যুক্তরাষ্ট্র

ভাষণ প্রচার না করায় শীর্ষ ৩ গণমাধ্যমের লাইসেন্স বাতিলের হুমকি দিলেন ট্রাম্প

16076_IMG_7920.jpeg

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী নিরাপত্তা বিষয়ক প্রাইম-টাইম ভাষণ তাদের মূল সম্প্রচার চ্যানেলে সরাসরি দেখায়নি মার্কিন সংবাদমাধ্যম এবিসি, এনবিসি এবং সিএনএন। চার মাস পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে দেওয়া এই ভাষণ সম্প্রচার না করায় শীর্ষ এই ৩ গণমাধ্যমের লাইসেন্স বাতিলের হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প।

শুক্রবার (১৭ জুলাই) আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

ট্রাম্প ভাষণে অভিযোগ করেন, তার বক্তব্য সম্প্রচার না করা একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ। এমন আচরণের জন্য সংশ্লিষ্ট টেলিভিশন নেটওয়ার্কগুলোর সম্প্রচার লাইসেন্স বাতিল করা উচিত।

তিনি বলেন, এনবিসি এবং এবিসি সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা এই ভাষণ সম্প্রচার করবে না। এ ধরনের প্রতারণার শাস্তি হওয়া উচিত তাদের লাইসেন্স বাতিল।

তবে গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনী অনুযায়ী সম্প্রচারমাধ্যমগুলো কী প্রচার করবে বা করবে না, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে। যদিও অতীতে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রেসিডেন্টের গুরুত্বপূর্ণ ভাষণগুলো সাধারণত প্রধান সম্প্রচার নেটওয়ার্কগুলো সরাসরি প্রচার করত।

এবিসি নিউজ জানায়, তারা ট্রাম্পের ভাষণ মূল টেলিভিশন চ্যানেলে না দেখিয়ে তাদের স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম এবিসি নিউজ লাইভ এবং এবিসি নিউজ রেডিওতে প্রচার করেছে।

একইভাবে এনবিসি ভাষণটি তাদের বিনামূল্যের স্ট্রিমিং সেবা এনবিসি নিউজ নাও-তে সম্প্রচার করলেও প্রধান সম্প্রচার চ্যানেলে প্রচার করেনি। এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটি আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানায়।

সিএনএন জানায়, ভাষণের সংবাদমূল্য পর্যবেক্ষণ করা হবে এবং এর সরাসরি ভিডিও তাদের ওয়েবসাইট ও সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম সিএনএন অল অ্যাকসেসে দেখানো হয়েছে। তবে মূল কেবল টেলিভিশন চ্যানেলে ভাষণটি সরাসরি প্রচার করা হয়নি।

স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোর দর্শকসংখ্যা প্রচলিত সম্প্রচার চ্যানেলের তুলনায় অনেক কম হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

ভাষণে ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি এমন কিছু গোয়েন্দা তথ্য অবমুক্ত করেছেন যা যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে চীনের হস্তক্ষেপের প্রমাণ বহন করে। তবে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর আগের মূল্যায়নে ২০২০ সালের নির্বাচনের ফলাফল পরিবর্তনে বেইজিংয়ের কোনো ভূমিকার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট ভাষণের আগে সাংবাদিকদের জানান, নির্বাচনী নিরাপত্তার পাশাপাশি ট্রাম্প ইরান পরিস্থিতি এবং অন্যান্য বিষয়েও কথা বলতে পারেন। তার মতে, এসব কারণেই জাতীয় টেলিভিশন নেটওয়ার্কগুলোর ভাষণটি সরাসরি প্রচার করা উচিত ছিল।

ট্রাম্প ভাষণে সংক্ষেপে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান সংঘাতের প্রসঙ্গ তুলে দাবি করেন, এ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন। তবে ভাষণের মূল অংশজুড়ে তিনি নির্বাচনী নিরাপত্তা নিয়ে নিজের দীর্ঘদিনের অভিযোগ পুনরাবৃত্তি করেন।

২০২০ সালের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেনের কাছে পরাজয়ের পর থেকেই ট্রাম্প ধারাবাহিকভাবে দাবি করে আসছেন, নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে। যদিও এ দাবির পক্ষে কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ আদালত বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সামনে উপস্থাপন করা যায়নি। তিনি ডাকযোগে ভোট এবং অবৈধ ভোটারদের অংশগ্রহণ নিয়েও বারবার অভিযোগ করেছেন।

অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কোর্তেজসহ কয়েকজন রাজনীতিক সম্প্রচারমাধ্যমগুলোকে ট্রাম্পের ভাষণ সরাসরি প্রচার না করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাদের যুক্তি ছিল, ট্রাম্প আবারও ভিত্তিহীন নির্বাচনী জালিয়াতির অভিযোগ তুলে বিভ্রান্তি ছড়াতে পারেন।

তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস ট্রাম্পের ভাষণ সরাসরি সম্প্রচার করেছে। সম্প্রচারের আগে উপস্থাপক টনি ডোকুপিল দর্শকদের সতর্ক করে বলেন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী নিরাপত্তা নিয়ে অতীতে যে দাবিগুলো করেছেন, তার অনেকগুলোই সত্য নয়। এরপরও সংবাদমূল্যের কারণে ভাষণটি সরাসরি প্রচার করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। ভাষণ শুরু হওয়ার প্রায় ১৫ মিনিট পর সিবিএস ট্রাম্পের বিভিন্ন দাবির বাস্তবতা যাচাই করে আলাদা বিশ্লেষণও প্রচার করে।

ফক্স নিউজও ট্রাম্পের ভাষণ পূর্ণাঙ্গভাবে সরাসরি সম্প্রচার করে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে ফক্সের স্থানীয় সম্প্রচার কেন্দ্রগুলোও সেই সম্প্রচার দেখায়।

এই ঘটনাকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম ও রাজনীতির সম্পর্ক নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সম্প্রতি এবিসির মালিক ডিজনি এবং এনবিসির মালিক কমকাস্টের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন (এফসিসি) একাধিক তদন্ত পরিচালনা করছে। ট্রাম্প অতীতেও এনবিসিকে একপেশে এবং অসৎ সংবাদমাধ্যম বলে সমালোচনা করেছেন।

এফসিসির চেয়ারম্যান ব্রেন্ডান কার ভাষণের আগের দিন এক সাক্ষাৎকারে মত দেন যে, প্রেসিডেন্টের এই ধরনের ভাষণ সম্প্রচার করা উচিত, কারণ জনগণের তা দেখার অধিকার রয়েছে।

পুরো ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক চাপ নিয়ে চলমান বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে।

সর্বাধিক পঠিত


ভিডিও