
-নূর আলম সিদ্দিকী রাসেল
আইনবিদ,কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
বাংলাদেশের রাজনীতিতে জনপ্রিয় হওয়া যায় উচ্চকণ্ঠে। আলোচনায় থাকা যায় প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করে। ক্ষমতার কাছাকাছি যাওয়া যায় কৌশলে। কিন্তু দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন পেরিয়ে নিজের দলের বাইরের মানুষের কাছেও একজন ভদ্র, মার্জিত ও সজ্জন মানুষ হিসেবে পরিচিতি ধরে রাখা সম্ভবত আরও কঠিন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সেই বিরল রাজনীতিকদের একজন, যাঁকে নিয়ে রাজনৈতিক মতভেদ আছে, সমালোচনা আছে, কিন্তু তাঁর ব্যক্তিগত শালীনতা নিয়ে প্রতিপক্ষের মুখেও প্রশংসা শোনা গেছে।
একসময় তাঁর প্রবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও প্রকাশ্যে বলেছিলেন, মির্জা ফখরুল ‘সজ্জন’, মানুষ হিসেবেও ভালো। বাংলাদেশের তীব্র বিভক্ত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রতিপক্ষের কাছ থেকে এমন স্বীকৃতি খুব সাধারণ ঘটনা নয়।
সম্ভবত এখানেই মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের একটি স্বতন্ত্রতা আছে।
তিনি শুধু বিএনপির একজন নেতা নন। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন একটি ভাষা ও ব্যক্তিত্বের প্রতিনিধিত্ব করেছেন, যেখানে কঠোর রাজনৈতিক বক্তব্যও অনেক সময় পরিশীলিত ভাষায় বলা যায়।
আজ যখন তাঁর দীর্ঘ দলীয় রাজনৈতিক অধ্যায় পেরিয়ে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে বঙ্গভবনের পথে যাত্রা নিশ্চিত হয়েছে, তখন মানুষটির রাজনৈতিক জীবন ফিরে দেখারও একটি বিশেষ উপলক্ষ তৈরি হয়েছে।
শিক্ষক থেকে রাজনীতিক
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক জীবন বোঝার জন্য তাঁর শুরুর জীবনটির দিকে তাকানো জরুরি।
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে তাঁর জন্ম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর ১৯৭২ সালে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের সদস্য হিসেবে ঢাকা কলেজে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেছেন। সরকারি প্রশাসনের আরও কিছু দায়িত্বেও তিনি ছিলেন।
তবে রাজনীতি তাঁর জীবনে এসেছিল আরও আগে।
ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালে তিনি ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় হন। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের সময় পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ছিলেন। স্বাধীনতার পর কিছু সময় সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে থেকে শিক্ষকতায় মনোনিবেশ করেন। পরে সরকারি চাকরি ছেড়ে আবার রাজনীতিতে ফেরেন।
১৯৮৮ সালে নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়া তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। এরপর নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বিএনপিতে যোগ দেন এবং ধীরে ধীরে স্থানীয় রাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে উঠে আসেন।
এই যাত্রাটি লক্ষ করার মতো।একজন শিক্ষক,তারপর স্থানীয় জনপ্রতিনিধি,সংসদ সদস্য,প্রতিমন্ত্রী,দলের কেন্দ্রীয় নেতা এবং একসময় বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দলের মহাসচিব।
২০০১ সালে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি প্রথমে কৃষি এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
কিন্তু সম্ভবত মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় মন্ত্রী থাকার সময় নয়; বরং ক্ষমতার বাইরে থাকার সময়।
দুঃসময়ের মহাসচিব
ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় একটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব দেওয়া আর দীর্ঘ বিরোধী সময়ে নেতৃত্ব দেওয়া এক বিষয় নয়।
২০১১ সালে তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান। পাঁচ বছর ভারপ্রাপ্ত থাকার পর ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে দলের মহাসচিব হন।
এরপরের বছরগুলো বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে বিএনপির জন্য অত্যন্ত কঠিন সময়।
দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মামলা, কারাবরণ ও অসুস্থতা; তারেক রহমানের দীর্ঘদিন দেশের বাইরে অবস্থান; দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার; নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক সংঘাত; রাজপথের আন্দোলন এবং সাংগঠনিক চাপের মধ্যে দলের মহাসচিব হিসেবে মির্জা ফখরুলকে সামনে থাকতে হয়েছে।
তিনি নিজেও একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়েছেন, কারাগারে গেছেন।
এই দীর্ঘ সময়ে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে কেউ একমত হতে পারেন, দ্বিমতও করতে পারেন। তাঁর বক্তব্য কিংবা কৌশল নিয়েও সমালোচনা হতে পারে। সেটাই গণতন্ত্র।
কিন্তু একটি বিষয় অস্বীকার করা কঠিন: দলের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর একটি বড় অংশে তিনি দায়িত্বের জায়গাটি ছেড়ে যাননি।
রাজনীতিতে সুসময়ের সঙ্গীর অভাব হয় না। দুঃসময়ের সঙ্গীই ইতিহাসে আলাদা হয়ে থাকেন।
রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রকৃত পরীক্ষা অনেক সময় ক্ষমতায় নয়, ক্ষমতার বাইরে হয়। কারণ ক্ষমতায় নেতৃত্বের সঙ্গে রাষ্ট্রযন্ত্র ও প্রশাসনিক সুবিধা থাকে; বিরোধী রাজনীতিতে নেতৃত্বকে টিকে থাকতে হয় সংগঠন, কর্মীদের আস্থা এবং রাজনৈতিক কৌশলের ওপর। মির্জা ফখরুলের দীর্ঘ মহাসচিবকালকে তাই শুধু একটি পদে থাকার সময় দিয়ে নয়, বিএনপির সংকটকালীন রাজনীতির প্রেক্ষাপটেও মূল্যায়ন করতে হবে।
শালীনতা কি রাজনীতিতে দুর্বলতা?
মির্জা ফখরুলকে নিয়ে আলোচনা করতে গেলে তাঁর কথা বলার ধরন সামনে আসবেই।
বাংলাদেশের রাজনীতি বহুদিন ধরেই ব্যক্তিগত আক্রমণ, তীব্র শব্দ এবং কখনো কখনো অসম্মানজনক ভাষার ভার বহন করছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, প্রায় শত্রু হিসেবে দেখার সংস্কৃতি আমাদের গণতান্ত্রিক পরিসরকেও সংকুচিত করেছে।
এই পরিবেশে মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক ভাষা তুলনামূলকভাবে সংযত।
তিনি কঠোর সমালোচনা করেন। রাজনৈতিক আক্রমণও করেন। তাঁর বক্তব্য নিয়ে বিতর্কও হয়েছে। কিন্তু তাঁর ব্যক্তিগত উপস্থাপনা, শব্দচয়ন এবং আচরণের মধ্যে সাধারণত একটি পরিমিতি দেখা যায়।
আর এ কারণেই সম্ভবত তাঁর গ্রহণযোগ্যতা কেবল বিএনপির সমর্থকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।
২০১৯ সালে রাজনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ বিপরীত শিবিরের ওবায়দুল কাদের যখন তাঁকে ‘সজ্জন’ এবং ‘মানুষ হিসেবেও ভালো’ বলেছিলেন, সেটি শুধু একজন ব্যক্তির প্রশংসা ছিল না। বাংলাদেশের রাজনীতিতে হারিয়ে যেতে থাকা একটি সংস্কৃতির কথাও যেন সেখানে ছিল: রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে অপছন্দ করা যায়, কিন্তু মানুষ হিসেবে সম্মান করা যায়।
এই সংস্কৃতিটিই আমাদের রাজনীতিতে আরও বেশি দরকার।কারণ গণতন্ত্রের সৌন্দর্য সবাই একই কথা বলবে, এতে নয়।গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হলো, প্রবল দ্বিমতের পরও মানুষ পরস্পরের সঙ্গে কথা বলতে পারবে।
একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি
রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্তের পর মির্জা ফখরুল দলের মহাসচিব ও স্থায়ী কমিটির সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেছেন।
এই বিদায় কেবল একটি পদ ছেড়ে দেওয়া নয়।প্রায় দেড় দশক ধরে বিএনপির মহাসচিব ও ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে যিনি দলের মুখ হয়ে ছিলেন, তাঁর জন্য এটি জীবনের একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি।
আজ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দিতে এসে তিনিও বলেছেন, অনেক কিছু তিনি ‘মিস’ করবেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার সহকর্মী, দলীয় কর্মকাণ্ড এবং পরিচিত রাজনৈতিক জীবন থেকে সরে যাওয়ার মধ্যে যে ব্যক্তিগত আবেগ আছে, সেটি তাঁর কথায়ও ফুটে উঠেছে।
এটা রাজনীতির মানবিক দিক।আমরা সাধারণত রাজনীতিবিদকে দেখি মঞ্চে,মাইক্রোফোনের সামনে,সংসদে,মিছিলে।কিন্তু প্রতিটি রাজনৈতিক পদের পেছনে একজন মানুষও থাকেন। দীর্ঘ কয়েক দশকের অভ্যাস, সহকর্মী, সংগ্রাম, ব্যর্থতা ও সাফল্য একদিনে পেছনে ফেলে যাওয়া সহজ নয়।
বঙ্গভবনের পথে
