
জনপ্রিয় মার্কিন অভিনেত্রী হেইডেন প্যানেটিয়ের আর নেই। ‘হিরোস’ ও ‘ন্যাশভিল’ টিভি সিরিজে অভিনয়ের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পাওয়া এই অভিনেত্রীর আকস্মিক মৃত্যু হয়েছে মাত্র ৩৬ বছর বয়সে। তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন বাবা স্কিপ প্যানেটিয়ের।
এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “গভীর দুঃখের সঙ্গে আমরা আমাদের প্রিয় হেইডেনের মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর জানাচ্ছি। তিনি ছিলেন অসাধারণ এক আলোকবর্তিকা এবং শক্তিশালী এক ব্যক্তিত্ব, যিনি তাকে চেনা মানুষদের পাশাপাশি পর্দায় তাকে দেখা কোটি কোটি দর্শকের জীবনে অপরিসীম ভালোবাসা ও আনন্দ এনে দিয়েছেন।” একই সঙ্গে এই কঠিন সময়ে পরিবারের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার জন্য সবার প্রতি অনুরোধ জানান তিনি।
দক্ষিণ ক্যারোলিনার গ্রিনভিল পুলিশ জানিয়েছে, হেইডেনের এক পরিচিত ব্যক্তি জরুরি নম্বর ৯১১-এ ফোন করার পর ঘটনাস্থলে জরুরি সেবার কর্মীরা পৌঁছান। তবে তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। তার মৃত্যুর ঘটনা গ্রিনভিল পুলিশ বিভাগ ও গ্রিনভিল কাউন্টি করোনারের কার্যালয় যৌথভাবে তদন্ত করছে।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে এখন পর্যন্ত কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বা সন্দেহজনক পরিস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে তদন্ত চলমান থাকায় তার মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে এখনো কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। হেইডেনের প্রচারক কেসি কিচেনও জানিয়েছেন, মৃত্যুর ঘটনা তদন্তাধীন রয়েছে এবং আরও তথ্য পরে জানা যেতে পারে।
হেইডেন প্যানেটিয়েরের আকস্মিক মৃত্যুর পর তার জীবনের নানা অজানা ও বেদনাদায়ক অধ্যায়ও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। মৃত্যুর আগে প্রকাশিত তার স্মৃতিকথা ‘দিস ইজ মি: আ রেকনিং’-এ তিনি শিশু তারকা হিসেবে ক্যামেরার সামনে বেড়ে ওঠা, খ্যাতির চাপ, মানসিক সংকট, আসক্তি এবং সুস্থ হয়ে ওঠার দীর্ঘ সংগ্রামের কথা খোলামেলা তুলে ধরেছিলেন।
মাত্র ১১ মাস বয়সে বিজ্ঞাপনে অভিনয়ের মাধ্যমে ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন হেইডেন। এরপর ‘ওয়ান লাইফ টু লাইভ’ ও ‘গাইডিং লাইট’-এর মতো জনপ্রিয় ধারাবাহিকে শিশু অভিনেত্রী হিসেবে কাজ করেন। মাত্র ৯ বছর বয়সে ‘এ বাগস লাইফ’ চলচ্চিত্রে প্রিন্সেস ডট চরিত্রে কণ্ঠ দেওয়ার মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হয় তার।
তবে শৈশবের এই সাফল্যের আড়ালে ছিল নানা কঠিন অভিজ্ঞতা। স্মৃতিকথায় হেইডেন শিশু তারকা হিসেবে ক্যামেরার সামনে বেড়ে ওঠার সময়ের অন্ধকার দিক তুলে ধরেন। বিনোদন জগতের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ ও আচরণের কথাও তিনি প্রকাশ করেন। তার অভিজ্ঞতাগুলো দেখিয়েছিল, অল্প বয়সে খ্যাতির জগতে প্রবেশ করা একজন শিশুশিল্পীর জন্য সেই পরিবেশ কতটা কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
