যুক্তরাজ্য

MSE
১৭ আগস্ট ২০২৬, ১২:০৮
আরও খবর

যুক্তরাজ্যে বাড়ির ছাদে সোলার প্যানেল বসানো কি সত্যিই লাভজনক?

16414_images-5 2.jpeg

যুক্তরাজ্যে সোলার প্যানেলের জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে। ইতোমধ্যে দেশজুড়ে প্রায় ২০ লাখ বাড়িতে সোলার প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে। বিদ্যুৎ বিল কমানোর পাশাপাশি বাড়িতে উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করে আয়ও করা যায়। এমনকি আকাশ মেঘলা থাকলেও সোলার প্যানেল বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। তবে শুরুতেই বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করতে হয়। একটি সাধারণ সোলার প্যানেল ব্যবস্থা বসাতে গড়ে প্রায় ৭,৬০০ পাউন্ড খরচ হতে পারে। ফলে প্যানেল বসানোর আগে হিসাব করে দেখা জরুরি, আপনার ক্ষেত্রে এটি আদৌ লাভজনক হবে কি না।

সোলার প্যানেল সূর্যের আলোকে বিদ্যুতে রূপান্তর করে। প্যানেলের ভেতরে থাকা ফটোভোলটাইক বা পিভি কোষে সূর্যের আলো পড়লে ইলেকট্রন চলাচল শুরু করে এবং এর মাধ্যমে বৈদ্যুতিক প্রবাহ তৈরি হয়। সেই বিদ্যুৎ সরাসরি বাড়ির আলো, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি এমনকি বৈদ্যুতিক গাড়িতেও ব্যবহার করা যায়। বাড়িতে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ তৈরি হলে তা জাতীয় গ্রিডে পাঠানো সম্ভব এবং নির্দিষ্ট ব্যবস্থার আওতায় এর জন্য অর্থও পাওয়া যায়।

তবে সোলার প্যানেল বসানোর সবচেয়ে বড় বাধা হলো প্রাথমিক খরচ। এনার্জি সেভিং ট্রাস্টের হিসাব অনুযায়ী, একটি সাধারণ ৪.৫ কিলোওয়াট-পিক সোলার পিভি ব্যবস্থার জন্য প্রায় ৭,৬০০ পাউন্ড খরচ হতে পারে। অবশ্য বাড়ির আকার, প্যানেলের সংখ্যা, ইনস্টলার এবং আপনি যুক্তরাজ্যের কোথায় থাকেন; এসবের ওপর প্রকৃত খরচ কমবেশি হতে পারে।

এর বিপরীতে বিদ্যুৎ বিল থেকে বছরে কয়েকশ পাউন্ড পর্যন্ত সাশ্রয় করা সম্ভব। বর্তমান বিদ্যুৎমূল্যের হিসাবে একটি সাধারণ ৪.৫ কিলোওয়াট-পিক ব্যবস্থায় বছরে আনুমানিক ১৯০ থেকে ৩৩০ পাউন্ড পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিল কমতে পারে। আপনি দিনে বাড়িতে কতটা সময় থাকেন এবং উৎপাদিত বিদ্যুৎ কতটা নিজে ব্যবহার করেন, তার ওপর সাশ্রয়ের পরিমাণ নির্ভর করবে।

নিজের প্রয়োজন মেটানোর পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে বিক্রি করেও আয় করা যায়। এ জন্য রয়েছে সরকারের স্মার্ট এক্সপোর্ট গ্যারান্টি বা এসইজি ব্যবস্থা। তবে বিভিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহকারী অতিরিক্ত বিদ্যুতের জন্য ভিন্ন ভিন্ন হারে অর্থ দেয়। কোথাও প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় মাত্র ১ পেন্স পাওয়া যেতে পারে, আবার কোনো কোনো ট্যারিফে তা ২৫ পেন্স পর্যন্ত হতে পারে। তাই সোলার প্যানেল বসানোর পর ভালো এক্সপোর্ট ট্যারিফ বেছে নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।

এসইজি থেকে অর্থ পেতে সাধারণত বাড়িতে কার্যকর স্মার্ট মিটার থাকতে হবে এবং সোলার প্যানেল ব্যবস্থা ও ইনস্টলারকে মাইক্রোজেনারেশন সার্টিফিকেশন স্কিম বা এমসিএস-এর নির্ধারিত মান পূরণ করতে হবে। ইনস্টলার বাছাইয়ের সময় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি ও সুনামও যাচাই করা জরুরি।

তবে সোলার প্যানেল থেকে বিনিয়োগের টাকা ফেরত পেতে সময় লাগে। প্রায় ৭,৬০০ পাউন্ডের একটি সাধারণ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে বর্তমান হিসাব অনুযায়ী অনেক পরিবারের প্রায় ১০ বছর বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে। যুক্তরাজ্যের কোন অঞ্চলে আপনার বাড়ি এবং আপনি কতটা বিদ্যুৎ নিজে ব্যবহার করেন, তার ওপর এই সময় আরও কমবেশি হতে পারে।

