
ডেভিড ও ভিক্টোরিয়া বেকহ্যামের মেয়ে হার্পারের জন্মদিনের আয়োজন ঘিরে একসময় ব্রিটিশ রাজপরিবারে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে নতুন একটি বইয়ে। ২০১৭ সালে বাকিংহাম প্যালেসে হার্পারের ষষ্ঠ জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের পরই এই বিতর্ক তৈরি হয়।
‘ব্র্যান্ড বেকহ্যাম’ নামের বইয়ে লেখক অ্যালিসন বোশফ দাবি করেছেন, তৎকালীন প্রিন্স অ্যান্ড্রুর আমন্ত্রণে বেকহ্যাম পরিবার বাকিংহাম প্যালেসে গিয়েছিল। অ্যান্ড্রুর ব্যক্তিগত অ্যাপার্টমেন্টে হার্পারের জন্মদিন উপলক্ষে একটি চা-চক্রের আয়োজন করা হয়েছিল। অ্যান্ড্রুর সাবেক স্ত্রী সারাহ ফার্গুসনের পরামর্শেই এই আমন্ত্রণের ব্যবস্থা হয়েছিল বলে বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
সারাহ ফার্গুসনের সঙ্গে ভিক্টোরিয়া বেকহ্যামের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব ছিল। ভিক্টোরিয়া যখন স্পাইস গার্লসের সদস্য ছিলেন, তখন থেকেই তাদের পরিচয়। পরবর্তীতে স্যার এলটন জনসহ বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানের সূত্রেও তাদের সম্পর্ক বজায় ছিল।
২০১৭ সালের ৩ জুলাই ডেভিড বেকহ্যাম ইনস্টাগ্রামে হার্পারের জন্মদিনের বেশ কিছু ছবি প্রকাশ করেন। ছবিতে হার্পারকে বাকিংহাম প্যালেসের সামনের অংশে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা যায়। শিশুদের অনেকেই রাজকন্যার পোশাক পরেছিল এবং কারও মাথায় ছিল কাগজের তৈরি মুকুট। একটি ছবিতে প্রিন্সেস ইউজেনিয়াকেও শিশুদের পাশে দেখা যায়।
ভিক্টোরিয়া সে সময় ফ্যাশন-সংক্রান্ত কাজে ব্যস্ত থাকায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না। তবে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হার্পারের ‘ফ্রোজেন’ সিনেমার চরিত্র প্রিন্সেস এলসার পোশাক পরা একটি ছবি প্রকাশ করে তাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানান।
ছবিগুলো প্রকাশের পরই শুরু হয় বিতর্ক। তৎকালীন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের সাবেক প্রেস সেক্রেটারি ডিকি আর্বিটার প্রশ্ন তোলেন, বাকিংহাম প্যালেসে বেকহ্যামদের এমন উপস্থিতির অনুমতি কীভাবে দেওয়া হলো। তার মতে, এতে প্রাসাদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা ছিল। একই সময়ে ২০১৭ সালের গ্রেনফেল টাওয়ার অগ্নিকাণ্ডের পর দেশজুড়ে শোকের আবহ থাকায় ব্যক্তিগত জন্মদিনের অনুষ্ঠানের জন্য রাজপ্রাসাদ ব্যবহারের বিষয়টিও সমালোচনার মুখে পড়ে।
তবে বইটির দাবি অনুযায়ী, বেকহ্যাম পরিবার নিজেরা বাকিংহাম প্যালেস ব্যবহারের ব্যবস্থা করেনি। তাদের অ্যান্ড্রুর ব্যক্তিগত অ্যাপার্টমেন্টে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল এবং সেখানেই মূল অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। পরে অতিথিদের জন্য প্রাসাদের একটি অংশে চা-চক্রের আয়োজন করা হয়।
বিতর্কের সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায় অনুষ্ঠানের ছবি অনলাইনে প্রকাশ করা। ডেইলি মেইলের তৎকালীন সম্পাদক-অ্যাট-লার্জের বরাত দিয়ে বইটিতে দাবি করা হয়েছে, রাজপরিবারের একজন অভ্যন্তরীণ ব্যক্তি ঘটনাটিকে ‘গুরুতর প্রটোকল ভঙ্গ’ হিসেবে দেখেছিলেন। ওই সূত্রের দাবি ছিল, বাকিংহাম প্যালেসের নির্দিষ্ট অংশে ছবি তোলার অনুমতি ছিল না এবং বিষয়টি তৎকালীন প্রিন্স চার্লসকে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ করেছিল। এমনকি প্রিন্স উইলিয়ামও বিষয়টি ভালোভাবে নেবেন না বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল।
ওই সময় এমন কথাও শোনা যায় যে, রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে স্কটল্যান্ডে থাকায় অ্যান্ড্রুর মাধ্যমে এই আমন্ত্রণের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়েছিল।
পরদিন বিষয়টি পরিষ্কার করার চেষ্টা করেন ডেভিড বেকহ্যাম। তিনি জানান, হার্পারের জন্মদিন উপলক্ষে বাকিংহাম প্যালেস বিশেষভাবে খুলে দেওয়া হয়নি। বরং তারা অন্য অতিথিদের সঙ্গে একটি চা-চক্রে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন। তিনি এই অভিজ্ঞতাকে পরিবারের জন্য অত্যন্ত আনন্দের এবং সম্মানের বলে উল্লেখ করেন।
তবে সেই ঘটনার বহু বছর পর রাজপরিবার ও বেকহ্যাম পরিবারের সম্পর্কের চিত্র অনেকটাই বদলে যায়। ২০২৫ সালের নভেম্বরে কিং চার্লস তৃতীয় ডেভিড বেকহ্যামকে খেলাধুলা ও দাতব্য কর্মকাণ্ডে অবদানের জন্য নাইটহুড প্রদান করেন। উইন্ডসর ক্যাসেলে অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে ডেভিডের সঙ্গে ছিলেন তার স্ত্রী ভিক্টোরিয়া এবং বাবা-মা টেড ও স্যান্ড্রা বেকহ্যাম।
সম্মাননা পাওয়ার পর ডেভিড বেকহ্যাম বলেন, এই স্বীকৃতি পেয়ে তিনি ‘অত্যন্ত গর্বিত’। ভিক্টোরিয়াও স্বামীকে তার ‘নাইট ইন শাইনিং আর্মার’ বলে অভিহিত করে জানান, তিনি ডেভিডকে নিয়ে আরও বেশি গর্বিত।
অর্থাৎ, ২০১৭ সালে বাকিংহাম প্যালেসে একটি শিশুর জন্মদিনের ছবি প্রকাশকে ঘিরে যে রাজকীয় অস্বস্তির কথা উঠে এসেছিল, তার কয়েক বছর পর সেই একই ডেভিড বেকহ্যামই কিং চার্লসের হাত থেকে ব্রিটেনের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননা গ্রহণ করেন।