২০ আগস্ট ২০২৬, বাংলাদেশের রাজনীতিতে আরেকটি ব্যতিক্রমী দিন।
প্রায় ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি পদে অনুষ্ঠিত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২৫৫ ভোট পেয়ে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ১১ দলীয় বিরোধী জোটের প্রার্থী অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন আনুষ্ঠানিকভাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে বিজয়ী ঘোষণা করেন।
নিজের ভোট দেওয়ার পর তিনি একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও কল্যাণমুখী বাংলাদেশ দেখার আকাঙ্ক্ষার কথা বলেছেন।
এই মুহূর্তে এখানেই তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
দলের মহাসচিব থাকা অবস্থায় তাঁর কাজ ছিল নিজের দলের পক্ষে কথা বলা।
রাষ্ট্রপতির আসনে তাঁর দায়িত্বটি এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন।
সেখানে তিনি আর বিএনপির ফখরুল নন।
তাঁকে হতে হবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি।
যে নাগরিক বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন, তাঁরও রাষ্ট্রপতি।
যিনি বিরোধী দলকে ভোট দিয়েছেন, তাঁরও রাষ্ট্রপতি।
যিনি কোনো দলকেই সমর্থন করেন না, তাঁরও রাষ্ট্রপতি।
সংখ্যাগরিষ্ঠের যেমন, সংখ্যালঘুরও।
এই রূপান্তরটি শুধু সাংবিধানিক নয়; মানসিকও।
বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা সীমিত হলেও পদটির রাজনৈতিক ও প্রতীকী গুরুত্ব উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বিশেষ করে গভীর রাজনৈতিক মেরুকরণের একটি দেশে রাষ্ট্রপতির নিরপেক্ষতা, সাংবিধানিক সংযম এবং সংকটের মুহূর্তে তাঁর অবস্থান প্রতিষ্ঠানটির প্রতি জনগণের আস্থা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ফলে মির্জা ফখরুলের সামনে প্রশ্নটি এখন আর শুধু তিনি রাষ্ট্রপতি হবেন কি না, সেটি নয়; বরং দীর্ঘ দলীয় পরিচয়ের পর তিনি কতটা বিশ্বাসযোগ্যভাবে রাষ্ট্রের নিরপেক্ষ প্রতিনিধিতে রূপান্তরিত হতে পারবেন।
দলীয় রাজনীতির দীর্ঘ অভিজ্ঞতা পেছনে রেখে রাষ্ট্রের অভিভাবকসুলভ একটি অবস্থানে নিজেকে স্থাপন করাই হবে তাঁর নতুন জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশের রাজনীতির জন্যও একটি সুযোগ
মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়াকে শুধু একজন রাজনীতিকের ব্যক্তিগত অর্জন হিসেবে দেখলে বিষয়টির বড় অংশই বাদ পড়বে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিন ধরে যে পারস্পরিক অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে, সেটি রাতারাতি দূর হবে না।
বাংলাদেশের রাজনীতির একটি দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা হলো, ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটলেও রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন সব সময় একই গতিতে ঘটে না। সরকার বদলানো তুলনামূলক সহজ; কিন্তু প্রতিপক্ষকে বৈধ রাজনৈতিক অংশীদার হিসেবে স্বীকার করা, প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাবের ঊর্ধ্বে রাখা এবং ভিন্নমতের জন্য নিরাপদ পরিসর তৈরি করা অনেক কঠিন। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সাফল্য তাই শুধু কে ক্ষমতায় গেলেন, তা দিয়ে নয়; ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহৃত হলো, সেটি দিয়েও বিচার করতে হবে।
কিন্তু রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিরা চাইলে অন্তত রাজনৈতিক আচরণের একটি নতুন মানদণ্ড তৈরি করতে পারেন।
রাষ্ট্রপতি সব সমস্যার সমাধান করবেন না।
বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থায় তাঁর ক্ষমতার সাংবিধানিক সীমাও রয়েছে।
কিন্তু একটি রাষ্ট্রে কিছু পদ শুধু ক্ষমতার কারণে গুরুত্বপূর্ণ নয়; নৈতিক কর্তৃত্বের কারণেও গুরুত্বপূর্ণ।
বঙ্গভবনের দরজা যদি শুধু ক্ষমতাসীনদের জন্য নয়, বিরোধী দল, নাগরিক সমাজ, তরুণ প্রজন্ম এবং ভিন্নমতের মানুষের জন্যও সমানভাবে খোলা থাকে, তাহলে রাষ্ট্রপতির প্রতিষ্ঠানটি রাজনৈতিক বিভাজনের মাঝেও সংলাপের একটি জায়গা হয়ে উঠতে পারে।
আর সম্ভবত একজন শিক্ষক থেকে উঠে আসা রাজনীতিকের জন্য এর চেয়ে সুন্দর উত্তরাধিকার আর কী হতে পারে?
