বিশেষ খবর


হিমালয়ের সতর্কবার্তা: নেপালের বিপর্যয় কি শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ?

16493_2.jpg

- নূর আলম সিদ্দিকী রাসেল

আইনবিদ, কলামিস্ট ও বিশ্লেষক


প্রকৃতি কখনো কখনো কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই মানুষের তৈরি নিরাপত্তার সব হিসাব এলোমেলো করে দেয়।


একটি বাড়ি, একটি রাস্তা, একটি সেতু কিংবা একটি জনপদ তৈরি করতে মানুষের বছরের পর বছর লেগে যায়। অথচ পাহাড় থেকে নেমে আসা কয়েক মুহূর্তের প্রবল স্রোত সেই পরিচিত পৃথিবীটিকেই অচেনা করে দিতে পারে।


নেপালে এখন ঠিক এমনই এক মানবিক বিপর্যয়।


নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে গ্রামের পর গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সড়ক, সেতু, বাড়িঘর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো পানির তোড় ও কাদামাটির নিচে হারিয়ে গেছে। ২৬ আগস্ট পর্যন্ত সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্যে নেপালে অন্তত ১৫৭ জনের মরদেহ উদ্ধারের কথা বলা হয়েছে।

সীমান্তের ওপারে তিব্বতে আরও অন্তত তিনজনের মৃত্যুর খবর এসেছে। নেপালে ৪০৩ জন পর্যটকসহ শত শত মানুষ নিখোঁজ বলে সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৩৪১ জন বিদেশি। সংখ্যাগুলো এখনো পরিবর্তনশীল, কারণ উদ্ধার অভিযান চলছে।


কিন্তু এই বিপর্যয়ের দিকে শুধু মৃত ও নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা দিয়ে তাকালে সম্ভবত আমরা এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি হারিয়ে ফেলব।


প্রশ্ন হলো - হিমালয়ে আসলে কী ঘটছে?

আরও বড় প্রশ্ন - নেপালের এই বিপর্যয় কি দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর ভবিষ্যতেরও একটি সতর্কবার্তা?


পাহাড় থেকে নেমে এসেছিল শুধু পানি নয়


প্রথম দিকে ঘটনাটিকে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধস হিসেবেই দেখা হচ্ছিল। কিন্তু বিজ্ঞানীদের প্রাথমিক বিশ্লেষণ আরও জটিল একটি সম্ভাবনার দিকে ইঙ্গিত করছে।


কাঠমান্ডুভিত্তিক International Centre for Integrated Mountain Development বা ICIMOD-এর একজন বিশেষজ্ঞের প্রাথমিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, নেপাল অংশে একটি rock-ice avalanche বা পাথুরে বরফধস হয়ে থাকতে পারে। সেটি লেন্দে নদীর প্রবাহে বিপুল বরফ-পাথরের ধ্বংসাবশেষ এনে আকস্মিক প্রবল স্রোত সৃষ্টি করে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অর্থাৎ পাহাড় থেকে শুধু পানি নেমে আসেনি।

সঙ্গে এসেছে পাথর, বরফ, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ।

আর পাহাড়ি অঞ্চলে এমন স্রোতের শক্তি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, নেপালের বিধ্বস্ত জনপদগুলো এখন তার সাক্ষী।


এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্যার তীব্র স্রোতে ভবন কাদামাটি ও পানির নিচে চাপা পড়েছে। একপর্যায়ে পরিস্থিতি এত ভয়াবহ হয়ে ওঠে যে উদ্ধারকাজও অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।


রাসুয়ার সিয়াপ্রু বেসি ও তিমুরের মতো ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পানির উচ্চতার কারণে হেলিকপ্টার পর্যন্ত অবতরণ করতে পারেনি বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।


ভাবা যায়? মানুষ বিপদে পড়েছে।

উদ্ধারকারী দল প্রস্তুত।হেলিকপ্টারও আছে।

কিন্তু প্রকৃতির তীব্রতার সামনে সেখানে পৌঁছানোর সামর্থ্যটুকুও সীমিত হয়ে পড়েছে।


জলবায়ু পরিবর্তন - কিন্তু কথাটা সাবধানে বলতে হবে


এ ধরনের দুর্যোগ ঘটলেই আমরা প্রায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি শব্দ ব্যবহার করি - climate change।

কিন্তু একজন বিশ্লেষকের দায়িত্ব হলো আতঙ্ক সৃষ্টি না করে তথ্যের সীমাটাও পরিষ্কার রাখা।

এই নির্দিষ্ট দুর্যোগটি সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই ঘটেছে - এখনই এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার মতো বৈজ্ঞানিক attribution সামনে আসেনি।

