মধ‍্যপ্রাচ্য

মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে পুতিনের জয়

14658_IMG_6431.jpeg

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধে ইরান নাকি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল জয়ী হবে, তা বলার সময় হয়ত এখনো আসেনি। তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় খবর হলো, চলমান সংঘাত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে এক অভাবনীয় জয় এনে দিয়েছে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি রাশিয়াকে এক অপার সুযোগ এনে দিয়েছে। নুয়ে পড়া রুশ অর্থনীতি হঠাৎ চাঙা হয়ে উঠছে। যে ট্রাম্প দুই সপ্তাহ আগেও পুতিনের নাম শুনতে রাজি ছিলেন না, এখন তিনি তার প্রধান প্রতিপক্ষ পুতিনকে ফোন করে বিদ্যমান সংকট কাটিয়ে নতুন সম্পর্ক গড়ার আকুতি জানাচ্ছেন। রাশিয়া থেকে তেল আমদানির ওপর যে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ছিল, তাও আপাতত প্রত্যাহার করা হয়েছে।

চলমান ইরান যুদ্ধে প্রেসিডেন্ট পুতিন কেন সবচেয়ে বড় বিজয়ী তার ব্যাখ্যা দিয়ে দ্য পলিটিকো, বিবিসি, গ্লোবাল টাইমস, এনডিটিভিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরাইলি হামলা জ্বালানি তেলের দাম হঠাৎ বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে ক্রেমলিনের সামরিক অভিযানের তহবিল সংগ্রহের ক্ষমতা আরো শক্তিশালী হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি রাশিয়ার অর্থনীতির জন্য এক অপ্রত্যাশিত সুখবর। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন নতুন বছরে পা দিয়েছিলেন একটি বেদনাদায়ক সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হয়ে। ইউক্রেনে তার বিশেষ সামরিক অভিযান সীমিত করা নতুবা রুশ অর্থনীতির জন্য গুরুতর ক্ষতির ঝুঁকি নেওয়া। কিন্তু প্রায় রাতারাতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পুতিনের হাতে একটি টেকসই সমাধান তুলে দিয়েছেন। ইরানে মার্কিন-ইসরাইলি হামলার ফলে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গেছে, যার অর্থ ক্রেমলিনের রাজস্বের প্রধান উৎস বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রুশ অভিযান চালিয়ে যাওয়া অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন সহজই হবে।

এক সপ্তাহের ব্যবধানে ব্যারেলপ্রতি জ্বালানি তেলের দাম ৬৯ ডলার থেকে বেড়ে ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এটা রাশিয়ার জন্য মেঘ না চাইতে বৃষ্টির মতোই। বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান সংঘাতের অন্যতম প্রধান সুবিধাভোগী হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে রাশিয়া। রাশিয়ার অর্থ মন্ত্রণালয় চলতি বছরে তাদের বাজেট পরিকল্পনায় দেশটির প্রধান রপ্তানিপণ্য অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ৫৬ ডলারের বেজলাইন ধরেছিল। তবে হঠাৎ সবকিছু পাল্টে গেছে। বেশ কয়েকটি দেশে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০০ ডলার মূল্যে এ পণ্য রপ্তানির সুযোগ পাচ্ছে রাশিয়া। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে ছাড়ে বিক্রি করার পরিবর্তে রাশিয়া অপরিশোধিত জ্বালানি তেল এখন প্রিমিয়াম দামে বিক্রির সুযোগ পেয়েছে। ভারত ও চীনের মতো রাষ্ট্র রাশিয়া থেকে অধিক পরিমাণে তেল আমদানির আগ্রহের কথা জানিয়েছে। পাশাপাশি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও রাশিয়া থেকে তেল আমদানির ব্যাপারে ইতোমধ্যে সবাইকে সবুজ সংকেত দিয়ে রেখেছেন।

গত শুক্রবার মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ভারতকে রাশিয়ার অপরিশোধিত জ্বালানি তেল কিনতে ৩০ দিনের ছাড় দিয়েছে, যাতে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ অব্যাহত থাকে। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট বলেছেন, আমরা রাশিয়ার তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছি, যা গত বছর রাশিয়ার জ্বালানি কেনার জন্য বিভিন্ন দেশকে শাস্তি দেওয়ার যে নীতি নেওয়া হয়েছিল, সে নীতির বিপরীত।

এদিকে প্রেসিডেন্ট পুতিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ সাংবাদিকদের বলেছেন, ক্রেমলিন এই মুহূর্তটি সর্বোচ্চ সুবিধার জন্য ব্যবহার করবে। এখন রুশ জ্বালানিপণ্যের চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে রাশিয়ার ভূমিকা এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ক্রেমলিনের অন্যতম সহযোগী কিরিলি দিমিত্রিভ এক্স হ্যান্ডেলে একাধিক পোস্টে উল্লাস প্রকাশ করে বলেছেন, তেলের ধাক্কার সুনামি সবে শুরু হচ্ছে। রাশিয়ার জ্বালানি থেকে ইউরোপকে বিচ্ছিন্ন করার যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত যে কৌশলগত ভুল ছিল, তা আবার প্রমাণ হয়েছে।

এদিকে গত সোমবার রাতে ট্রাম্প ও পুতিনের মধ্যে অনুষ্ঠিত ফোনালাপ নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা। রুশ নীতিনির্ধারকরা এ ফোনালাপ এবং রাশিয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টিকে এক ধরনের যুদ্ধজয় হিসেবেই দেখছেন। ক্রেমলিনের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক সহকারী উশাকভ এ ব্যাপারে বলেন, প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে ট্রাম্পের ঘণ্টাব্যাপী যে ফোনালাপ হয়েছে, তা মার্কিন উদ্যোগেই হয়েছে। বিষয়টিকে আমরা ইতিবাচক হিসেবেই দেখছি। গত দুই মাসের মধ্যে দুই নেতার মধ্যে এটিই আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট পুতিন মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক নিষ্পত্তির জন্য বেশকিছু পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন। তিনি ইরানসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর শীর্ষ নেতাদের মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দিচ্ছেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও রুশ প্রেসিডেন্টের ভূমিকাকে ইতিবাচক আখ্যা দিয়ে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্য সংকট উত্তরণে পুতিন ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে চান। একই সঙ্গে তিনি বলেন, আমাদের সামরিক লক্ষ্য অর্জনের মাধ্যমে আমরা খুব শিগগির চলমান যুদ্ধের ইতি টানব।

তবে ট্রাম্পের বক্তব্যের পরপরই আইআরজিসি বিবৃতিতে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইল নয়; যুদ্ধের পরিসমাপ্তি আমরাই নির্ধারণ করব। বিবৃতিতে আরো বলা হয়, যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল আক্রমণ অব্যাহত রাখে, তাহলে তেহরান এ অঞ্চল থেকে এক লিটার জ্বালানি তেলও রপ্তানি করতে দেবে না।

সর্বাধিক পঠিত


ভিডিও