শিক্ষকের কাজ শুধু কথা বলা নয়, শোনা।শুধু নির্দেশ দেওয়া নয়, বোঝানো।শুধু নিজের মত প্রতিষ্ঠা করা নয়, ভিন্ন চিন্তার মানুষকেও জায়গা দেওয়া।
মির্জা ফখরুল যখন বঙ্গভবনে প্রবেশ করছেন, তাঁর পুরোনো শিক্ষকসত্তার এই গুণগুলোই হয়তো তাঁর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সম্পদ হয়ে উঠতে পারে।
শেষ কথা
রাজনীতিবিদদের মূল্যায়ন শুধু তাঁরা কত দিন ক্ষমতায় ছিলেন, কত বড় পদে ছিলেন কিংবা কত বড় জনসভা করেছেন, তা দিয়ে হয় না।
সময় শেষ পর্যন্ত আরও কঠিন কিছু প্রশ্ন করে।
তিনি সংকটে কী করেছিলেন?
প্রতিপক্ষের সঙ্গে কেমন আচরণ করেছিলেন?
ক্ষমতা তাঁকে কতটা বদলেছিল?
আর চলে যাওয়ার সময় মানুষ তাঁকে কীভাবে মনে রেখেছে?
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক জীবনের চূড়ান্ত মূল্যায়ন করার সময় এখনো আসেনি। তাঁর সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক অবস্থান ও নেতৃত্ব নিয়ে ইতিহাস নিশ্চয়ই নিজের বিচার করবে।
কিন্তু শিক্ষকতার শ্রেণিকক্ষ থেকে পৌরসভা, সেখান থেকে সংসদ ও মন্ত্রিসভা, তারপর একটি বড় রাজনৈতিক দলের দীর্ঘ দুঃসময়ের নেতৃত্ব পেরিয়ে বঙ্গভবনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানো নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের রাজনীতির একটি উল্লেখযোগ্য জীবনযাত্রা।
আমার কাছে তাঁর এই যাত্রার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা অন্য জায়গায়।
রাজনীতিতে দৃঢ় হতে হলে অমার্জিত হতে হয় না।
প্রতিপক্ষের বিরোধিতা করতে হলে তাঁকে অসম্মান করতে হয় না।
আর উচ্চকণ্ঠই সব সময় শক্তিশালী নেতৃত্বের পরিচয় নয়। কখনো কখনো সংযমও শক্তি।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে যদি এই সংস্কৃতি আরও বিস্তৃত হয়, তাহলে লাভ মির্জা ফখরুলের নয়, বিএনপিরও নয়।
লাভ হবে বাংলাদেশের।
একজন সাবেক শিক্ষক শেষ পর্যন্ত বঙ্গভবনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছেন। এখন তাঁর সামনে ইতিহাসের দেওয়া সবচেয়ে বড় সুযোগটিও সম্ভবত এটিই: দলের দীর্ঘদিনের মহাসচিব হিসেবে নয়, দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা।
আর একজন রাজনীতিকের দীর্ঘ পথচলার জন্য এর চেয়ে মর্যাদাপূর্ণ সমাপ্তি খুব কমই হতে পারে।