
মাত্র এক সপ্তাহ আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাজ্যকে মধ্যপ্রাচ্যে রণতরী না পাঠানোর পরামর্শ দিয়ে বলেছিলেন, ইরান যুদ্ধে তিনি এরই মধ্যে জয়ী হয়েছেন এবং যুক্তরাজ্যের রণতরীর সহায়তা তার লাগবে না। কিন্তু সেই দাবির রেশ কাটতে না কাটতেই এখন তিনি আমেরিকার ‘বিশেষ সম্পর্ক’ থাকা মিত্র দেশ, ন্যাটোভুক্ত রাষ্ট্র এবং এমনকি চীনের প্রতিও আহ্বান জানাচ্ছেন কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করতে রণতরী পাঠানোর জন্য। ট্রাম্পের এ আকস্মিক অবস্থান পরিবর্তন এবং এরই মধ্যে যে যুদ্ধে তিনি ‘জিতে গেছেন’ বলে ঘোষণা দিয়েছেন, সেই যুদ্ধে এখন কেন বিদেশি সহায়তার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিচ্ছে এ প্রশ্নটি জোরালো করে তুলেছে যে, ওয়াশিংটন আসলে ইরানের এ সংঘাত থেকে বের হওয়ার কোনো স্পষ্ট পথ খুঁজে পাচ্ছে কি না।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পের এ নতুন আহ্বান যুদ্ধের প্রকৃত পরিস্থিতি নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি করেছে। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, এ সহায়তার অনুরোধে সাড়া না দিলে ইউরোপের মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং চীনা নেতা শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার আসন্ন শীর্ষ সম্মেলন ঝুঁকিতে পড়তে পারে। ট্রাম্প বারবার বিজয়ের দাবি করলেও বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে এবং তেলের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে, যা খোদ আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ট্রাম্পের অবস্থানকে দুর্বল করছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও সামুদ্রিক ড্রোন মোকাবিলা এবং মাইন অপসারণের কাজ অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ এবং জটিল। এ পরিস্থিতি সামাল দিতেই ট্রাম্প এখন বিদেশি নৌবাহিনীর ওপর নির্ভর করতে চাইছেন।
প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা জনমনে ও বিশ্ববাজারে যুদ্ধের সমাপ্তি নিয়ে আশার বাণী শোনালেও সেখানে যথেষ্ট বৈপরীত্য রয়েছে। জাতিসংঘে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে একে ‘আধুনিক সামরিক ইতিহাসের অনন্য বিজয়’ বলে বর্ণনা করলেও মার্কিন সেনারা ঠিক কবে নাগাদ দেশে ফিরবে, সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা দেননি। অন্যদিকে, জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট আশা প্রকাশ করেছেন যে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এ সংঘাতের অবসান ঘটবে। কিন্তু ইসরায়েলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ইরানের সামরিক ও গোয়েন্দা লক্ষ্যবস্তুগুলোতে তাদের ধ্বংসাত্মক বিমান হামলা আরও অন্তত তিন সপ্তাহ চলতে পারে। ইসরায়েল দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে অভ্যস্ত হলেও মার্কিন ভোটার ও নেতাদের জন্য এ অনিশ্চয়তা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ট্রাম্পের জন্য আরেকটি বড় মাথাব্যথার কারণ হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। গত বছর তিনি এ কর্মসূচি ‘ধ্বংস’ করার দাবি করলেও তেহরানের কাছে এখনো সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিশাল মজুত রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এ হুমকি মোকাবিলায় মার্কিন স্পেশাল ফোর্সের কয়েকশ সেনার বিপজ্জনক অভিযানের প্রয়োজন হতে পারে, যা সরাসরি স্থলযুদ্ধের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেবে। এ ছাড়া ইরানের আয়ের মূল উৎস খারগ দ্বীপ দখল করার পরিকল্পনাও আলোচনায় রয়েছে। কিন্তু সমুদ্রপথে এ আক্রমণ চালাতে গেলে প্রচুর মার্কিন সেনা হতাহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে এবং ইরান যদি নিজেদের তেল স্থাপনা নিজেরাই ধ্বংস করে দেয়, তবে বিশ্ববাজারে এর ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
রাজনৈতিকভাবেও ইরানের পক্ষ থেকে কোনো নতি স্বীকারের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ট্রাম্পের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের দাবি তেহরান কানেই তুলছে না, বরং নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির উত্থান ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধের সংকেত দিচ্ছে। ডেমোক্র্যাটরা অভিযোগ করছেন, কোনো সুস্পষ্ট প্রস্থান কৌশল ছাড়াই ট্রাম্প এ যুদ্ধ শুরু করেছেন এবং ইরাক বা আফগানিস্তানের মতো আরও একটি ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধের’ চোরাবালিতে আমেরিকাকে আটকে ফেলছেন। রিপাবলিকানরা আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজয়ের ভয়ে দ্রুত যুদ্ধ শেষ করার পক্ষে থাকলেও হরমুজ প্রণালি নিয়ে সৃষ্ট সংকট ট্রাম্পকে বিভিন্ন দেশের কাছে হাত পাততে বাধ্য করছে। ফলে ‘বিজয়ের’ ঘোষণা দিলেও মিত্রদের রণতরী ছাড়া ট্রাম্পের পক্ষে এ যুদ্ধের সমাপ্তি টানা এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।