
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে থাকেন রাষ্ট্রপতি। সংবিধান অনুযায়ী তিনিই রাষ্ট্রের প্রধান। অনেকেই মনে করেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের বড় একটি অংশই রাষ্ট্রপতির হাতে। কিন্তু সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় চিত্রটি ভিন্ন। রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রধান হলেও নির্বাহী ক্ষমতার মূল কেন্দ্র প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা। ফলে রাষ্ট্রপতির অনেক ক্ষমতা সংবিধানে উল্লেখ থাকলেও সেগুলোর প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শই নির্ধারক।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ। এই একটি অনুচ্ছেদই মূলত রাষ্ট্রপতির স্বাধীন ক্ষমতার সীমা পরিষ্কার করে দেয়। প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ এবং প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া অন্য সব দায়িত্ব পালনের সময় রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হয়।
রাষ্ট্রপতি জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন না। সংবিধানের ৪৮(১) অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সঙ্গে জাতীয় সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার সম্পর্ক রয়েছে।
১৯৯১ সালে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভাই রাষ্ট্র পরিচালনার নির্বাহী কেন্দ্র হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রপতি হলেন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান।
সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে রাষ্ট্রপতি তাঁর সব কাজ প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী করবেন। তবে দুটি কাজ এর বাইরে। প্রথমটি হলো প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ। দ্বিতীয়টি হলো প্রধান বিচারপতি নিয়োগ। সংবিধানের ভাষায়, এই দুটি নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ওপর প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুসরণ করার বাধ্যবাধকতা নেই।
তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের সময় রাষ্ট্রপতি ইচ্ছামতো যেকোনো ব্যক্তিকে প্রধানমন্ত্রী বানাতে পারেন। সংবিধানের ৫৬(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি সেই সংসদ সদস্যকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করবেন, যিনি তাঁর কাছে সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন আছে বলে প্রতীয়মান হন।
এখানে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব মূলত সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা। নির্বাচনের পর কোন সংসদ সদস্য সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমর্থন পান, সেটিই প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের মূল বিষয়।
রাষ্ট্রপতির দ্বিতীয় দায়িত্ব হলো প্রধান বিচারপতি নিয়োগ। সংবিধানের ৯৫(১) অনুযায়ী, প্রধান বিচারপতিকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ করেন। আর ৪৮(৩) অনুচ্ছেদে প্রধান বিচারপতি নিয়োগকে রাষ্ট্রপতির সেই দুই ব্যতিক্রমী কাজের একটি হিসেবে আলাদা করে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুসরণে বাধ্য করেনি।
সংসদ আহ্বান, স্থগিত বা ভেঙে দেওয়ার ক্ষমতা সংবিধানে রাষ্ট্রপতির নামে দেওয়া হয়েছে। সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সংসদ আহ্বান, স্থগিত ও ভেঙে দিতে পারেন। কিন্তু একই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, এসব দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হবে। তাই কাগজে-কলমে কাজটি রাষ্ট্রপতির হলেও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর স্বাধীনতা নেই।
রাষ্ট্রপতির অন্যান্য অনেক সাংবিধানিক দায়িত্বের ক্ষেত্রেও একই কাঠামো কাজ করে। সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদে প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগকে বাদ দিয়ে বাকি সব কাজের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুসরণের কথা বলা হয়েছে।
