
লন্ডন: চলতি বছরের শীত মৌসুমে যুক্তরাজ্যে তীব্র ঠান্ডার সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রশান্ত মহাসাগরে তৈরি হওয়া শক্তিশালী ‘এল নিনো’ পরিস্থিতি উত্তর মেরুর ওপর গঠিত মেরু ঘূর্ণাবর্তে প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে শীতের শেষভাগে যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে শৈত্যপ্রবাহের সম্ভাবনা বাড়তে পারে বলে আবহাওয়াবিদরা মনে করছেন। তবে এখনই ব্রিটেনে নিশ্চিতভাবে ‘ডিপ ফ্রিজ’ বা দীর্ঘস্থায়ী তীব্র শীত নামবে, এমন পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছে না।
যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া দপ্তর মেট অফিসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এল নিনো পর্যবেক্ষণভিত্তিক রেকর্ডে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থায় পৌঁছেছে। মধ্য ও পূর্ব নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। মেট অফিসের বিজ্ঞানীরা বলছেন, বছরের শেষদিকে এল নিনো আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং এর প্রভাব বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ায় পড়তে পারে।
এল নিনো হলো নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু পরিস্থিতি। এর প্রভাব প্রশান্ত মহাসাগর থেকে হাজার হাজার মাইল দূরের অঞ্চলগুলোর আবহাওয়ার ওপরও পড়তে পারে। যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে এল নিনোর প্রভাবে শরৎ ও শীতের শুরুর দিকে বৃষ্টিপাত ও ঝড়ের প্রবণতা বাড়ার পাশাপাশি তুলনামূলকভাবে মৃদু আবহাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে শীতের পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।
এর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে উত্তর মেরুর ওপরের বায়ুমণ্ডলে থাকা ‘স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারিক পোলার ভর্টেক্স’ বা মেরু ঘূর্ণাবর্ত। এটি শক্তিশালী পশ্চিমা বায়ুর একটি বলয়, যা আর্কটিক অঞ্চলের অত্যন্ত ঠান্ডা বাতাসকে মেরুর আশপাশে আটকে রাখে। কোনো কারণে এই ঘূর্ণাবর্ত দুর্বল বা ভেঙে গেলে ঠান্ডা মেরু বায়ু দক্ষিণ দিকে নেমে আসার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মহাসাগর ও বায়ুমণ্ডলীয় প্রশাসনের গবেষণা অনুযায়ী, এল নিনোর সময় বায়ুমণ্ডলের বৃহৎ আকারের তরঙ্গ বা ‘প্ল্যানেটারি ওয়েভ’ শক্তিশালী হয়ে স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে পৌঁছাতে পারে। এর ফলে শীতের শেষভাগে মেরু ঘূর্ণাবর্ত দুর্বল হওয়ার এবং ‘সাডেন স্ট্র্যাটোস্ফেরিক ওয়ার্মিং’ বা আকস্মিক স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারিক উষ্ণায়নের ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। এমন পরিস্থিতি ইউরোপ ও এশিয়ার কিছু অঞ্চলে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি ঠান্ডা আবহাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জলবায়ু পূর্বাভাস কেন্দ্রের সেপ্টেম্বরের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের শরৎ ও শীতজুড়ে শক্তিশালী এল নিনো থাকার সম্ভাবনা ৯০ শতাংশের বেশি। তবে এল নিনোর শক্তি একাই যুক্তরাজ্যের নির্দিষ্ট আবহাওয়া নির্ধারণ করে না। শরৎ ও শীতের সময় বায়ুমণ্ডলের অন্যান্য পরিবর্তনও আবহাওয়ার ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।
মেট অফিসও সতর্ক করেছে, ২০২৬-২৭ সালের শীত ঠিক কেমন হবে তা এখনই নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। আবহাওয়ার পূর্বাভাস যত দীর্ঘ সময়ের জন্য করা হয়, অনিশ্চয়তাও তত বাড়ে। তাদের মতে, শীতের শেষভাগে মেরু ঘূর্ণাবর্ত দুর্বল হলে ঠান্ডা আবহাওয়ার সম্ভাবনা বাড়তে পারে, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে যুক্তরাজ্যে নিশ্চিতভাবেই দীর্ঘস্থায়ী তীব্র শৈত্যপ্রবাহ দেখা দেবে।
ফলে আসন্ন শীত নিয়ে ‘ডিপ ফ্রিজ’-এর আশঙ্কা নিয়ে আলোচনা থাকলেও আপাতত এটিকে সম্ভাব্য আবহাওয়া পরিস্থিতি হিসেবেই দেখা হচ্ছে। আগামী কয়েক মাসে এল নিনোর পরিবর্তন, মেরু ঘূর্ণাবর্তের অবস্থান এবং উত্তর আটলান্টিকের বায়ুমণ্ডলীয় পরিস্থিতির ওপর নজর রাখলেই যুক্তরাজ্যের শীতের প্রকৃতি সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়া যাবে।