উদাহরণ হিসেবে, লন্ডনে একটি সাধারণ বাড়িতে বছরে বিদ্যুৎ বিল থেকে আনুমানিক ২০০ থেকে ৩৩০ পাউন্ড সাশ্রয় হতে পারে এবং অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে বিক্রি করে প্রায় ৫১১ থেকে ৫৯০ পাউন্ড পাওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ মোট বার্ষিক সুবিধা প্রায় ৮১৬ থেকে ৮৭৫ পাউন্ড পর্যন্ত হতে পারে এবং হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৯ বছরে প্রাথমিক বিনিয়োগ উঠে আসতে পারে। অ্যাবেরিস্টউইথে সময় লাগতে পারে প্রায় ৯ থেকে ১০ বছর এবং স্টার্লিংয়ে প্রায় ১১ থেকে ১২ বছর।

তবে এই হিসাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে। ভবিষ্যতেও এসইজি ট্যারিফ থেকে একই ধরনের আয় পাওয়া যাবে; এমন নিশ্চয়তা নেই। বর্তমানে এই ব্যবস্থা বন্ধ করার কোনো পরিকল্পনা নেই, তবে আগামী ১০ বছর বা তারও বেশি সময় একইভাবে চলবে, তার নিশ্চয়তাও নেই।

সোলার প্যানেল থেকে সর্বোচ্চ সাশ্রয় করতে হলে দিনের বেলায় উৎপাদিত বিদ্যুৎ যতটা সম্ভব নিজেই ব্যবহার করা ভালো। কারণ আপনি যে বিদ্যুৎ গ্রিড থেকে কিনছেন, তার দাম সাধারণত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে বিক্রি করে যে অর্থ পান তার চেয়ে অনেক বেশি। তাই দিনের বেলায় ওয়াশিং মেশিন, ডিশওয়াশার বা অন্যান্য বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী যন্ত্র চালানো হলে নিজের উৎপাদিত বিদ্যুৎ কাজে লাগানোর সুযোগ বাড়ে।

সোলার ব্যাটারি থাকলে দিনের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সংরক্ষণ করে রাতে ব্যবহার করা যায়। এতে গ্রিডে কম বিদ্যুৎ বিক্রি করতে হলেও নিজের উৎপাদিত বিদ্যুৎ বেশি ব্যবহার করা সম্ভব হয়। তবে ব্যাটারির জন্য আলাদা খরচ রয়েছে এবং গড়ে প্রায় ৫,০০০ পাউন্ড পর্যন্ত খরচ হতে পারে। ফলে ব্যাটারি যোগ করলে প্রাথমিক বিনিয়োগের টাকা ফেরত পেতে আরও বেশি সময় লাগতে পারে।

সব বাড়ির ছাদ আবার সোলার প্যানেলের জন্য সমানভাবে উপযুক্ত নয়। দক্ষিণমুখী ছাদ সাধারণত সবচেয়ে ভালো ফল দেয়। পূর্ব বা পশ্চিমমুখী ছাদেও ভালোভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব, তবে উত্তরমুখী ছাদে সরাসরি সূর্যের আলো কম পাওয়ায় উৎপাদন তুলনামূলক কম হতে পারে। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে ছাদে বেশি ছায়া পড়লে উৎপাদনও কমে যাবে। গাছ বা পাশের ভবনের ছায়া তাই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

প্যানেল বসানোর জন্য ছাদে পর্যাপ্ত জায়গা থাকতে হবে এবং ছাদের কাঠামো ভালো অবস্থায় আছে কি না, সেটিও আগে পরীক্ষা করা উচিত। একটি সোলার প্যানেলের জন্য সাধারণত প্রায় দুই বর্গমিটার জায়গা প্রয়োজন হয়। সমতল ছাদে প্যানেল বসাতে বিশেষ ফিক্সিংয়ের প্রয়োজন হতে পারে, ফলে খরচও কিছুটা বাড়তে পারে।

ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে বেশিরভাগ সাধারণ বাড়িতে সোলার প্যানেল বসানোর জন্য আলাদা পরিকল্পনা অনুমোদনের প্রয়োজন হয় না, কারণ এগুলো সাধারণত ‘পারমিটেড ডেভেলপমেন্ট’-এর আওতায় পড়ে। তবে তালিকাভুক্ত ভবন বা সংরক্ষণ এলাকার বাড়ির ক্ষেত্রে আলাদা অনুমোদনের প্রয়োজন হতে পারে। তাই স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আগে বিষয়টি যাচাই করা ভালো।

