যুক্তরাজ্য

MSE
২৪ আগস্ট ২০২৬, ১৮:০৮
আরও খবর

বাড়ি কিনতে গিয়ে জানলেন নিজের নামেই ১,৪২৫ পাউন্ডের ঋণ; পরিচয় চুরি করে আপনার নামেও ঋণ নিতে পারে প্রতারকরা!

16473_shutterstock_2213284223 Large.jpg

 

পরিচয় চুরি করে প্রতারণার শিকার হলে মুহূর্তেই বদলে যেতে পারে একজন মানুষের আর্থিক পরিস্থিতি। যুক্তরাজ্যের হ্যাম্পশায়ারের ২৪ বছর বয়সী গ্রেসের ঘটনাটি তারই একটি উদাহরণ। নিজের নামে নেওয়া একটি মোবাইল ফোনের অ্যাকাউন্ট সম্পর্কে কিছুই না জানলেও শেষ পর্যন্ত সেই অ্যাকাউন্টের ১ হাজার ৪২৪ পাউন্ড ৯৫ পেনির ঋণের দায় এসে পড়ে তার ওপর।

গ্রেস স্বনিযুক্ত কর্মী এবং কয়েক বছর আগে বাবা-মায়ের বাড়ি থেকে অন্যত্র চলে যান। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে তার পুরোনো ঠিকানায় একটি ঋণ আদায়কারী সংস্থা ওভারডেলসের চিঠি আসে। চিঠিতে জানানো হয়, আইডি মোবাইলের একটি অ্যাকাউন্টের বিপরীতে তার ১ হাজার ৪২৪ পাউন্ড ৯৫ পেনি বকেয়া রয়েছে।

চিঠি হাতে পাওয়ার পরই গ্রেস বুঝতে পারেন বিষয়টি স্বাভাবিক নয়। কারণ আইডি মোবাইলের সঙ্গে তার কখনো কোনো লেনদেনই হয়নি। তিনি দ্রুত ওভারডেলসের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাকে আইডি মোবাইলের সঙ্গে কথা বলতে বলা হয়। কিন্তু আইডি মোবাইলে ফোন করে সমস্যার কথা জানাতে গিয়ে তিনি আরও সমস্যায় পড়েন। তাকে একটি আইডি মোবাইল নম্বর দিতে বলা হয়, অথচ সেই অ্যাকাউন্টের কোনো নম্বরই তার কাছে ছিল না।

গ্রেসের ভাষায়, তিনি যেন বারবার একই জায়গায় ঘুরপাক খাচ্ছিলেন। বিষয়টি তার জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত ৮ মে আইডি মোবাইলের ইনস্টাগ্রাম পেজে বার্তা পাঠিয়ে তিনি প্রতারণার অভিযোগ জানান। কিন্তু এক মাসেরও বেশি সময় পরও তিনি বিষয়টির অগ্রগতি জানতে যোগাযোগ করে যাচ্ছিলেন। এর মধ্যেই ওই ভুয়া ঋণের তথ্য তার ক্রেডিট রিপোর্টে যুক্ত হয়ে যায়।

গ্রেস জানান, তিনি নিজের আর্থিক পরিস্থিতি ঠিক করার জন্য অনেক পরিশ্রম করছিলেন, কারণ তার বাড়ি কেনার পরিকল্পনা ছিল। এমন পরিস্থিতিতে হঠাৎ করে নিজের নামে একটি ভুয়া ঋণ দেখতে পাওয়া তাকে বড় ধরনের সমস্যায় ফেলে দেয়। তার প্রশ্ন ছিল, কীভাবে পর্যাপ্ত যাচাই ছাড়াই তার নামে এমন একটি অ্যাকাউন্ট খোলা হলো এবং কেন ঋণ আদায়কারী সংস্থা যোগাযোগ করার আগে তিনি বিষয়টি জানতে পারলেন না।

পরে আইডি মোবাইল গ্রেসের অভিযোগ তদন্ত করে অ্যাকাউন্টটি যে প্রতারণার মাধ্যমে খোলা হয়েছিল তা নিশ্চিত করে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত তদন্ত করে তিন দিনের মধ্যেই অ্যাকাউন্টটিকে জাল বা প্রতারণামূলক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এরপর ওভারডেলস তাদের ঋণ আদায়ের কার্যক্রম বন্ধ করে এবং জুন মাসে গ্রেসের ক্রেডিট রিপোর্ট থেকে নেতিবাচক তথ্যটি সরিয়ে দেওয়া হয়।

আইডি মোবাইল আরও স্বীকার করেছে যে শুরুতে গ্রেসকে ভুল ফোন নম্বরে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, বিষয়টি অভ্যন্তরীণভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। প্রতারণা সংক্রান্ত অভিযোগের জন্য তাদের আলাদা হটলাইনও রয়েছে, যেখানে মোবাইল নম্বর দেওয়ার প্রয়োজন নেই।

