
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম ইচ্ছাকৃতভাবে এমন কনটেন্ট সামনে আনে যা মানুষের মধ্যে ক্ষোভ, ঘৃণা ও উত্তেজনা তৈরি করে। কারণ এই ধরনের কনটেন্ট বেশি প্রতিক্রিয়া আনে এবং ব্যবহারকারীদের বেশি সময় প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখে। একাধিক হুইসেলব্লোয়ারের বক্তব্যে এমন অভিযোগ উঠেছে প্রযুক্তি জায়ান্ট Meta Platforms ও TikTok এর বিরুদ্ধে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম BBC এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে গিয়ে এই প্রতিষ্ঠানগুলো এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে যা ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
মেটার এক সাবেক প্রকৌশলী জানান, কোম্পানির শীর্ষ ব্যবস্থাপনা তাদেরকে ব্যবহারকারীর ফিডে আরও বেশি “বর্ডারলাইন” বা সীমান্তবর্তী ক্ষতিকর কনটেন্ট দেখানোর নির্দেশ দেয়। এর মধ্যে ছিল নারীবিদ্বেষী বক্তব্য, ষড়যন্ত্র তত্ত্ব এবং উস্কানিমূলক পোস্ট। তিনি বলেন, টিকটকের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ায় এবং শেয়ারের দাম কমে যাওয়ায় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
মেটার সাবেক গবেষক Matt Motyl জানান, টিকটকের জনপ্রিয়তার জবাবে ইনস্টাগ্রামে রিলস চালু করা হয় দ্রুতগতিতে। কিন্তু পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই এটি চালু করা হয়। কোম্পানির অভ্যন্তরীণ গবেষণায় দেখা গেছে, রিলসের মন্তব্যে বুলিং ও হয়রানি ৭৫ শতাংশ বেশি, ঘৃণামূলক বক্তব্য ১৯ শতাংশ বেশি এবং সহিংসতা বা সহিংসতার উস্কানি ৭ শতাংশ বেশি।
এই সময়ে রিলস সম্প্রসারণে ৭০০ কর্মী নিয়োগ দেওয়া হলেও শিশু সুরক্ষা ও নির্বাচনী নিরাপত্তা জোরদারে অতিরিক্ত কর্মী চাওয়া হলেও তা অনুমোদন পায়নি বলে জানান এক সাবেক কর্মকর্তা।
অভ্যন্তরীণ এক গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ফেসবুকের অ্যালগরিদম এমন একটি পথ তৈরি করে যা নির্মাতাদের লাভ বাড়ায় কিন্তু দর্শকদের সুস্থতার ক্ষতি করে। এতে বলা হয়, প্ল্যাটফর্মটি এমন কনটেন্টকে এগিয়ে দেয় যা মানুষের নৈতিক বা রাজনৈতিক অনুভূতিকে উসকে দেয় এবং তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।
টিকটকের এক ট্রাস্ট অ্যান্ড সেফটি কর্মী, যাকে প্রতিবেদনে নিক নামে উল্লেখ করা হয়েছে, দাবি করেন কোম্পানির ভেতরে ব্যবহারকারীদের অভিযোগ মূল্যায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের অভিযোগকে অনেক সময় বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। শিশু বা কিশোরদের বিরুদ্ধে সাইবার বুলিং বা যৌন ব্ল্যাকমেইলের মতো অভিযোগও অনেক ক্ষেত্রে কম গুরুত্ব পায়।
তার ভাষায়, কোম্পানি রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে বেশি আগ্রহী, কারণ নিয়ন্ত্রণ বা নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি এড়াতে চায়।
আরেক সাবেক মেশিন লার্নিং প্রকৌশলী Ruofan Ding বলেন, টিকটকের সুপারিশ অ্যালগরিদম একটি “ব্ল্যাক বক্স” এর মতো। প্রকৌশলীরা মূলত কনটেন্টকে কেবল একটি নম্বর বা আইডি হিসেবে দেখেন। ফলে কনটেন্টের সামাজিক প্রভাব সরাসরি বিবেচনায় আসে না।
যুক্তরাজ্যের সন্ত্রাসবিরোধী পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, সামাজিক মাধ্যমে সাম্প্রতিক সময়ে ইহুদিবিদ্বেষী, বর্ণবাদী ও সহিংস উগ্রবাদী পোস্টের স্বাভাবিকীকরণ দেখা যাচ্ছে।
একজন তরুণ ব্যবহারকারী জানান, ১৪ বছর বয়স থেকে অ্যালগরিদমের মাধ্যমে তাকে এমন ভিডিও দেখানো হয় যা তাকে ধীরে ধীরে বর্ণবাদী ও নারীবিদ্বেষী চিন্তার দিকে ঠেলে দেয়।
অভিযোগের জবাবে মেটা জানিয়েছে, আর্থিক লাভের জন্য তারা ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষতিকর কনটেন্ট ছড়ায় এমন দাবি সঠিক নয়। কোম্পানিটি ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তায় দীর্ঘদিন ধরে বড় বিনিয়োগ করেছে বলেও জানায়।
অন্যদিকে টিকটকও অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, তাদের প্ল্যাটফর্মে ক্ষতিকর কনটেন্ট দেখা যাওয়ার আগেই তা ঠেকাতে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয় এবং কিশোরদের অ্যাকাউন্টে ৫০টির বেশি নিরাপত্তা ফিচার স্বয়ংক্রিয়ভাবে সক্রিয় থাকে।
Source: BBC