
ফিলিস্তিন ইস্যুতে আগে কখনো রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না, এমন বহু ব্রিটিশ নাগরিকও এখন গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ ও ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি প্রকাশের আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন। কেউ রাস্তায় নেমেছেন, কেউ সংসদ সদস্যদের চিঠি লিখেছেন, আবার কেউ ফিলিস্তিনি সহায়তা কার্যক্রমে অর্থ সংগ্রহ করেছেন। এর জেরে কেউ কেউ গ্রেপ্তার ও আইনি জটিলতার মুখেও পড়েছেন।
আর সংখ্যাটি দিন দিন বাড়ছে। আলজাজিরার বুধবারের বিশদ এক প্রতিবেদনে এ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্কটল্যান্ডের এডিনবরার কাছাকাছি গ্রামাঞ্চলে বসবাসকারী ৫২ বছর বয়সী ক্লেয়ার ফিলিস্তিনপন্থি আন্দোলনকারীদের একজন। পেশায় প্রশাসনিক কর্মী ক্লেয়ার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেন না। কুকুর, বই পড়া ও রান্নাবান্না নিয়েই ছিল তাঁর শান্ত জীবন। তিন বছর আগেও নিজেকে রাজনৈতিক মানুষ হিসেবে ভাবতেন না তিনি।
এখন ফিলিস্তিনপন্থি সংগঠন ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’-এর প্রতি সমর্থন দেখানোর অভিযোগে তাঁর সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। বিস্তারিত পরিচয় প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে আলজাজিরাকে ক্লেয়ার বলেন, এর আগে কখনো কোনো আইনি ঝামেলায় পড়েননি তিনি। তবে আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়ানোরও ইচ্ছা নেই।
ফিলিস্তিন ইস্যুতে ক্লেয়ারের আগ্রহের শুরু ২০২৩ সালের গ্রীষ্মে। সে সময় তিনি গাজার ফিলিস্তিনি চিকিৎসক ইজ্জেলদিন আবুয়াইশের লেখা ‘আই শ্যাল নট হেট’ বইটি পড়েন। ২০০৯ সালে ইসরায়েলি ট্যাংকের গোলাবর্ষণে তার তিন মেয়ে নিহত হওয়ার ঘটনা বইটিতে উঠে এসেছে।
বইটি পড়ার পর ৭ অক্টোবরের হামলা ও তার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ তিনি অনলাইনে অনুসরণ করতে থাকেন। ক্লেয়ারের ভাষায়, শুরুতে ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকারের পক্ষে যে বক্তব্য দেওয়া হচ্ছিল, সেখান থেকে দ্রুতই তার দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসে।
২০২৩ সালের আর্মিস্টিস ডেতে তিনি প্রথমবার ফিলিস্তিনপন্থি বিক্ষোভে অংশ নেন। সেখানে যুদ্ধবিরতির দাবি জানানো হয়। ওই সময়কার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুয়েলা ব্রেভারম্যান এসব বিক্ষোভকে ‘বিদ্বেষের মিছিল’ হিসেবে আখ্যায়িত করায় ক্ষুব্ধ হন ক্লেয়ার।
এরপর তিনি নিয়মিত বিক্ষোভে অংশ নিতে থাকেন। সংসদ সদস্যদের কাছে চিঠি লেখার পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের সহায়তায় বিভিন্ন তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগেও যুক্ত হন।
২০২৫ সালের আগস্টে ‘ডিফেন্ড আওয়ার জুরিস’ নামের একটি সংগঠনের সঙ্গে প্রকাশ্যে প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের ওপর নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু করেন তিনি। সংগঠনটি নাগরিক অবাধ্যতার মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছে। ২০২৫ সালে সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করার পর থেকে প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের প্রতি সমর্থন জানানোর অভিযোগে তিন হাজারের বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চলতি বছরের শুরুতে সন্ত্রাসবাদ আইনের দুটি ধারায় ক্লেয়ারকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তার বিরুদ্ধে নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্য হওয়া এবং অন্যদের ওই সংগঠনে যোগ দিতে উৎসাহিত করার অভিযোগ আনা হয়েছে।
ক্লেয়ারের মতো একইভাবে ফিলিস্তিন আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন ৭০ বছর বয়সী মারজিও। কোলচেস্টারে বসবাসকারী মারজি বলেন, ২০২৩ সালের আর্মিস্টিস ডের আগে জীবনে কখনো কোনো বিক্ষোভে অংশ নেননি তিনি। ওই দিন হাতে ‘এখনই যুদ্ধবিরতি’ লেখা প্ল্যাকার্ড নিয়ে মিছিলে অংশ নেন।
বিক্ষোভকে ‘বিদ্বেষের মিছিল’ বলা নিয়ে তারও আপত্তি ছিল। মারজির বাবা ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। তার শ্বশুর ছিলেন রয়্যাল এয়ার ফোর্সের সদস্য এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের হাতে যুদ্ধবন্দী হয়েছিলেন।
মারজির ভাষায়, তাদের বাবা-মায়ের প্রজন্ম ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল। এখন ব্রিটেনই ব্রিটিশ আইন ভঙ্গ করছে বলে তিনি মনে করেন।
আর্থিক খাতে দীর্ঘদিন কাজ করা মারজি ও তার স্বামী এখন অবসরপ্রাপ্ত। গত জুলাইয়ে ওয়েস্টমিনস্টারে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের প্রতি সমর্থনের অভিযোগে সন্ত্রাসবাদ আইনের একটি ধারায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হবে কি না, সে সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন তারা।
এই পরিস্থিতি তাদের পারিবারিক জীবনেও উদ্বেগ তৈরি করেছে। মারজি বলেন, পুলিশ যেকোনো সময় বাড়িতে এসে গ্রেপ্তার করতে পারে, এমন পরিস্থিতিতে নাতি-নাতনিদের তাদের সঙ্গে রাখা নিরাপদ কি না, সেটিও ভাবতে হচ্ছে।
তবে সন্তানরা তাদের সিদ্ধান্তের প্রতি সমর্থন জানাচ্ছেন বলেও জানান তিনি। তার ধারণা, ভয় থাকলেও সন্তানরা তাদের নিয়ে গর্বিত।
ব্রিটেনের বিভিন্ন পেশাজীবী গোষ্ঠীতেও গত তিন বছরে ফিলিস্তিনপন্থী সংগঠন ও উদ্যোগের বিস্তার ঘটেছে। শিল্পী, শ্রমিক, রেলকর্মী, আর্থিক খাতের কর্মী থেকে শুরু করে প্রশাসনিক পেশাজীবীদের অনেকেই ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি প্রকাশের আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন।
গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে গণহত্যা হিসেবে আখ্যায়িত করে এর প্রতিবাদে ব্রিটেনে লাখো মানুষ রাস্তায় নেমেছেন। একই সঙ্গে গাজা যুদ্ধ এবং পশ্চিম তীরে সহিংসতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলের কাছে ব্রিটিশ অস্ত্র বিক্রি বন্ধ, কূটনৈতিক সম্পর্ক সীমিত করা এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করারও দাবি জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
ফলে গাজা যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতেই নয়, ব্রিটেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও নাগরিক আন্দোলনেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। আগে রাজনীতির বাইরে থাকা বহু মানুষ এখন ফিলিস্তিন প্রশ্নে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। আর তাদের কেউ কেউ সেই অবস্থানের কারণে পেশাগত, সামাজিক ও আইনি ঝুঁকিও গ্রহণ করছেন।