
ব্রিটেনে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বিল পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছেন? সরবরাহকারীকে দ্রুত জানালে কিস্তি কমানো থেকে শুরু করে জরুরি সহায়তা, ঋণ পরিশোধের নতুন ব্যবস্থা এবং প্রিপেমেন্ট মিটারে বিশেষ সুরক্ষা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে
ব্রিটেনে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের উচ্চ বিল এখনও বহু পরিবারের জন্য বড় আর্থিক চাপ হয়ে আছে। জ্বালানির খরচ বাড়তে থাকায় অনেক পরিবারই শীতকালে ঘরের হিটিং ও গরম পানির ব্যবহার কমিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা করছে। এমন পরিস্থিতিতে এনার্জি বিল পরিশোধে সমস্যা হলে চুপ করে না থেকে যত দ্রুত সম্ভব নিজের সরবরাহকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
ন্যাশনাল এনার্জি অ্যাকশনের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে প্রায় ৬০ লাখ পরিবার ‘ফুয়েল পোভার্টি’র মধ্যে রয়েছে। অনেক পরিবার জ্বালানি খরচ নিয়ে এতটাই উদ্বিগ্ন যে তারা শীতকালে হিটিং ও গরম পানির ব্যবহার বন্ধ করতে বাধ্য হতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন।
আপনি যদি বিদ্যুৎ বা গ্যাসের বিলের পেছনে পড়ে যান কিংবা পরবর্তী বিল পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে, তাহলে যত দ্রুত সম্ভব আপনার এনার্জি সরবরাহকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করুন। নিয়ন্ত্রক সংস্থা অফজেমের নিয়ম অনুযায়ী, আর্থিক সমস্যায় পড়া গ্রাহকদের সরবরাহকারীদের সহায়তা করতে হয়।
আপনার পরিস্থিতি বিবেচনা করে সরবরাহকারী সম্পূর্ণ পেমেন্ট প্ল্যান পর্যালোচনা করতে পারে এবং এমন একটি ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করতে পারে যা আপনার সামর্থ্যের মধ্যে থাকে। প্রয়োজনে কিছু সময়ের জন্য পেমেন্ট কমানো, আরও সময় দেওয়া, পেমেন্ট বিরতি দেওয়া কিংবা হার্ডশিপ ফান্ডে সহায়তার সুযোগও থাকতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ঋণ পরিশোধের পরিমাণ আপনার পরিশোধ করার সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত। তাই বিল জমে যাওয়ার পর অপেক্ষা না করে শুরুতেই সরবরাহকারীকে জানানোই ভালো।
যেসব পরিবার বিল দিতে না পারার কারণে প্রিপেমেন্ট মিটারে চলে যাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন, তাদের জন্যও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা রয়েছে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে জোরপূর্বক প্রিপেমেন্ট মিটার স্থাপনের ক্ষেত্রে নতুন একটি বিধিমালা চালু হয়, যা এখন এনার্জি সরবরাহকারীদের লাইসেন্সের শর্তের অংশ।
কিছু উচ্চঝুঁকির পরিবারের ক্ষেত্রে জোর করে প্রিপেমেন্ট মিটার বসানো নিষিদ্ধ। এর মধ্যে এমন পরিবার রয়েছে যেখানে ৭৫ বছর বা তার বেশি বয়সী ব্যক্তি থাকেন এবং বাড়িতে তার কোনো সহায়তাকারী নেই, দুই বছরের কম বয়সী শিশু রয়েছে, স্বাস্থ্যগত কারণে সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রয়োজন অথবা শারীরিক কিংবা মানসিক অক্ষমতার কারণে মিটার টপ-আপ করা সম্ভব নয়।
