
- নূর আলম সিদ্দিকী রাসেল
আইনবিদ, কলামিস্ট ও বিশ্লেষক
সম্প্রতি একটি টেলিভিশন টকশোতে জাতীয় নাগরিক পার্টির (NCP) নেত্রী অ্যাডভোকেট হুমায়রা নূরের সিলেট, সিলেটি ভাষা এবং ব্রিটেনে বসবাসরত সিলেটি জনগোষ্ঠীকে নিয়ে করা কিছু মন্তব্য শুনলাম। তাঁর বক্তব্যের একটি অংশ ছিল - সিলেটের মানুষ নাকি ‘শুদ্ধ বাংলা’ বলতে পারেন না। আলোচনার আরেক পর্যায়ে তিনি ব্রিটেনে বসবাসরত সিলেটিদের সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে আসা অন্য অঞ্চলের মানুষের সম্পর্ক নিয়েও এমন কিছু মন্তব্য করেন, যাতে মনে হয়েছে সিলেটি কমিউনিটি অন্য অঞ্চলের মানুষকে সহজভাবে গ্রহণ করে না।
একটি জাতীয় রাজনৈতিক দলের একজন নেত্রীর মুখ থেকে একটি অঞ্চলের ভাষা ও জনগোষ্ঠী নিয়ে এমন সাধারণীকরণ আমাকে বিস্মিত করেছে। আমি তাঁর এই বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।
তবে এই প্রতিবাদের উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলকে হেয় করা নয়। আমার আপত্তি তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ে নয়, আপত্তি তাঁর বক্তব্যে। আর সেই বক্তব্যের জবাবও আমি আঞ্চলিক বিদ্বেষ দিয়ে দিতে চাই না।
বরং প্রশ্ন করতে চাই - আমরা কি সত্যিই সিলেটকে জানি?
‘শুদ্ধ বাংলা’ বলতে আমরা কী বুঝি?
প্রথমেই ‘শুদ্ধ বাংলা’ শব্দবন্ধটি নিয়ে ভাবা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের শিক্ষা, প্রশাসন, গণমাধ্যম ও আনুষ্ঠানিক যোগাযোগে প্রমিত বাংলার ব্যবহার রয়েছে। কিন্তু প্রমিত বাংলা আর বাংলাদেশের মানুষের সব আঞ্চলিক ভাষা বা কথ্যরীতি এক বিষয় নয়।
চট্টগ্রামের মানুষ চট্টগ্রামের ভাষায় কথা বলেন। নোয়াখালী, বরিশাল, রংপুর, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা কিংবা পুরান ঢাকার মানুষের কথায় নিজস্ব উচ্চারণ, শব্দ ও প্রকাশভঙ্গি রয়েছে। এগুলো বাংলাদেশের ভাষাগত বৈচিত্র্যের অংশ।
তাহলে একজন সিলেটি তাঁর নিজের ভাষায় কথা বললেই সেটিকে ‘অশুদ্ধ বাংলা’ বলা হবে কেন?
সিলেটি স্বতন্ত্র ভাষা, নাকি বাংলা ভাষার একটি স্বতন্ত্র উপভাষা - এ নিয়ে ভাষাতাত্ত্বিক আলোচনা রয়েছে। সেই বিতর্ক চলতেই পারে। কিন্তু সিলেটির নিজস্ব ধ্বনিগত বৈশিষ্ট্য, শব্দভাণ্ডার, ব্যাকরণগত স্বাতন্ত্র্য এবং দীর্ঘ ভাষাগত ইতিহাস রয়েছে - এটি অস্বীকার করার সুযোগ কম।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সিলেটের রয়েছে নিজস্ব ঐতিহাসিক সিলেটি নাগরী লিপি।
নাগরী হরফে শতাধিক গ্রন্থ ও পুঁথির সন্ধান পাওয়া গেছে। সৈয়দ শাহ নূরের মতো কবি-সাধকের রচনাও এই সাহিত্যিক ঐতিহ্যের অংশ। বৃহত্তর সিলেটের সীমানা ছাড়িয়ে কাছাড়, করিমগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন অঞ্চলে একসময় নাগরীর ব্যবহার ছিল।
অর্থাৎ সিলেটি ভাষা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে শুধু একজন মানুষের উচ্চারণ শুনে সিদ্ধান্ত দেওয়ার সুযোগ নেই। এর পেছনে রয়েছে কয়েক শতাব্দীর ভাষা, সাহিত্য, সংগীত ও মানুষের জীবন।
ভিন্নতা অশুদ্ধতা নয়। উচ্চারণের স্বাতন্ত্র্য ভাষাজ্ঞানের অক্ষমতাও নয়।
বরং কোনো আঞ্চলিক ভাষাকে প্রমিত বাংলার উচ্চারণ দিয়ে মেপে ‘শুদ্ধ’ বা ‘অশুদ্ধ’ ঘোষণা করাটাই ভাষাগত বৈচিত্র্য সম্পর্কে আমাদের বোঝাপড়ার সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করতে পারে।
সিলেটকে জানতে হলে সিলেটের ইতিহাস জানতে হবে-
