালগার স্কয়ার, ৩৪ নম্বর ওয়ালথামস্টো থেকে বারনেট এবং ৪১ নম্বর টটেনহ্যাম হেল থেকে আর্চওয়ের মধ্যে চলাচল করে।
৬৬ নম্বর রুট লেটনস্টোন থেকে রমফোর্ড, ৬৭ নম্বর উড গ্রিন থেকে ডালস্টন, ৭৬ নম্বর টটেনহ্যাম হেল থেকে ওয়াটারলু, ১০২ নম্বর এডমন্টন গ্রিন থেকে ব্রেন্ট ক্রস এবং ১২১ নম্বর টার্নপাইক লেন থেকে এনফিল্ড আইল্যান্ড ভিলেজ পর্যন্ত চলাচল করে।
১৪১ নম্বর পামার্স গ্রিন থেকে লন্ডন ব্রিজ, ১৪৯ নম্বর এডমন্টন থেকে লন্ডন ব্রিজ, ১৫০ নম্বর চিগওয়েল থেকে বেকন্ট্রি, ১৫৮ নম্বর চিংফোর্ড থেকে স্ট্র্যাটফোর্ড এবং ১৭৫ নম্বর ড্যাগেনহ্যাম থেকে নর্থ রমফোর্ড রুটও ধর্মঘটে আক্রান্ত।
এছাড়া ১৯১ নম্বর এডমন্টন গ্রিন থেকে ব্রিমসডাউন, ১৯২ নম্বর এনফিল্ড থেকে টটেনহ্যাম হেল, ২১৭ নম্বর ওয়ালথাম ক্রস থেকে টার্নপাইক লেন, ২২১ নম্বর এজওয়্যার থেকে টার্নপাইক লেন, ২৪৩ নম্বর উড গ্রিন থেকে ওয়াটারলু এবং ২৪৮ নম্বর ক্র্যানহ্যাম থেকে রমফোর্ড মার্কেট রুটে পরিষেবা ব্যাহত হয়েছে।
২৫৪ নম্বর হলওয়ে থেকে অ্যালডগেট, ২৫৯ নম্বর এডমন্টন গ্রিন থেকে কিংস ক্রস, ২৭৯ নম্বর ওয়ালথাম ক্রস থেকে ম্যানর হাউস, ৩০৭ নম্বর বারনেট হাসপাতাল থেকে ব্রিমসডাউন, ৩১৩ নম্বর পটার্স বার থেকে চিংফোর্ড এবং ৩২৯ নম্বর এনফিল্ড থেকে উড গ্রিন রুটও এই ধর্মঘটের আওতায় রয়েছে।
৩৪১ নম্বর মেরিডিয়ান ওয়াটার থেকে ওয়াটারলু, ৩৪৯ নম্বর পন্ডার্স এন্ড থেকে স্ট্যামফোর্ড হিল, ৩৭০ নম্বর রমফোর্ড থেকে লেকসাইড, ৩৭৫ নম্বর রমফোর্ড থেকে পাসিংফোর্ড ব্রিজ, ৩৭৭ নম্বর ওকউড থেকে পন্ডার্স এন্ড, ৬১৬ নম্বর এডমন্টন গ্রিন থেকে উইনচমোর হিল এবং ৬৭৫ নম্বর ওয়ালথামস্টো থেকে উডফোর্ড গ্রিন রুটও বন্ধ বা ব্যাপকভাবে ব্যাহত হতে পারে।
সুপারলুপের এসএল১ ও এসএল২ রুটও ধর্মঘটে আক্রান্ত। এসএল১ ওয়ালথামস্টো থেকে নর্থ ফিঞ্চলি এবং এসএল২ ওয়ালথামস্টো থেকে নর্থ উলউইচ পর্যন্ত চলাচল করে।
এছাড়া ডব্লিউ৩ নর্থাম্বারল্যান্ড পার্ক থেকে ফিন্সবেরি পার্ক, ডব্লিউ৪ টটেনহ্যাম হেল থেকে ওকথর্প পার্ক এবং ডব্লিউ৬ এডমন্টন গ্রিন থেকে সাউথগেট রুটেও পরিষেবা ব্যাহত হচ্ছে।
রাতের বাসের মধ্যে এন১৯ ফিন্সবেরি পার্ক থেকে ক্ল্যাফাম জংশন, এন২৯ এনফিল্ড থেকে ট্রাফালগার স্কয়ার, এন৪১ টটেনহ্যাম হেল থেকে ট্রাফালগার স্কয়ার এবং এন২৭৯ ওয়ালথাম ক্রস থেকে ট্রাফালগার স্কয়ার রুট ধর্মঘটের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
টিএফএল জানিয়েছে, এসব রুটে ‘সামান্য বা কোনো পরিষেবা’ পাওয়া যেতে পারে। ফলে যাত্রীদের বিকল্প বাস, টিউব ও রেল পরিষেবা ব্যবহার করতে হতে পারে। ধর্মঘটের কারণে অন্যান্য স্থানীয় বাস রুট, টিউব ও রেল পরিষেবায় স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি ভিড় হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
টিএফএল যাত্রীদের আগে থেকে যাত্রা পরিকল্পনা করার এবং গন্তব্যে পৌঁছাতে অতিরিক্ত সময় হাতে রাখার পরামর্শ দিয়েছে।