মাঝারি ঝুঁকির পরিবারের ক্ষেত্রেও প্রিপেমেন্ট মিটার বসানোর আগে ঝুঁকি ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা যাচাই করতে হয়। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু থাকা পরিবার কিংবা গর্ভাবস্থা বা শোকের মতো সাময়িক কারণে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা পরিবার এর আওতায় পড়তে পারে।
যদি মূল্যায়নে দেখা যায়, প্রিপেমেন্ট মিটারে নেওয়ার পর পরিবারটি টপ-আপ করতে না পেরে বিদ্যুৎ বা গ্যাস সংযোগ হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে, তাহলে সরবরাহকারীর সেই ব্যবস্থা না নেওয়ার কথা।
কোনো পরিবারকে জোর করে প্রিপেমেন্ট মিটারে নেওয়ার আগে সরবরাহকারীকে বাড়িতে যোগাযোগের চেষ্টা করতে হয়। প্রয়োজন হলে ‘ওয়েলফেয়ার ভিজিট’ করতে হয়। স্মার্ট মিটার থাকলে সেটিকে দূর থেকে প্রিপেমেন্ট মোডে পরিবর্তন করার ক্ষেত্রেও এই সুরক্ষা প্রযোজ্য হতে পারে।
সরবরাহকারীদের সাধারণত অন্তত ১০ বার গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করতে হয়। এই যোগাযোগের চেষ্টা তিন মাস ধরে বিভিন্ন সময়ে এবং সপ্তাহের বিভিন্ন দিনে করার কথা, যাতে গ্রাহককে বিষয়টি জানার ও প্রতিক্রিয়া জানানোর যথেষ্ট সুযোগ দেওয়া হয়।
ওয়েলফেয়ার ভিজিট ও প্রিপেমেন্ট মিটার স্থাপনের সময় কর্মীদের বডি ক্যামেরা ব্যবহারের ব্যবস্থাও রয়েছে। এর মাধ্যমে নিয়ম মানা হয়েছে কি না পরবর্তীতে যাচাই করা এবং কোনো অভিযোগ বা বিরোধ দেখা দিলে তা পর্যালোচনা করা সম্ভব।
প্রিপেমেন্ট মিটার বসানোর সিদ্ধান্ত হলে সরবরাহকারীকে সাধারণত মিটারে £৩০ জরুরি টপ-আপ ক্রেডিট দেওয়ার ব্যবস্থাও করতে হয়, যাতে পরিবারটি সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ বা গ্যাসবিহীন হয়ে না পড়ে। তবে এই অর্থ পরবর্তীতে ফেরত দিতে হয়।
জোর করে প্রিপেমেন্ট মিটারে নেওয়া শেষ উপায় হিসেবে ব্যবহারের কথা। ঋণ আদায়ের জন্য সরবরাহকারীকে আগে অন্যান্য সম্ভাব্য ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করতে হয় এবং উপরের নির্ধারিত প্রক্রিয়াগুলো অনুসরণ করতে হয়।
কারও কাছে স্মার্ট মিটার থাকলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সরবরাহকারী সেটিকে দূর থেকে প্রিপেমেন্ট মোডে পরিবর্তন করতে পারে। কিন্তু স্মার্ট মিটার না থাকলে জোর করে প্রিপেমেন্ট মিটার বসানোর জন্য আদালতের ওয়ারেন্ট প্রয়োজন হতে পারে, যার ফলে অতিরিক্ত খরচও হতে পারে।
প্রিপেমেন্ট মিটারে থাকা গ্রাহকরাও সমস্যায় পড়লে সরবরাহকারীর কাছ থেকে সহায়তা চাইতে পারেন। সিটিজেনস অ্যাডভাইসের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে যুক্তরাজ্যে প্রায় ২৮ লাখ মানুষ টাকা টপ-আপ করতে না পারায় বিদ্যুৎ বা গ্যাস সংযোগ হারিয়েছেন।
প্রায় সব সরবরাহকারীই কিছু পরিমাণ ‘ইমার্জেন্সি ক্রেডিট’ দিয়ে থাকে। সাধারণত বিদ্যুৎ ও গ্যাস মিটারে প্রায় £৫ জরুরি ক্রেডিট পাওয়া যায়, যদিও কিছু সরবরাহকারী বর্তমান পরিস্থিতিতে এর পরিমাণ বাড়িয়েছে। মিটারে টাকা খুব কমে গেলে এই সুবিধা ব্যবহারের সুযোগ আসে। পরে পরবর্তী টপ-আপের সময় ওই অর্থ পরিশোধ করতে হয়।