সিলেট শুধু একটি জেলার বা বিভাগের নাম নয়। বাংলাদেশের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, সাহিত্যিক ও সামাজিক ইতিহাসে এই অঞ্চলের একটি স্বতন্ত্র অবস্থান রয়েছে।
এটি হজরত শাহজালাল (রহ.) ও শাহপরান (রহ.)-এর স্মৃতিবিজড়িত পুণ্যভূমি। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তাঁদের স্মৃতি সিলেটের আধ্যাত্মিক পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
আবার এই একই সিলেটের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বৈষ্ণব ধর্মের মহান সাধক ও সংস্কারক শ্রীচৈতন্যদেবের পারিবারিক ইতিহাস। গোলাপগঞ্জের ঢাকাদক্ষিণে তাঁর পৈতৃক ভিটা আজও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের একটি ঐতিহাসিক তীর্থস্থান।
এই একটি বিষয়ই সিলেটের বহুত্ববাদী সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সৌন্দর্য তুলে ধরে।
শাহজালাল-শাহপরানের স্মৃতিবিজড়িত আধ্যাত্মিক ভূমি যেমন সিলেট, তেমনি শ্রীচৈতন্যের ঐতিহ্য বহনকারী তীর্থভূমিও সিলেট।এটাই বাংলাদেশ।
হাসন রাজা থেকে শাহ আবদুল করিম
সিলেটের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের কথা বলতে গেলে মরমি জগতের কথা বাদ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
এই মাটি জন্ম দিয়েছে হাসন রাজাকে। তাঁর দর্শন, গান এবং জীবনবোধ বাংলা লোকসংস্কৃতির অমূল্য সম্পদ।
এই অঞ্চলেরই রাধারমণ দত্ত প্রেম, বিরহ ও আধ্যাত্মিকতার এমন সংগীতভুবন তৈরি করেছেন, যার গান আজও বাংলার মানুষের মুখে মুখে ফেরে।
এই মাটিতেই জন্মেছেন বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিম। গ্রামের সাধারণ মানুষের জীবন, প্রেম, বৈষম্য, সমাজ ও মানবতার কথা তাঁর গানে এমনভাবে এসেছে যে তিনি শুধু সিলেটের নন - সমগ্র বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সম্পদ।
সৈয়দ শাহ নূরের মরমি ও নাগরী সাহিত্য, সৈয়দ মুজতবা আলীর সাহিত্যিক মনন ও বহুভাষিক প্রতিভাও এই বৃহত্তর সিলেটের ঐতিহ্যের অংশ।
জাতীয় নেতৃত্বেও সিলেটের অবদান বিশাল। মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি বঙ্গবীর এম এ জি ওসমানী থেকে শুরু করে সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান ও আবুল মাল আবদুল মুহিত, জাতীয় অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীসহ অসংখ্য মানুষ জাতীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।
তবে এই নামগুলোর তালিকা দেওয়ার উদ্দেশ্য এটা প্রমাণ করা নয় যে এত বিখ্যাত মানুষ জন্মেছেন বলেই সিলেটি ভাষার মর্যাদা আছে।
একজন হাসন রাজা বা সৈয়দ মুজতবা আলী জন্ম না নিলেও একজন সাধারণ সিলেটির মাতৃভাষা সম্মান পাওয়ার অধিকার রাখে।
এসব নাম শুধু আমাদের মনে করিয়ে দেয় - যে জনপদকে নিয়ে আমরা মন্তব্য করছি, তার ইতিহাসটা কত গভীর।
দুই পাতা একটি কুঁড়ির দেশ
সিলেটকে বাংলাদেশের মানুষের কল্পনা থেকে আলাদা করা কঠিন।চোখ বন্ধ করে সিলেট ভাবলে সবুজ টিলা, বৃষ্টিভেজা পথ, হাওরের বিস্তৃতি আর সারি সারি চা-বাগানের ছবি ভেসে ওঠে।
বাংলাদেশের চা-শিল্পের ইতিহাসের সঙ্গে সিলেটের নাম অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সিলেটের মালনীছড়া উপমহাদেশের প্রথম চা-বাগান হিসেবে পরিচিত। আজও বৃহত্তর সিলেট বাংলাদেশের চা-শিল্পের প্রাণকেন্দ্রগুলোর একটি।
তাই সিলেটকে বলা হয় ‘দুই পাতা একটি কুঁড়ির দেশ’।
এর সঙ্গে রয়েছে জাফলং, রাতারগুল, লালাখাল, হাওর, টিলা আর সিলেটের সেই পরিচিত বৃষ্টি।
আর খাবারের কথা উঠলে সাতকরা বাদ যায় কীভাবে?
