
ভারতের শীর্ষ ধনকুবের মুকেশ আম্বানির ছেলে অনন্ত আম্বানিকে টেকসই উন্নয়ন বিষয়ে ‘প্রফেসর অব প্র্যাকটিস’ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে যুক্তরাজ্যের নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়। সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা, প্রাণী কল্যাণ ও পরিবেশগত দায়িত্বশীলতায় তাঁর কাজের স্বীকৃতি হিসেবে এই সম্মান দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়। তবে নিয়োগটি ঘিরে পরিবেশকর্মী, শিক্ষাবিদ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু কর্মীর মধ্যে প্রশ্ন ও সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
৩১ বছর বয়সী অনন্ত আম্বানি ভারতের অন্যতম বৃহৎ ব্যবসায়ী গোষ্ঠী রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের নির্বাহী পরিচালক এবং প্রতিষ্ঠানটির পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও সবুজ রূপান্তর কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর বাবা মুকেশ আম্বানি রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান এবং ভারতের অন্যতম ধনী ব্যক্তি।
অনন্ত আম্বানি গুজরাটের জামনগরে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ একর এলাকাজুড়ে ভান্তারা নামে একটি বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও সংরক্ষণকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি আহত, নির্যাতিত ও বিপন্ন প্রাণীদের উদ্ধার, পুনর্বাসন ও সুরক্ষায় কাজ করে। হাতি পুনর্বাসনে কাজের জন্য অনন্ত আম্বানি ভারতের ‘প্রাণী মিত্র’ জাতীয় পুরস্কারও পেয়েছেন বলে বিশ্ববিদ্যালয় জানিয়েছে।
তবে ভান্তারায় প্রাণী সংগ্রহের পদ্ধতি নিয়ে আগে থেকেই প্রশ্ন রয়েছে। ২০২৫ সালে জার্মান সংবাদপত্র সুদডয়চে সাইটুংয়ের এক অনুসন্ধানে দাবি করা হয়, কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো বন্যপ্রাণী বাণিজ্যের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন থাকা দেশ হয়ে কিছু প্রাণী ভান্তারায় পৌঁছেছিল। এতে বিপন্ন প্রাণী অবৈধভাবে পাচারের আশঙ্কা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
তবে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের উদ্যোগে পরিচালিত তদন্তে ভান্তারার পরিচালকদের কোনো অনিয়ম পাওয়া যায়নি। পরবর্তী সময়ে বিপন্ন প্রজাতির আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণকারী জাতিসংঘ-সংশ্লিষ্ট সংস্থা সাইটেসের একটি অনুসন্ধানে ভান্তারায় প্রাণী আমদানিতে ব্যবহৃত কিছু অনুমতিপত্র সম্ভবত জাল হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। ভান্তারা ও আম্বানি পরিবার অবশ্য বন্যপ্রাণী পাচারের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
এই প্রেক্ষাপটেই নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ে অনন্ত আম্বানির নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন শিক্ষাবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ। বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মীদের সংগঠনের স্থানীয় শাখার পক্ষ থেকেও নিয়োগটি নিয়ে আপত্তির কথা জানানো হয়েছে। কেউ কেউ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, সরকারি অর্থায়ন কমে যাওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি ধনী ব্যক্তি ও করপোরেট অর্থের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে একাডেমিক স্বাধীনতা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
তবে নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয় বলেছে, অনন্ত আম্বানিকে দেওয়া ‘প্রফেসর অব প্র্যাকটিস’ পদটি তাঁর সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা, প্রাণী কল্যাণ ও পরিবেশগত দায়িত্বশীলতায় অবদানের স্বীকৃতি। একই সঙ্গে রিলায়েন্স গ্রুপের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও সবুজ অর্থনীতিতে রূপান্তরের ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
ঐতিহাসিক আর্মস্ট্রং ভবনের কিংস হলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁকে এই সম্মান দেওয়া হয়। একই হলেই ১৯৬৭ সালে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রকে সম্মানসূচক ডক্টরেট প্রদান করেছিল নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়। অনুষ্ঠানে অনন্ত আম্বানি বলেন, টেকসই উন্নয়ন ও প্রকৃতি সংরক্ষণকে এমন একটি বৈশ্বিক আন্দোলনে পরিণত করা প্রয়োজন, যা দেশ ও প্রজন্মের সীমা অতিক্রম করবে।
নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ক্রিস ডে বলেন, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় ঠেকানো এবং প্রকৃতির পুনরুদ্ধারে জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন। তাঁর মতে, এ ক্ষেত্রে নেতৃত্ব, উদ্ভাবন ও বিভিন্ন খাতের মধ্যে সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ।