যুক্তরাজ্য

Mirror
১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০৯
আরও খবর

NHS-এর ভুলে অপ্রয়োজনে স্তন হারালেন ২০ নারী; ক্ষতিগ্রস্ত আরও শত শত!

16669_2.jpg

যুক্তরাজ্যের একটি এনএইচএস ট্রাস্টে স্তন ক্যানসারের চিকিৎসায় গুরুতর অনিয়মের কারণে অন্তত ২০ নারীর অপ্রয়োজনীয়ভাবে পুরো স্তন অপসারণ বা মাস্টেকটমি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। একই ঘটনায় এখন পর্যন্ত পর্যালোচনা করা ৫১৪টি কেসের মধ্যে ৩১৫ জন রোগী ক্ষতির শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৭৭ জন গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং অন্তত একজন রোগীর মৃত্যুর ঘটনাও শনাক্ত হয়েছে।

কাউন্টি ডারহাম অ্যান্ড ডার্লিংটন ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের অধীনে ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চিকিৎসা নেওয়া ১ হাজার ৪৭২ জন স্তন ক্যানসার রোগীর চিকিৎসা পর্যালোচনার আওতায় আনা হয়েছে। তবে এই অনিয়ম আরও বিস্তৃত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ট্রাস্টটি ২০১৫ সাল থেকে করা স্তন ক্যানসারের সব অস্ত্রোপচার পর্যালোচনার বিষয়টিও বিবেচনা করছে। এতে প্রায় ৫ হাজার ৩৯০টি অস্ত্রোপচার খতিয়ে দেখা হতে পারে।

ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের একজন ৫১ বছর বয়সী ডেনিস হাওয়ার্থ। ২০২৩ সালে স্তনে একটি গাঁট শনাক্ত হওয়ার পর তার ধীরগতির ক্যানসার ধরা পড়ে। প্রথমে তার লাম্পেকটমি করা হয়। পরে তার পুরো স্তন অপসারণ করা হয়। এর পাশাপাশি তাকে কেমোথেরাপির আটটি সেশন ও রেডিওথেরাপি দেওয়া হয়।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে এনএইচএস থেকে ডেনিস জানতে পারেন, পুরো স্তন অপসারণের পরিবর্তে তার ক্ষেত্রে দ্বিতীয়বার লাম্পেকটমি করার সুযোগ ছিল। কিন্তু অস্ত্রোপচারের আগে তাকে সেই বিকল্পের কথা জানানো হয়নি।

ডেনিস বলেন, বাড়িতে ফোন করে তাকে জানানো হয় যে তার স্তন অপসারণের প্রয়োজন ছিল না। খবরটি শুনে তিনি ভেঙে পড়েন এবং ফোনেই কাঁদতে শুরু করেন। তার ভাষায়, শুধু ক্ষমা চাওয়া যথেষ্ট নয়; এই ঘটনার কারণে তার আত্মবিশ্বাস ও জীবনযাত্রায় স্থায়ী প্রভাব পড়েছে।

ডেনিসের অস্ত্রোপচার করা হয়েছিল ক্যাথেড্রাল সার্জিক্যাল সার্ভিসেস নামের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে। ট্রাস্টটি স্তন ক্যানসারের কিছু অস্ত্রোপচার বেসরকারি ক্লিনিকে ‘প্রতি রোগী অনুযায়ী অর্থ প্রদান’ পদ্ধতিতে করাত। বিষয়টি নিয়ে করা একটি স্বাধীন পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, এই ব্যবস্থায় বেশি সংখ্যক রোগীর অস্ত্রোপচার করার সঙ্গে সরাসরি আর্থিক প্রণোদনার সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল।

ওই সময় ট্রাস্টের স্তন সার্জারি বিভাগের ক্লিনিক্যাল লিড আমির ভাট্টি একইসঙ্গে ওই বেসরকারি ক্লিনিকের পরিচালকও ছিলেন। ট্রাস্টের জন্য ক্লিনিকটিতে শনিবারেও অস্ত্রোপচার করা হতো। গত বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে ভাট্টিকে ট্রাস্টের হয়ে স্তন ক্যানসারের অস্ত্রোপচার করা থেকে বিরত রাখা হয়েছে।