অ্যারিভা চালকদের ধর্মঘট শুধু এই সপ্তাহান্তেই সীমাবদ্ধ নয়। আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত আরও কয়েক দফা ধর্মঘটের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। আগস্টে ১৮ থেকে ২১ এবং ২৫ থেকে ২৮ তারিখ পর্যন্ত ধর্মঘটের পরিকল্পনা রয়েছে। সেপ্টেম্বরের ৪ ও ৫, ৭ ও ৮, ১৮ ও ১৯ এবং ২১ ও ২২ তারিখেও ধর্মঘট হবে। অক্টোবরের ২ ও ৩, ৫ ও ৬, ১৬ ও ১৭ এবং ১৯ ও ২০ তারিখেও কর্মবিরতির ঘোষণা রয়েছে।
এই ধর্মঘটের কয়েকটি তারিখ পিকাডিলি লাইনের পরিকল্পিত বন্ধের সঙ্গেও মিলে যাচ্ছে। নতুন ট্রেন চালু ও লাইন উন্নয়নের কাজের জন্য আগস্ট ১৮ থেকে ২০, আগস্ট ২৫ থেকে ২৭, সেপ্টেম্বর ১৮ থেকে ২০ এবং অক্টোবর ১৬ থেকে ১৮ তারিখে পিকাডিলি লাইনের কিছু অংশ বন্ধ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে একই সময়ে বাস ও টিউব—দুই পরিষেবাতেই বিঘ্ন তৈরি হলে যাত্রীদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে।
চালকদের কর্মপরিবেশ নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগ থেকেই এই ধর্মঘটের সূত্রপাত। ইউনাইটের দাবি, সাম্প্রতিক তাপপ্রবাহে অনেক চালক অতিরিক্ত গরম, পানিশূন্যতা, হিট এক্সহসশন এবং হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন।
ইউনাইটের অভিযোগ, লন্ডনের বেশিরভাগ বাসে আধুনিক এয়ার কন্ডিশনিংয়ের পরিবর্তে তুলনামূলক কম কার্যকর এয়ার কুলিং ব্যবস্থা রয়েছে। এই ব্যবস্থা বাসের ভেতরের তাপমাত্রা মাত্র কয়েক ডিগ্রি কমাতে পারে বলে ইউনিয়নের দাবি। ফলে প্রচণ্ড গরমের সময় চালকদের কেবিনের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছে যায়।
লন্ডনের মেয়র সাদিক খানও এর আগে বলেছেন, অতিরিক্ত গরম বা অনিরাপদ পরিবেশে বাসচালকদের কাজ করা উচিত নয়। জুনে এলবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বাসচালকদের উদ্দেশে বলেন, কেবিন অতিরিক্ত গরম হয়ে গেলে বাস চালানো বন্ধ রাখার অনুমতি টিএফএল ও বাস অপারেটরদের দেওয়া হয়েছে।
অ্যারিভা লন্ডনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওয়াসিম মোহাম্মদ বলেন, চালকদের কল্যাণকে তারা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন এবং চলমান চরম গরমের প্রভাব সম্পর্কে তারা অবগত।
তিনি জানান, চালকদের সুরক্ষায় স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং দীর্ঘমেয়াদে বাসের কেবিনে এয়ার কন্ডিশনিং ব্যবস্থা উন্নত করার কাজ চলছে। নতুন বাস বহরে বিনিয়োগও অব্যাহত রয়েছে।
ইউনাইটের সঙ্গে আলোচনায় বসে সমস্যার সমাধান করতে অ্যারিভা প্রস্তুত বলেও জানান তিনি। প্রতিষ্ঠানটির আশা, আলোচনার মাধ্যমে ধর্মঘট ও যাত্রীদের দুর্ভোগ এড়ানো সম্ভব হবে।
টিএফএলও জানিয়েছে, ধর্মঘটের দিন লন্ডনের বাস নেটওয়ার্কের বড় অংশ স্বাভাবিকভাবে চলবে। তবে কিছু রুটে অতিরিক্ত ভিড় হতে পারে। দুই পক্ষ দ্রুত সমাধানে পৌঁছাবে বলে আশা প্রকাশ করে যাত্রীদের ভোগান্তির জন্য দুঃখও প্রকাশ করেছে টিএফএল।
তীব্র গরমের মধ্যে একদিকে বাসচালকদের কর্মপরিবেশ নিয়ে বিরোধ, অন্যদিকে সামনে একাধিক ধর্মঘট ও পিকাডিলি লাইন বন্ধের পরিকল্পনা—সব মিলিয়ে আগামী কয়েক মাসে লন্ডনের গণপরিবহন ব্যবহারকারীদের জন্য পরিস্থিতি আরও চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠতে পারে।