বাংলাদেশ

নারীবান্ধব পুলিশিং জোরদারে নানা উদ্যোগ

16965_IMG_0387.jpeg

নারীবান্ধব পুলিশিং ব্যবস্থা জোরদার করতে বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ পুলিশ। এর মধ্যে রয়েছে- নারী পুলিশ সদস্যের সংখ্যা বৃদ্ধি, নারী, শিশু ও বয়স্কদের জন্য নির্ধারিত সেবা ডেস্কের আধুনিকীকরণ এবং নারী পুলিশ সদস্যদের সন্তানদের জন্য ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপন।

পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক গাজী জসিম উদ্দিন বলেন, ‘লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, অনলাইন সহিংসতা, বিদ্বেষমূলক আচরণ এবং বুলিং বা হেনস্তার বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও কার্যকর ও সংবেদনশীল করে তোলার লক্ষ্যে চলমান পুলিশ সংস্কার কার্যক্রমের অংশ হিসেবেই এই উদ্যোগগুলো নেওয়া হয়েছে।’

তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ এবং জেন্ডার-সংবেদনশীল পুলিশিং সম্প্রসারণে বাংলাদেশ পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে।

বিএনপি সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ১৮০ দিনের কার্যক্রম সংক্রান্ত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, আটটি বিভাগীয় শহরে দায়িত্ব পালনরত নারী পুলিশ সদস্যদের সহায়তায় তাঁদের শিশুদের জন্য ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে ৫-এপিবিএন (আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন)-এর তত্ত্বাবধানে উত্তরায় একটি ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপনের কাজ চলছে।

এ ছাড়া বিশেষ প্রশিক্ষণ ও আধুনিক সরঞ্জাম ব্যবহারের মাধ্যমে ৬৪টি জেলার সদর থানার নারী, শিশু ও বয়স্কদের জন্য নির্ধারিত সেবা ডেস্কগুলোকে ‘মডেল’ সেবাকেন্দ্রে রূপান্তরের উদ্যোগও নিয়েছে পুলিশ।

প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন রেঞ্জ ও মেট্রোপলিটন ইউনিটে ইতোমধ্যে পর্যাপ্ত সংখ্যক নারী পুলিশ কর্মকর্তা মোতায়েন করা হয়েছে এবং প্রতিটি ইউনিটের চাহিদা অনুযায়ী আরও মোতায়েন কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

ইউএনএফপিএ’র অর্থায়নে পরিচালিত ‘প্রিভেনশন অ্যান্ড রেসপন্স ফর জেন্ডার বেসড ভায়োলেন্স এগেইনস্ট উইমেন অ্যান্ড গার্লস (প্রিভিল)’ প্রকল্পের আওতায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ, কক্সবাজার, বান্দরবান, নোয়াখালী, পটুয়াখালী, বরগুনা, জামালপুর, গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ ও বাগেরহাটসহ ১০টি জেলার ৯২টি থানায় নারী ও শিশু হেল্প ডেস্ক স্থাপন করা হয়েছে।

প্রকল্পটির আওতায় সংশ্লিষ্ট থানাগুলোতে নারী, শিশু ও প্রবীণদের অধিকার এবং আইনি সহায়তা বিষয়ে প্রাথমিক সচেতনতা ও প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে। অবশিষ্ট ৫৪টি জেলা সদর থানার নারী, শিশু ও প্রবীণ সেবা ডেস্কে প্রশিক্ষণ ও আধুনিক সরঞ্জাম সরবরাহ করে সেগুলোকে মডেল সেবা কেন্দ্রে রূপান্তরের জন্য কর্তৃপক্ষ একটি নতুন প্রকল্পের প্রস্তাব দিয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশে নারী সদস্যের সংখ্যা ১৭ হাজার ৯৭০ জন যা বাহিনীর মোট সদস্যের ৯ দশমিক ০৭ শতাংশ। পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক পদমর্যাদার সমপর্যায়ের পদসহ বিভিন্ন পদে নারীরা দায়িত্ব পালন করছেন।

অতিরিক্ত আইজিপি বলেন, কঠোর পরিশ্রম, নিষ্ঠা, পেশাদারিত্ব ও দক্ষতার মাধ্যমে নারী পুলিশ সদস্যরা প্রতিটি স্তরে নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘কনস্টেবল থেকে অতিরিক্ত আইজি পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে নারী সদস্যরা তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সফলভাবে পালন করেছেন। এটি অত্যন্ত ইতিবাচক একটি অগ্রগতি। কর্মদক্ষতার দিক থেকে তারা কোনোভাবেই পিছিয়ে নেই।’

তিনি আরও বলেন, বিশেষ করে পোশাক খাতে, যেখানে অধিকাংশ শ্রমিকই নারী, সেখানে শ্রমিক অসন্তোষ মোকাবিলায় নারী পুলিশ সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।


তিনি আরও বলেন, ‘শিল্প খাতে নারী পুলিশ সদস্যদের অবদান ছাড়া শ্রমিক অসন্তোষ কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা কঠিন হতো।’


মেট্রোপলিটন পুলিশ ইউনিটে কর্মরত এক নারী উপ-পরিদর্শক (এসআই) বলেন, নারী কর্মকর্তারা বড় ধরনের অপারেশনাল দায়িত্ব পালনে সক্ষম। তবে তাদের দায়িত্বের পাশাপাশি গোয়েন্দা কার্যক্রম, অপরাধ তদন্ত ও অপারেশনাল নেতৃত্বের সুযোগ আরও বাড়ানো প্রয়োজন।

বাংলাদেশ পুলিশে ১৯৭৪ সালে প্রথম নারী সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর ধীরে ধীরে নারীরা মূলত সীমিত ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে বেরিয়ে পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। বর্তমানে কনস্টেবল, এএসআই, এসআই, পরিদর্শক, এএসপি, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, পুলিশ সুপার, ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি এবং অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক সমপর্যায়ের পদেও নারীরা দায়িত্ব পালন করছেন।

বর্তমানে মেট্রোপলিটন ও জেলা পুলিশ ইউনিট, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন, স্পেশাল ব্রাঞ্চ, সিআইডি, পিবিআই, ট্যুরিস্ট পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ, রিভার পুলিশ, পুলিশ সদর দপ্তর এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে নারী পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন।

নারী পুলিশ সদস্যদের পেশাগত উন্নয়নে কাজ করার লক্ষ্যে ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ পুলিশ উইমেন নেটওয়ার্ক (বিপিডব্লিউএন) একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে।

বিপিডব্লিউএন’র ২০২৪-২০২৭ মেয়াদের কৌশলগত পরিকল্পনায় পুলিশে নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো, নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, পেশাগত ও তদন্ত দক্ষতা উন্নয়ন, নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এবং জেন্ডার-সংবেদনশীল পুলিশিং জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ পুলিশ ২০২৭ সাল পর্যন্ত বিপিডব্লিউএন’র এই কৌশলগত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পাশাপাশি কেবল নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধিই নয়, বরং পুরো বাহিনীতে তাদের নেতৃত্ব, তদন্ত ও কার্যক্রম-পরিচালনা সংক্রান্ত ভূমিকার পরিধি সম্প্রসারণের ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। সূত্র: বাসস

সর্বাধিক পঠিত


ভিডিও