ট্রাস্টের নতুন প্রধান নির্বাহী স্টিভ রাসেল জানিয়েছেন, এনএইচএসে প্রতি রোগী বা সেবার ভিত্তিতে অর্থ প্রদান করা অস্বাভাবিক নয়। তবে স্তন ক্যানসার সেবায় এই ব্যবস্থা তিনি বন্ধ করে দিয়েছেন। তিনি স্বীকার করেছেন, স্বার্থের সংঘাত যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়নি।

স্টিভ রাসেল ক্ষতিগ্রস্ত নারী ও তাদের পরিবারের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে বলেছেন, এই ঘটনায় যে ক্ষতি হয়েছে তা অত্যন্ত গভীর এবং অগ্রহণযোগ্য। তার দাবি, ট্রাস্টের স্তন ক্যানসার সেবায় ইতোমধ্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে এবং রোগীদের জন্য সেবার মান উন্নত হচ্ছে।

আরেক ভুক্তভোগী ৪১ বছর বয়সী ক্যাট্রিওনা ডানবার ২০২৩ সালের জুনে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হন। চিকিৎসার বিষয়ে তাকেও পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। ট্রাস্টের কাছ থেকে পাওয়া ক্ষমাপ্রার্থনার চিঠিতে তার অস্ত্রোপচারের আগে যথাযথভাবে সম্মতি না নেওয়া, অস্ত্রোপচারের পর প্রয়োজনীয় ড্রেসিং না দেওয়া এবং ক্যানসার ফিরে এসেছে কি না তা নিশ্চিত করতে পরীক্ষার ফল জানাতে প্রায় তিন মাস সময় নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

ডানবার বলেন, চিঠিতে অনেক ক্ষমা চাওয়া হয়েছে, কিন্তু কী ঘটেছে তার জন্য কেউ দায় নিচ্ছে না। তার মতে, বহু নারী যে ক্ষতির শিকার হয়েছেন, তার জন্য সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন।

ঘটনাটি নিয়ে ডারহাম কনস্ট্যাবুলারিও তদন্ত করছে। কোনো ফৌজদারি অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে ডেনিসসহ কয়েকজন রোগীকে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করেছে।

ডেনিস বর্তমানে ট্রাস্টের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছেন। তিনি জানান, স্তন পুনর্গঠন নিয়েও তিনি চিকিৎসকদের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেছিলেন। কিন্তু পরে তাকে এমন একটি চিঠি দেওয়া হয় যাতে বলা হয় তিনি পুনর্গঠন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ডেনিসের দাবি, তিনি কখনোই স্থায়ীভাবে সেই চিকিৎসা প্রত্যাখ্যান করেননি।

অন্যদিকে, আমির ভাট্টি জানিয়েছেন, ট্রাস্টের চলমান তদন্তে তিনি সহযোগিতা করছেন এবং তদন্ত ও অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়া চলমান থাকায় এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করা তার পক্ষে উপযুক্ত নয়।

এ ঘটনায় শুধু আক্রান্ত নারীদের চিকিৎসা নিয়ে নয়, এনএইচএসের বেসরকারি খাতে চিকিৎসা সেবা আউটসোর্স করার পদ্ধতি নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে রোগীর সংখ্যা অনুযায়ী অর্থ প্রদানের ব্যবস্থায় চিকিৎসার সিদ্ধান্তে আর্থিক স্বার্থ কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ট্রাস্টের আরও হাজার হাজার অস্ত্রোপচার পর্যালোচনার আওতায় এলে ঘটনার প্রকৃত পরিধি আরও স্পষ্ট হতে পারে।

সর্বাধিক পঠিত


আরও খবর
ভিডিও