লন্ডনের মেয়র সাদিক খানের ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছাবার্তা ঘিরে যুক্তরাজ্যে অবস্থিত ইসরাইলি দূতাবাস একটি তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক দীর্ঘ বিবৃতিতে তারা মেয়র খানের বিরুদ্ধে ‘হামাসের প্রচারণা ছড়ানোর’ অভিযোগ তোলে। তবে লন্ডনের মেয়রের দপ্তর তাৎক্ষণিকভাবে এই সমালোচনার কঠোর প্রতিবাদ জানায়।
গত ৩০ মার্চ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিওবার্তায় সাদিক খান মুসলিমদের পবিত্র রমজান মাস শেষে ঈদুল ফিতরের উপলক্ষে সবাইকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানান। একইসাথে তিনি বলেন, ‘অনেকের জন্য এই ঈদের আনন্দ বিষণ্ণতায় আচ্ছন্ন হয়ে যাবে, কারণ সুদান ও ফিলিস্তিনে চলমান ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ও হত্যাযজ্ঞ আমাদের মনে গভীর কষ্ট সৃষ্টি করছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইসরাইলের সামরিক অভিযানের ফলে গাজায় এখন পর্যন্ত পঞ্চাশ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে অন্তত পনেরো হাজার শিশু রয়েছে। অপরদিকে সুদানে চলমান ধ্বংসাত্মক যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং কোটি কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।’
মেয়র খান বলেন, ‘এই মানবতাবিরোধী ঘটনা আমাদের সম্মিলিত বিবেককে নাড়া দেওয়া উচিত। কিন্তু আমি গর্বিত যে, যখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় চোখ বন্ধ করে রেখেছে, তখন লন্ডনবাসীরা নির্যাতিতদের পাশে দাঁড়িয়েছে।’
এই মন্তব্যের কয়েকদিন পর যুক্তরাজ্যে ইসরাইলি দূতাবাস আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করে। তারা এক বিবৃতিতে বলে, ‘এই যুদ্ধ শুরু হয়েছে ২০২৩ সালের সাতই অক্টোবর হামাস নামক একটি নিষিদ্ধ ঘোষিত সন্ত্রাসী সংগঠনের ভয়ঙ্কর ও নৃশংস হামলার মাধ্যমে, যা ইসরাইলের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। অথচ মেয়রের এই বার্তায় হামাসের নাম পর্যন্ত উচ্চারণ করা হয়নি, সন্ত্রাসবাদের নিন্দা করা হয়নি, এমনকি গৃহবন্দি নিরপরাধ ব্যক্তিদের মুক্তির আহ্বানও জানানো হয়নি।’
এই বিবৃতির পর ডানপন্থী ও ইসরাইলপন্থি একাধিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী মেয়রের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাতে শুরু করে।
তবে বৃহস্পতিবার বিকেলে লন্ডনের মেয়রের কার্যালয় এক বিবৃতিতে জানায়, ‘মেয়র বহুবার হামাস কর্তৃক সংঘটিত হামলাগুলোর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি প্রতিটি প্রাণহানিতে শোকাহত এবং একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।’
ইসরাইলি দূতাবাসের দাবি, মেয়র খান যে পরিসংখ্যান তুলে ধরেছেন, তা ‘হামাসের প্রচারণা’’ এবং ‘তথ্যভিত্তিক নয়।’
কিন্তু জাতিসংঘের মতে, গাজা ভূখণ্ডে পরিচালিত ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় প্রদত্ত এই পরিসংখ্যান ‘বিশ্বস্ত ও গ্রহণযোগ্য।’
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বর্তমান ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামিও একই উৎসের তথ্য উদ্ধৃত করে বলেছিলেন, ‘আটাশ হাজারেরও বেশি মানুষ, যার মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য, প্রাণ হারিয়েছেন— যা একেবারেই অমানবিক।’
২০২৪ সালের নভেম্বরে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কার্যালয় জানায়, গাজায় ইসরাইলি সেনাবাহিনীর হাতে নিহতদের মধ্যে প্রায় সত্তর শতাংশই নারী ও শিশু।
এছাড়াও, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী ‘দ্য ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, গাজায় প্রকৃত প্রাণহানির সংখ্যা ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ঘোষিত সংখ্যার চেয়ে প্রায় চল্লিশ শতাংশ বেশি হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরাইলি দূতাবাসের এই বিলম্বিত ও কটাক্ষপূর্ণ বিবৃতি একটি মানবিক বার্তার প্রতি অসহিষ্ণু মনোভাব এবং বাস্তবতা অস্বীকার করার সামিল। অপরদিকে, মেয়র সাদিক খানের পক্ষ থেকে প্রকাশিত বার্তায় মানবতা, সহানুভূতি ও বিবেকবোধের প্রতিফলন ঘটেছে।