সংবিধানের ৪৮(৫) অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে দেশের অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে অবহিত রাখবেন। রাষ্ট্রপতি কোনো বিষয় মন্ত্রিসভায় বিবেচনার জন্য পাঠাতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী সেটি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করবেন।
রাষ্ট্রপতি কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা চাইলে তা মন্ত্রিসভায় বিবেচনার জন্য যায়। তবে সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের মূল ক্ষমতা মন্ত্রিসভা ও প্রধানমন্ত্রীর কাছেই থাকে।
এ ছাড়া রাষ্ট্রপতির একটি বহুল আলোচিত ক্ষমতা হলো দণ্ড মওকুফ বা ক্ষমা করার ক্ষমতা। সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কর্তৃপক্ষের দেওয়া দণ্ড রাষ্ট্রপতি ক্ষমা করতে, কমাতে, স্থগিত করতে বা পরিবর্তন করতে পারেন।
শুনতে এটি রাষ্ট্রপতির বড় ধরনের ব্যক্তিগত ক্ষমতা বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এখানেও ৪৮(৩)-এর মূল নীতি প্রযোজ্য—প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া রাষ্ট্রপতি তাঁর সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করবেন। ফলে ক্ষমার ক্ষমতাকে ওই দুটি স্বাধীন ক্ষমতার তালিকায় রাখা ঠিক হবে না।
সংবিধানে জরুরি অবস্থা ঘোষণার ক্ষমতাও রাষ্ট্রপতির নামে দেওয়া আছে। ১৪১এ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যুদ্ধ, বহিরাক্রমণ বা অভ্যন্তরীণ গোলযোগের কারণে দেশের নিরাপত্তা বা অর্থনৈতিক জীবন গুরুতরভাবে হুমকির মুখে পড়লে রাষ্ট্রপতি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে পারেন। তবে এই ঘোষণার বৈধতার জন্য প্রধানমন্ত্রীর পূর্বস্বাক্ষর প্রয়োজন।
রাষ্ট্রপতির নির্বাহী বা শাসনতান্ত্রিক ক্ষমতা কিছুটা সীমিত হলেও, এই পদের বিপরীতে প্রদেয় আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা কম নয়। ‘দ্য প্রেসিডেন্টস (রেমুনারেশন অ্যান্ড প্রিভিলেজ) (সংশোধন) অ্যাক্ট’ অনুযায়ী বর্তমানে রাষ্ট্রপতির মাসিক বেতন ১ লাখ ২০ হাজার টাকা, যা সম্পূর্ণ আয়করমুক্ত। ২০১৬ সালের আগে এই বেতনের পরিমাণ ছিল ৬১ হাজার ২০০ টাকা। তুলনামূলকভাবে প্রধানমন্ত্রীর মাসিক বেতন ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, মেয়াদ শেষে প্রধানমন্ত্রী কোনো সরকারি সুবিধা না পেলেও, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে বা অবসরে গেলেও বেশ কিছু রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারেন।
রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন হিসেবে ‘বঙ্গভবন’ নির্ধারিত। এই সুবিশাল বাসভবনের রক্ষণাবেক্ষণ ও সাজসজ্জার যাবতীয় খরচ রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে মেটানো হয়। এছাড়া সরকারি ও দাপ্তরিক কাজে যাতায়াতের জন্য প্রয়োজনীয় গাড়ি এবং পরিবহনের সম্পূর্ণ সুবিধাও সরকার প্রদান করে থাকে।
এছাড়া রাষ্ট্রপতির জন্য একটি বার্ষিক আপ্যায়ন ভাতা বরাদ্দ থাকে, যার হিসাব নিরীক্ষা বা অডিট করার প্রয়োজন হয় না। দাপ্তরিক প্রয়োজনে তিনি যখন বিদেশে ভ্রমণ করেন, তখন সরকার নির্ধারিত হারে বিশেষ ভাতাও পেয়ে থাকেন।
জনকল্যাণে বা বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সহায়তার জন্য রাষ্ট্রপতির একটি নিজস্ব ‘স্বেচ্ছাধীন তহবিল’ রয়েছে। এই তহবিলের আকার বছরে দুই কোটি টাকা, যা তিনি সম্পূর্ণ নিজের বিবেচনা অনুযায়ী খরচ করতে পারেন।
রাষ্ট্রপতি এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসার জন্য বিশেষ সুবিধা বরাদ্দ রয়েছে। তাঁরা দেশের যেকোনো হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করতে পারেন। চিকিৎসকের পরামর্শে বিদেশে উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন হলে তার পুরো ব্যয়ভারও সরকার বহন করে। পাশাপাশি, রাষ্ট্রপতির বিমান যাত্রার জন্য বাৎসরিক ২৭ লাখ টাকার বিমা কভারেজ রয়েছে (২০১৬ সালের আগে এটি ছিল ১৫ লাখ টাকা)।
সার্বিকভাবে বলতে গেলে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে থেকে নিশ্চিন্তে দায়িত্ব পালনের জন্য রাষ্ট্রপতিকে বেতন ছাড়াও বাসস্থান, যাতায়াত, চিকিৎসা, বিদেশ ভ্রমণ, আপ্যায়ন এবং বিমাসহ এক বিশাল সুযোগ-সুবিধার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।