যারা আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বাড়ি বিক্রি করে অন্যত্র চলে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন, তাদের জন্য সোলার প্যানেল সবসময় আর্থিকভাবে লাভজনক নাও হতে পারে। কারণ সাধারণত বিনিয়োগের টাকা তুলতেই প্রায় ১০ বছর সময় লাগে। যদিও সোলার প্যানেল বাড়ির আকর্ষণ বাড়াতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে বিক্রয়মূল্যও বাড়তে পারে, পুরো বিনিয়োগের অর্থ বাড়ির দামে ফিরে আসবে; এমন নিশ্চয়তা নেই।

সোলার এনার্জি ইউকে-এর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সোলার প্যানেল থাকা বাড়ির মূল্য কিছু ক্ষেত্রে প্রায় ২ শতাংশ পর্যন্ত বেশি হতে পারে। অন্য কিছু সংস্থার হিসাবে বৃদ্ধির পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে। তবে ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব এস্টেট এজেন্টসের মতে, স্বল্পমেয়াদে সোলার প্যানেলের পুরো খরচ বাড়ির অতিরিক্ত মূল্যে প্রতিফলিত নাও হতে পারে।

সোলার প্যানেল বসালে নিজের বিদ্যুৎ সরবরাহকারী বদলানোও বন্ধ হয়ে যায় না। আপনি চাইলে পরবর্তীতে অন্য এনার্জি কোম্পানিতে চলে যেতে পারেন। এমনকি যে প্রতিষ্ঠান আপনার বাড়িতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে, তার কাছ থেকেই অতিরিক্ত সোলার বিদ্যুতের জন্য অর্থ নিতে হবে; এমন বাধ্যবাধকতাও নেই। তবে কিছু সরবরাহকারী নিজেদের গ্রাহকদের বেশি এক্সপোর্ট রেট দিতে পারে।

সাধারণভাবে ভালো মানের সোলার প্যানেল প্রায় ২৫ বছর বা তারও বেশি সময় চলতে পারে। আধুনিক কিছু প্যানেলের কার্যকর আয়ু ৪০ বছর বা তার বেশি হতে পারে। তবে প্রায় ২০ থেকে ২৫ বছর পর প্যানেলের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করতে পারে।

রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রেও সোলার প্যানেল তুলনামূলক সহজ। যুক্তরাজ্যের নিয়মিত বৃষ্টিপাত সাধারণত প্যানেল পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে। তবে আশপাশের গাছপালা ছাঁটাই করে রাখা দরকার, যাতে প্যানেলের ওপর ছায়া না পড়ে। প্যানেলের নিচে পাখি বাসা বাঁধা ঠেকাতে বিশেষ ‘পিজন-প্রুফিং’ ব্যবস্থাও করা যায়।

তবে সোলার প্যানেলের একটি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র ইনভার্টার প্রায় ১০ বছর পর বদলানোর প্রয়োজন হতে পারে। এর জন্য আনুমানিক ৮০০ পাউন্ড পর্যন্ত খরচ হতে পারে। ইনস্টলারের ওয়ারেন্টিও ভালোভাবে দেখে নেওয়া জরুরি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা ২০ বছর পর্যন্ত সুরক্ষা দিতে পারে। ঝড় বা অন্য কোনো দুর্ঘটনায় প্যানেল ক্ষতিগ্রস্ত হলে বাড়ির বিল্ডিং ইনস্যুরেন্সে তা অন্তর্ভুক্ত আছে কি না, সেটিও আগে যাচাই করা উচিত।

সবশেষে, কম দামে সোলার প্যানেল বসানোর প্রলোভন দেখানো বিজ্ঞাপন বা ইমেইল থেকে সতর্ক থাকা জরুরি। সস্তা ইনস্টলেশন, বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা সোলার প্যানেল পরিষেবার নামে প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে। তাই ইনস্টলার বেছে নেওয়ার সময় স্বীকৃত ও বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করা এবং অন্তত তিনটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে লিখিত কোটেশন নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ।

সব মিলিয়ে, সোলার প্যানেল দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ বিল কমানোর ভালো উপায় হতে পারে, বিশেষ করে যাদের বাড়িতে দিনের বেলায় বিদ্যুৎ ব্যবহার বেশি এবং ছাদে পর্যাপ্ত সূর্যালোক পাওয়া যায়। তবে প্রায় ৭,৬০০ পাউন্ডের প্রাথমিক বিনিয়োগ এবং প্রায় এক দশক বা তার বেশি সময়ের পে-ব্যাক সময় বিবেচনা না করে শুধু ‘বিদ্যুৎ বিল কমবে’; এই ধারণায় সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। নিজের বাড়ির অবস্থান, বিদ্যুৎ ব্যবহারের ধরন, ছাদের দিক ও অবস্থা, সম্ভাব্য এক্সপোর্ট আয় এবং ভবিষ্যতে কতদিন বাড়িতে থাকার পরিকল্পনা রয়েছে; সবকিছু হিসাব করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।

সর্বাধিক পঠিত


আরও খবর
ভিডিও