সিটি অব লন্ডন পুলিশের পরিচালিত প্রতারণা শনাক্ত ও রিপোর্ট করার সেবা ‘রিপোর্ট ফ্রড’-এর মতে, গ্রেস সম্ভবত পরিচয় চুরির শিকার হয়েছেন। এ ধরনের প্রতারণায় অপরাধীরা অন্যের নাম, জন্মতারিখ, ঠিকানার ইতিহাসসহ ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে সেই পরিচয় ব্যবহার করে পণ্য বা সেবা নেয় কিংবা বিভিন্ন ধরনের আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করে।

আইডি মোবাইল জানিয়েছে, তাদের নিয়ম অনুযায়ী অর্ডার দেওয়া বা সংগ্রহের সময় সাধারণভাবে ছবিযুক্ত পরিচয়পত্র দেখানো বাধ্যতামূলক নয়। আবেদনকারীর ঠিকানার সঙ্গে মিল থাকা ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে অর্ডার যাচাই করা হয়। তবে কোনো বিষয়ে সন্দেহ তৈরি হলে অতিরিক্ত পরিচয়পত্র চাওয়া হতে পারে।

গ্রেসের ক্ষেত্রে যে কার্ড ব্যবহার করা হয়েছিল, সেটি আবেদনকারীর দেওয়া ঠিকানার সঙ্গে মিলে যাওয়ায় আইডি মোবাইলের সিস্টেমে অতিরিক্ত যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়নি বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

ঠিক কীভাবে প্রতারকরা গ্রেসের তথ্য ব্যবহার করেছিল তা স্পষ্ট নয়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধীরা প্রথমে তার নামে কোনো ব্যাংক বা ক্রেডিট কার্ড সংগ্রহ করে সেটি ব্যবহার করতে পারে। আবার কোনো তথ্য ফাঁসের মাধ্যমে তার আসল কার্ডের তথ্য হাতিয়ে নেওয়া কিংবা ফিশিংয়ের মাধ্যমে তাকে প্রতারিত করে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করেও এই ধরনের প্রতারণা করা সম্ভব।

পরিচয় চুরি থেকে নিজেকে রক্ষা করতে বিশেষজ্ঞরা ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহারে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন। গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ফেলে দেওয়ার আগে সেগুলো এমনভাবে নষ্ট করা উচিত, যাতে নাম, ঠিকানা বা আর্থিক তথ্য কেউ পড়তে না পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অতিরিক্ত ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ না করাই নিরাপদ, কারণ অপরাধীরা এসব তথ্য ব্যবহার করে আরও বিশ্বাসযোগ্যভাবে প্রতারণার চেষ্টা করতে পারে।

অপরিচিত কেউ ফোন করে ব্যাংক, বিল্ডিং সোসাইটি বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিচয় দিলেও কখনো পাসওয়ার্ড, লগইন তথ্য, অ্যাকাউন্ট নম্বর বা গোপন নিরাপত্তা তথ্য দেওয়া উচিত নয়। ব্যাংক কখনো গ্রাহকের পিন বা সম্পূর্ণ পাসওয়ার্ড জানতে চাইবে না। কোনো ফোনকল নিয়ে সন্দেহ হলে কথোপকথন বন্ধ করে নিজে থেকে ব্যাংকের নির্ভরযোগ্য নম্বরে যোগাযোগ করা উচিত।

নিজের ব্যাংক স্টেটমেন্ট নিয়মিত পরীক্ষা করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অচেনা কোনো লেনদেন দেখা গেলে দ্রুত ব্যাংককে জানাতে হবে। একইভাবে, নিয়মিত নিজের ক্রেডিট রিপোর্ট পরীক্ষা করলে নিজের নামে কেউ ভুয়া ঋণ বা ক্রেডিটের আবেদন করেছে কি না তা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব।

বিশেষ করে বাড়ি পরিবর্তনের পর কয়েক মাস নিজের ক্রেডিট রিপোর্টের ওপর নজর রাখা গুরুত্বপূর্ণ। ‘রিপোর্ট ফ্রড’-এর পরামর্শ অনুযায়ী, নতুন ঠিকানায় যাওয়ার দুই থেকে তিন মাস পর ক্রেডিট ফাইল পরীক্ষা করা ভালো। পাশাপাশি পুরোনো ঠিকানায় আসা গুরুত্বপূর্ণ চিঠিপত্র যাতে অপরাধীদের হাতে না যায়, সে জন্য ডাক পুনর্নির্দেশের ব্যবস্থাও করা যেতে পারে।

গ্রেসের ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, পরিচয় চুরি শুধু অর্থের ক্ষতিই করে না; এটি একজন মানুষের ক্রেডিট স্কোর, ভবিষ্যৎ ঋণ নেওয়া এবং এমনকি বাড়ি কেনার পরিকল্পনাতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। তাই নিজের ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য সুরক্ষিত রাখার পাশাপাশি নিয়মিত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও ক্রেডিট রিপোর্ট পরীক্ষা করাই হতে পারে এ ধরনের প্রতারণা দ্রুত শনাক্ত করার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

 

সর্বাধিক পঠিত


আরও খবর
ভিডিও