
নিরপরাধ এক ক্রেতাকে ভুল করে চোর হিসেবে অভিযুক্ত করার ঘটনার পর যুক্তরাজ্যের অন্যতম বড় সুপারমার্কেট চেইন স্যান্সবারিজ তাদের লাইভ ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তির ব্যবহার সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। দক্ষিণ-পূর্ব লন্ডনের ইস্ট ডালউইচে স্যান্সবারিজের একটি শাখায় এ ঘটনা ঘটে।
গত ৬ আগস্ট ৪৬ বছর বয়সী ম্যাট আর্নল্ড নামের এক কমেডি প্রমোটার দোকানটিতে কেনাকাটা করতে যান। তিনি লয়্যালটি কার্ড স্ক্যান করে সেলফ-সার্ভিস কাউন্টারে পেমেন্টের অপেক্ষায় ছিলেন। কমেডি অনুষ্ঠানের পারফর্মারদের জন্য তিনি অ্যালকোহলযুক্ত পানীয়ের পাশাপাশি কোমল পানীয় ও বিভিন্ন স্ন্যাকস কিনছিলেন।
কেনাকাটার সময় নিরাপত্তাকর্মীরা তাকে সেলফ-সার্ভিস কাউন্টারে থামান। আর্নল্ড নিজেই নিরাপত্তাকর্মীর দিকে হাত নেড়ে তাকে যাচাই করতে বলেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পর তাকে জানানো হয়, সপ্তাহের শুরুতে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার কারণে তাকে সেদিন দোকান থেকে কোনো পণ্য কেনার অনুমতি দেওয়া হবে না।
আর্নল্ড জানান, তার কমেডি অনুষ্ঠানের জন্য কেনা খাবার ও পানীয় সরবরাহের সময় তখন মাত্র ১০ মিনিটের মতো বাকি ছিল। তাই তিনি তার এক সহকর্মীকে দিয়ে পণ্যগুলোর মূল্য পরিশোধ করানোর অনুরোধ করেন। দোকানের কর্মীরা এতে সম্মতি দিলেও তাকে দোকান থেকে বের করে দেওয়া হয়।
পরে তাকে জানানো হয়, দোকানে একজন দোকানচোর শনাক্ত হয়েছিল। কিন্তু ওই ঘটনার সময় দোকানের কর্মীরা তাদের শরীরে থাকা ক্যামেরা চালু করতে ব্যর্থ হওয়ায় ভুল ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়েছিল। এরপর তাকে এই প্রযুক্তি পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ফেসওয়াচের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়।
ঘটনায় আর্নল্ড অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন। তিনি বলেন, প্রকাশ্যে কাউকে চোর হিসেবে অভিযুক্ত করা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিশেষ করে কোনো ব্যক্তি যদি উদ্বেগ বা অন্য কোনো মানসিক সমস্যায় ভোগেন, তাহলে এ ধরনের ভুল অভিযোগ তার ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।
পরে পরিস্থিতি সামাল দিতে স্যান্সবারিজের পক্ষ থেকে আর্নল্ডকে ১৫০ পাউন্ডের একটি শুভেচ্ছা ভাউচার দেওয়া হয়। তবে তিনি সেই অর্থ নিজের জন্য ব্যবহার না করে একটি স্থানীয় ফুডব্যাংকে দান করেন।
এদিকে গোপনীয়তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন বিগ ব্রাদার ওয়াচের প্রধান নির্বাহী সিলকি কার্লো লাইভ ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তির তীব্র সমালোচনা করেছেন। তার দাবি, ফেসওয়াচ একাধিক দোকানের মধ্যে তথ্য শেয়ার করতে পারে। ফলে কোনো ব্যক্তি নিজের অজান্তেই বিভিন্ন দোকানে প্রবেশের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে পারেন।
কার্লোর মতে, একটি জাতীয় পর্যায়ের খুচরা বিক্রেতা যখন বিপুলসংখ্যক ক্রেতার পরিচয় যাচাই করতে এ ধরনের নজরদারি প্রযুক্তি ব্যবহার করে, তখন গুরুতর ভুলের ঝুঁকি থেকেই যায়। তিনি বলেন, আর্নল্ড এমন একটি অপরাধের জন্য সহকর্মীদের সামনে প্রকাশ্যে অপমানিত হয়েছেন, যা তিনি করেননি।
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, এ ধরনের ভুল শনাক্তকরণ একজনের চাকরি ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। তার দাবি, লাইভ ফেসিয়াল রিকগনিশন শুধু ক্রেতাদের গোপনীয়তার জন্য হুমকি নয়, বরং ভুল শনাক্তকরণের কারণে নিরপরাধ মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
ঘটনার পর স্যান্সবারিজ জানিয়েছে, তারা ম্যাট আর্নল্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এবং পুরো বিষয়টি পর্যালোচনা করছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ডালউইচ শাখায় লাইভ ফেসিয়াল রিকগনিশন সিস্টেমের ব্যবহার স্থগিত রাখা হয়েছে।
তবে স্যান্সবারিজের একজন মুখপাত্র দাবি করেছেন, ফেসওয়াচ সিস্টেমের নির্ভুলতার হার ৯৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে শনাক্ত হওয়া প্রতিটি সম্ভাব্য মিল প্রশিক্ষিত ব্যবস্থাপকদের মাধ্যমে পর্যালোচনা করা হয়।
নিরাপত্তার জন্য দোকানে প্রযুক্তিটির ব্যবহার কতটা যুক্তিসঙ্গত এবং ভুল শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে ক্রেতাদের অধিকার কীভাবে সুরক্ষিত হবে—এই ঘটনা সেই প্রশ্নগুলোকে নতুন করে সামনে এনেছে।