তবে বৃহত্তর বাস্তবতাটিও অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ার বর্ষাকালে বন্যা ও ভূমিধস নতুন ঘটনা নয়। কিন্তু বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই অঞ্চলে চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও তীব্র হয়ে উঠছে।


হিমালয়কে অনেক সময় পৃথিবীর ‘Third Pole’ বলা হয়। কারণ মেরু অঞ্চলের বাইরে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ বরফভান্ডার এই বিস্তীর্ণ পর্বতমালায়।


এই বরফ কেবল পাহাড়ের সৌন্দর্য নয়।এটি কোটি কোটি মানুষের পানির উৎস।নদীর উৎস।কৃষির সঙ্গে যুক্ত।জীবিকার সঙ্গে যুক্ত।

এবং শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ার খাদ্য ও পানিনিরাপত্তার সঙ্গেও যুক্ত।

তাই হিমালয়ে যা ঘটে, তা শুধু নেপালের পাহাড়েই আটকে থাকে না।

 

বিপর্যয় এখনো শেষ হয়ে যায়নি


সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় সম্ভবত এটিই।

প্রাথমিক দুর্যোগ ঘটে যাওয়ার পরও বিপদ পুরোপুরি কেটে গেছে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

ICIMOD-এর জলবায়ু ও পরিবেশ ঝুঁকিবিষয়ক একজন কর্মকর্তা সতর্ক করেছেন, নেপাল-চীন সীমান্তের নদীর উজানে এখনও প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। ফলে দ্বিতীয় দফা বন্যার ঝুঁকিও রয়েছে।

এ কারণেই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সামনে আসে।

দুর্যোগের পর মানুষ উদ্ধার করা অবশ্যই রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রের আরও বড় দায়িত্ব হলো - দুর্যোগ আসার আগেই মানুষকে রক্ষা করার সক্ষমতা তৈরি করা।

Early-warning system কতটা কার্যকর?

পাহাড়ি নদীর ওপর satellite monitoring কতটা হচ্ছে?

বরফ, পাথর কিংবা ভূমিধস নদীর প্রবাহ আটকে দিলে সেটি কত দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব?

ঝুঁকিপূর্ণ জনপদের মানুষের কাছে সতর্কবার্তা পৌঁছাতে কত সময় লাগে?

পর্যটকদের অবস্থান রাষ্ট্র কতটা দ্রুত শনাক্ত করতে পারে?

এসব প্রশ্ন এখন আর শুধু বিজ্ঞানীদের গবেষণাপত্রে থাকার বিষয় নয়। এসব জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন।

 

পর্যটনের স্বর্গ যখন বিপদের ভূখণ্ড


নেপালের অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক পরিচয়ের সঙ্গে পর্যটনের সম্পর্ক গভীর।

হিমালয়, এভারেস্ট, ট্রেকিং, পাহাড়ি জনপদ - পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে মানুষ এই প্রকৃতির আকর্ষণেই নেপালে যান।

কিন্তু এবারের দুর্যোগের একটি বিশেষ দিক হলো বিপুলসংখ্যক পর্যটকের নিখোঁজ হওয়া।


সর্বশেষ প্রতিবেদনে ৪০৩ জন পর্যটকের খোঁজ না পাওয়ার কথা বলা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে ৩৪১ জন বিদেশি। ভারতীয়দের পাশাপাশি যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকের নাম নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছে।


এটি নেপালের জন্য শুধু মানবিক সংকট নয়।

এটি tourism risk management-এরও পরীক্ষা।

যে দেশ প্রকৃতিকে তার সবচেয়ে বড় পর্যটনসম্পদ হিসেবে ব্যবহার করে, সেই দেশের জন্য প্রকৃতির ঝুঁকিকেও পর্যটননীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে।


প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকায় একজন বিদেশি পর্যটক কোথায় আছেন, জরুরি পরিস্থিতিতে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ কীভাবে হবে, কোন পথে তাঁকে সরিয়ে নেওয়া হবে এবং তাঁর পরিবার কত দ্রুত নির্ভরযোগ্য তথ্য পাবে - এসবের জন্য শক্তিশালী ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

কারণ adventure tourism-এর অর্থ ঝুঁকিকে উপেক্ষা করা নয়।

ঝুঁকিকে বুঝে পরিচালনা করা।

 

একটি দুর্যোগ যখন বিদ্যুৎও কেড়ে নেয়


প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি শুধু প্রাণহানিতে শেষ হয় না।

নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জলবিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুৎ মিলিয়ে প্রায় ৪৩০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা এই দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামোও ক্ষতির মুখে পড়েছে।

এখানেই climate resilience-এর আরেকটি বড় প্রশ্ন।

একটি দেশ renewable energy তৈরি করছে - এটি অবশ্যই ইতিবাচক।

কিন্তু সেই অবকাঠামো যদি এমন জায়গায় থাকে যেখানে বন্যা, ভূমিধস কিংবা পাহাড়ি ঢলের ঝুঁকি বাড়ছে, তাহলে শুধু clean energy হলেই হবে না।

সেটিকে resilient energy-ও হতে হবে।


একই কথা সড়কের ক্ষেত্রে।সেতুর ক্ষেত্রে।বসতির ক্ষেত্রে।

হোটেলের ক্ষেত্রে।পর্যটন অবকাঠামোর ক্ষেত্রেও।

উন্নয়ন শুধু কত কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ হলো কিংবা কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হলো, সেই হিসাব নয়।

প্রশ্ন করতে হবে - সেই উন্নয়ন পরবর্তী বড় দুর্যোগটি সহ্য করতে পারবে কি না।

 

সীমান্ত মানে না প্রকৃতি


এই দুর্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর আন্তঃসীমান্ত চরিত্র।

নেপালে বিপর্যয় ঘটেছে, কিন্তু তার প্রভাব পড়েছে সীমান্তের ওপারের তিব্বতেও। সেখানে অন্তত তিনজনের মৃত্যুর এবং ২৬৫ জন নিখোঁজ থাকার প্রাথমিক তথ্য এসেছে।

নেপাল উদ্ধারকাজে ভারত ও চীন উভয়ের সহযোগিতা চেয়েছে। এই জায়গাটিই দক্ষিণ এশিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের রাজনীতি সীমান্ত বোঝে।নদী বোঝে না। আমাদের কূটনীতি ভিসা বোঝে।বন্যা বোঝে না।আমরা মানচিত্রে রেখা টেনে রাষ্ট্র ভাগ করতে পারি।প্রকৃতি সেই রেখা অনুসরণ করে না।


হিমালয়ের পানি একটি দেশের ভেতর জন্ম নিয়ে আরেক দেশের ওপর দিয়ে তৃতীয় দেশে পৌঁছাতে পারে। ফলে পানি, আবহাওয়া, হিমবাহ, বন্যা এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় regional cooperation কোনো সৌজন্যমূলক কূটনীতি নয়।এটি প্রয়োজন।

 


বাংলাদেশের জন্যও কি কোনো বার্তা আছে?


অবশ্যই আছে।বাংলাদেশ হিমালয়ের দেশ নয়।

কিন্তু বাংলাদেশ হিমালয় থেকে বিচ্ছিন্নও নয়।

আমাদের প্রধান নদীব্যবস্থা বৃহত্তর হিমালয় ও আন্তঃসীমান্ত অববাহিকার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। উজানের বৃষ্টিপাত, নদীর প্রবাহ এবং জলবায়ুগত পরিবর্তনের প্রভাব শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের ওপরও পড়ে।

বাংলাদেশ আবার পৃথিবীর অন্যতম জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ।আমাদের বিপদ নেপালের মতো পাহাড়ি বরফধস নাও হতে পারে।

আমাদের বিপদ অন্য রূপে আসে - নদীবন্যা, আকস্মিক বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, অতিবৃষ্টি কিংবা লবণাক্ততা।

কিন্তু মূল শিক্ষা একই।

 

দুর্যোগের পর ত্রাণ দেওয়ার চেয়ে দুর্যোগের আগে জীবন রক্ষা করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।


আমাদেরও প্রশ্ন করা দরকার - আমাদের early-warning ব্যবস্থা কতটা কার্যকর?

সতর্কবার্তা শুধু সরকারি দপ্তরে পৌঁছায়, নাকি প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষের কাছেও পৌঁছায়?

বৃদ্ধ, শিশু ও প্রতিবন্ধী মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা কতটা বাস্তবসম্মত?

নদী ও আবহাওয়ার তথ্য প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে কত দ্রুত বিনিময় হয়?

আর আমরা যে সড়ক, সেতু, বাঁধ ও শহর তৈরি করছি, সেগুলো কি আগামী ৩০ বা ৫০ বছরের পরিবর্তিত জলবায়ু মাথায় রেখে তৈরি করছি?