স্মৃতিকথায় তথাকথিত ‘হ্যাপি পিল’ ব্যবহারের অভিজ্ঞতার কথাও উঠে আসে। দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, বিষণ্নতা ও উদ্বেগের পাশাপাশি অ্যালকোহল ও মাদকাসক্তির সঙ্গে তার লড়াই কীভাবে জীবনকে অন্ধকার করে দিয়েছিল, সেটিও তিনি বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেন।
হেইডেন নিজেই বলেছিলেন, বহু বছর ধরে তিনি বিষণ্নতা, উদ্বেগ, অ্যালকোহল ও মাদকাসক্তির একটি “ভয়াবহ চক্রের” মধ্যে ছিলেন। সেই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে নিজের জীবনকে আবার গুছিয়ে নেওয়ার জন্য তাকে দীর্ঘ ও কঠিন সংগ্রাম করতে হয়েছিল।
২০০৬ সালে ‘হিরোস’ সিরিজে অতিমানবীয় ক্ষমতাসম্পন্ন এক চিয়ারলিডারের চরিত্রে অভিনয় করে হেইডেন আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেন। চরিত্রটি তাকে তিনটি টিন চয়েস অ্যাওয়ার্ড এনে দেয় এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি হলিউডের পরিচিত মুখে পরিণত হন।
এরপর ‘ন্যাশভিল’ সিরিজে উচ্চাকাঙ্ক্ষী এক তরুণ কান্ট্রি মিউজিক শিল্পীর চরিত্রে অভিনয় করে আরও প্রশংসা পান তিনি। সিরিজটিতে নিজের কণ্ঠেই গান গেয়েছিলেন হেইডেন। তার গান কান্ট্রি মিউজিক চার্টেও সাফল্য পায় এবং অভিনয়ের জন্য তিনি দুইবার গোল্ডেন গ্লোব পুরস্কারের মনোনয়ন পান। এছাড়াও জনপ্রিয় ‘স্ক্রিম’ চলচ্চিত্র সিরিজে অভিনয় করেছেন তিনি।
তবে ক্যারিয়ারের সাফল্যের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনেও নানা সংকটের মুখোমুখি হন হেইডেন। ২০১৮ সালে সাবেক সঙ্গী ও ইউক্রেনের পেশাদার বক্সার ভ্লাদিমির ক্লিৎসকোর সঙ্গে তার একমাত্র সন্তান কায়ার অভিভাবকত্বের দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। পরে এ নিয়ে তৈরি হওয়া ভুল ধারণার জবাব দিয়ে হেইডেন বলেছিলেন, তিনি কখনোই সন্তানকে “ছেড়ে দেননি”। বরং নিজের বিষণ্নতা, আসক্তি ও মানসিক সংকট থেকে বেরিয়ে আসার জন্য তখন তিনি কঠিন লড়াই করছিলেন।
২০২৩ সালে হেইডেনের ছোট ভাইও আকস্মিকভাবে মারা যান। পরের বছর এক সাক্ষাৎকারে ভাইকে হারানোর শোক নিয়ে তিনি বলেছিলেন, জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে পাশে থাকা কাউকে হারানো “পুরো পৃথিবীটাই যেন নাড়িয়ে দেয়”।
পর্দায় ঝলমলে সাফল্য, অল্প বয়সে খ্যাতি এবং তার আড়ালে মানসিক চাপ, আসক্তি ও ব্যক্তিগত সংকট—হেইডেন প্যানেটিয়েরের জীবন ছিল নানা বৈপরীত্যে ভরা। তার স্মৃতিকথা সেই জীবনের এমন অনেক অন্ধকার অধ্যায় সামনে এনেছিল, যা দর্শকদের কাছে তার পরিচিত তারকা-ইমেজের সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি দিক তুলে ধরে।
আগামী শুক্রবারই ৩৭ বছরে পা দেওয়ার কথা ছিল হেইডেনের। কিন্তু তার আগেই ৩৬ বছর বয়সে আকস্মিক মৃত্যুতে থেমে গেল এই সম্ভাবনাময় অভিনেত্রীর জীবন। তার মৃত্যুতে পরিবার, সহকর্মী এবং বিশ্বজুড়ে অসংখ্য ভক্তের মধ্যে নেমে এসেছে গভীর শোক।