এ ছাড়া ‘ফ্রেন্ডলি ক্রেডিট’ ব্যবস্থা রয়েছে, যার ফলে নির্দিষ্ট সময়ে মিটারের ক্রেডিট শেষ হয়ে গেলেও সঙ্গে সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয় না। সাধারণত সন্ধ্যা থেকে সকাল পর্যন্ত, রবিবার এবং ব্যাংক হলিডেতে এই সুরক্ষা কার্যকর থাকে। তবে সময় সরবরাহকারী ও মৌসুম অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।
যারা আর্থিকভাবে টপ-আপ করতে পারছেন না এবং সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন, তারা ‘অতিরিক্ত সহায়তা ক্রেডিট’-এর জন্যও আবেদন করতে পারেন। এটি বিশেষ করে পেনশন বয়সী ব্যক্তি, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি কিংবা দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় থাকা মানুষের জন্য প্রযোজ্য হতে পারে। তবে কে কতটা সহায়তা পাবেন, তা সরবরাহকারী পরিস্থিতি অনুযায়ী নির্ধারণ করে।
আপনি ঝুঁকিপূর্ণ শ্রেণিতে না পড়লেও সরবরাহকারীকে জানানো জরুরি। তারা আপনার ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা পুনর্বিবেচনা করতে পারে, হার্ডশিপ ফান্ডে সহায়তা দিতে পারে অথবা অন্য কোনো উপায়ে বিল পরিশোধ সহজ করতে পারে।
যারা তুলনামূলক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছেন, তাদের জন্য ‘Priority Services Register’ একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা ব্যবস্থা। এটি এনার্জি সরবরাহকারী ও নেটওয়ার্ক অপারেটরদের পরিচালিত একটি বিনামূল্যের পরিষেবা।
এই রেজিস্টারে নাম থাকলে পরিকল্পিত বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার আগে আগাম সতর্কবার্তা, জরুরি অবস্থায় অগ্রাধিকারভিত্তিক সহায়তা, মিটার পড়তে সমস্যা হলে নিয়মিত মিটার রিডিং এবং বড় অক্ষর বা ব্রেইলসহ সহজলভ্য ফরম্যাটে বিল ও তথ্য পাওয়ার সুবিধা মিলতে পারে।
কেউ চাইলে নিজের পরিবর্তে পরিবারের অন্য একজনকে বিল ও গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ পাওয়ার জন্য মনোনীত করতে পারেন। যাদের মিটারে টপ-আপ করা কঠিন, তাদের ক্ষেত্রে মিটারের অবস্থান পরিবর্তনের মতো সহায়তাও দেওয়া যেতে পারে।
এনার্জি বিল পরিশোধে সমস্যায় পড়লে শুধু সরবরাহকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করলেই হবে না, আপনি সরকারি কোনো সহায়তার জন্য যোগ্য কি না সেটিও যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।
আপনার পরিস্থিতি, বয়স, সুবিধাভোগী ভাতা পাওয়া, পেনশনভোগী হওয়া এবং পরিবারের সদস্যদের অবস্থার ওপর নির্ভর করে বিভিন্ন ধরনের সরকারি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ থাকতে পারে। কিছু সহায়তা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দেওয়া হয়, আবার কিছু সুবিধা নির্দিষ্ট যোগ্যতার ওপর নির্ভর করে।
তাই এনার্জি বিল দিতে কষ্ট হলে বিষয়টি গোপন না রেখে দ্রুত সরবরাহকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করা এবং একই সঙ্গে সরকারি সহায়তার জন্য নিজের যোগ্যতা যাচাই করা উচিত। সময়মতো ব্যবস্থা নিলে বিলের ঋণ আরও বাড়ার আগেই পরিশোধের জন্য তুলনামূলক সহজ একটি ব্যবস্থা পাওয়া সম্ভব হতে পারে।