নেপালের ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকিয়ে এই প্রশ্নগুলো বাংলাদেশকেও করতে হবে।

 

উন্নয়ন বনাম প্রকৃতি - প্রশ্নটাই সম্ভবত ভুল


অনেক সময় আমরা উন্নয়ন ও পরিবেশকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করাই।

যেন একটি বেছে নিলে অন্যটি ছাড়তে হবে।

আসলে একুশ শতকের বাস্তবতায় এই চিন্তাই পুরোনো হয়ে যাচ্ছে।

পরিবেশকে উপেক্ষা করে যে উন্নয়ন তৈরি হয়, প্রকৃতি একদিন তার মূল্য আদায় করতে পারে।

পাহাড় কেটে রাস্তা বানানো সহজ।

কিন্তু সেই পাহাড়ের geological stability কী হবে?

নদীর পাশে অবকাঠামো বানানো যায়।

কিন্তু শতবর্ষের flood risk হিসাব করা হয়েছে কি?

পর্যটনকেন্দ্র তৈরি করা যায়।

কিন্তু evacuation route কোথায়?

প্রকৃতিকে জয় করার ধারণা থেকে আমাদের সম্ভবত বেরিয়ে আসতে হবে।

প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান করাই ভবিষ্যতের উন্নয়নের বড় শর্ত।

 

সংখ্যার আড়ালে মানুষগুলোকে যেন ভুলে না যাই


সংবাদে আমরা সংখ্যা দেখি।১৫৭ জন নিহত।শত শত নিখোঁজ।৪০৩ পর্যটকের খোঁজ নেই।

৪৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত।

কিন্তু প্রতিটি সংখ্যার পেছনে একজন মানুষ আছেন।

কোনো একজনের বাবা।কারও মা।কারও সন্তান।

কেউ হয়তো জীবনের স্বপ্নের ভ্রমণে নেপালে গিয়েছিলেন।

কেউ সকালে ঘর থেকে বের হয়েছিলেন, ভেবেছিলেন সন্ধ্যায় ফিরে আসবেন।

কোনো পরিবার এখনো ফোনের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করছে - হয়তো একটি খবর আসবে।

দুর্যোগের সবচেয়ে নির্মম দিক সম্ভবত এখানেই।

পরিসংখ্যান আমাদের বিপর্যয়ের আকার বোঝায়।

কিন্তু মানুষের কষ্টের গভীরতা বোঝাতে পারে না।

 

শেষ কথা


নেপালের এই বিপর্যয়কে আমরা কয়েক দিনের breaking news হিসেবে দেখে ভুলে যেতে পারি।উদ্ধার অভিযান শেষ হবে।মৃতের চূড়ান্ত সংখ্যা প্রকাশ হবে।রাস্তা আবার তৈরি হবে।বিদ্যুৎকেন্দ্র মেরামত হবে।পর্যটকরাও একদিন আবার ফিরবেন।

কিন্তু হিমালয় যে প্রশ্নটি আমাদের সামনে রেখে যাচ্ছে, সেটি থেকে যাবে।

আমরা কি পরবর্তী দুর্যোগের জন্য প্রস্তুত?


জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে প্রাকৃতিক দুর্যোগকে শুধু ‘প্রকৃতির খেয়াল’ বলে দায় শেষ করার সুযোগ ক্রমেই কমছে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব এখন শুধু উদ্ধার ও পুনর্বাসন নয়। বিজ্ঞানভিত্তিক ঝুঁকি মূল্যায়ন, আগাম সতর্কতা, নিরাপদ অবকাঠামো, কার্যকর ভূমি ব্যবহার এবং আন্তঃসীমান্ত তথ্য বিনিময়ও জননিরাপত্তার অংশ।

প্রকৃতিকে থামানোর ক্ষমতা মানুষের নেই।

কিন্তু বিজ্ঞান, পরিকল্পনা ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্রব্যবস্থার মাধ্যমে একটি প্রাকৃতিক বিপদকে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত হওয়া থেকে অনেক ক্ষেত্রেই ঠেকানো সম্ভব।

নেপালের পাহাড় থেকে নেমে আসা সেই ভয়ংকর স্রোত তাই শুধু কাদা, পাথর আর পানি বহন করে আনেনি।

এটি একটি সতর্কবার্তাও বহন করে এনেছে।

শুধু নেপালের জন্য নয়।বাংলাদেশের জন্যও।

দক্ষিণ এশিয়ার জন্যও।

এবং এমন এক পৃথিবীর জন্য, যেখানে প্রকৃতি ক্রমেই আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে - উন্নয়নের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা আমরা কত দ্রুত এগোতে পারি, তা নয়; আমরা কতটা নিরাপদভাবে এগোতে শিখেছি, সেটি।

সর্বাধিক পঠিত


ভিডিও