সাতকরার স্বাদ যেমন সিলেটি রান্নাকে আলাদা পরিচয় দিয়েছে, তেমনি সিলেটি ভাষার নিজস্ব শব্দ, উচ্চারণ আর অভিব্যক্তিও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে আলাদা স্বাদ যোগ করেছে।
একটি অঞ্চলের ভাষা, সংগীত, খাবার, প্রকৃতি ও মানুষের জীবন - সবকিছু মিলিয়েই তার সংস্কৃতি।
ব্রিটেনে সিলেটিদের নিয়ে মন্তব্যটি আমাকে আরও বেশি ভাবিয়েছে
হুমায়রা নূরের বক্তব্যের আরেকটি অংশ আমার কাছে ব্যক্তিগতভাবে আরও বেশি বিস্ময়কর লেগেছে।
কারণ আমি নিজেই ব্রিটেনে প্রায় দেড় যুগ ধরে বসবাস করছি।
আমি জন্মসূত্রে সিলেটি নই। অথচ ব্রিটেনে সিলেটি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যত কাছ থেকে মিশেছি, আমার অভিজ্ঞতা তাঁর বক্তব্যের বিপরীত।
সিলেটের মানুষের মধ্যে আমি যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি দেখেছি, সেটি হলো মায়া।
মানুষকে আপন করে নেওয়ার মায়া।বিপদে পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা।সহযোগিতা করার আন্তরিকতা।
আমি যদি সিলেটি মানুষের এত কাছাকাছি না আসতাম, তাহলে হয়তো কখনো বুঝতেই পারতাম না একজন ভিন্ন অঞ্চলের মানুষকেও তাঁরা কত সহজে নিজেদের একজন করে নিতে পারেন।
আমার শ্বশুরের আদি নিবাস সিলেটে। ফলে সিলেটের বন্ধুবান্ধব ও পরিচিতদের অনেকে আমাকে ভালোবেসে ‘দামান’ বা ‘দুলাভাই’ বলে ডাকেন। কেউ কেউ রসিকতা করে ‘অনারারি সিলেটি’ও বলেন।
সিলেটি ভাষায় দু-চার কথা বলতে পারলে আমি নিজেও খুব আনন্দ পাই।
সিলেটের মানুষ আমাকে তাঁদের ভাষা শিখতে বাধ্য করেননি; তাঁদের সঙ্গে মিশতে মিশতে তাঁদের ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসাই আমাকে সিলেটি ভাষায় কথা বলতে আগ্রহী করেছে।
একজন শিক্ষকের মায়া থেকে আত্মীয়তা
এখানে আমার জীবনের খুব ছোট একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা না বললেই নয়।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমার একজন সিলেটি শিক্ষক আমাকে ছাত্র হিসেবে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। সেই শিক্ষক-ছাত্রের সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে এতটাই আপন হয়ে উঠেছিল যে একসময় তাঁর সঙ্গে আমার আত্মীয়তার সম্পর্ক তৈরি হয় - তাঁর এক ভাতিজিই আজ আমার স্ত্রী।
আমি তাঁর এলাকার মানুষ ছিলাম না।আমি সিলেটিও ছিলাম না।তারপরও একজন শিক্ষক একজন ছাত্রকে কতটা আপন করে নিলে সেই সম্পর্ক একদিন পরিবারের সম্পর্কে রূপ নিতে পারে?
আমার কাছে এটি সিলেটের মানুষের সেই ‘মায়া’রই একটি ব্যক্তিগত স্মৃতি।
‘দামান’ হিসেবে যে ভালোবাসা পেয়েছি
ব্রিটেনে আমার সামাজিক ও কমিউনিটি জীবনের অভিজ্ঞতাও একই কথা বলে।স্কুল ও কলেজের গভর্নর নির্বাচনে যখন আমি প্রার্থী হয়েছি, সিলেটি কমিউনিটির অনেক মানুষ আমাকে তাঁদের ‘দামান’ হিসেবে আপন করে নিয়ে সহযোগিতা করেছেন, সমর্থন করেছেন এবং ভোট দিয়েছেন।
আমি তাঁদের অঞ্চলের মানুষ নই - এটি তাঁদের কাছে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।বরং ‘আমাদের দামান’ বলে যে আন্তরিকতায় তাঁরা পাশে দাঁড়িয়েছেন, সেটি আমার কাছে নির্বাচনী সমর্থনের চেয়েও বড় কিছু।এটি আপন করে নেওয়ার একটি অনুভূতি।
বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শ্বশুরবাড়িও সিলেটে। নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি সিলেটের শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে ডা. জোবাইদা রহমানকে সিলেটের সন্তান উল্লেখ করে নিজেকেও সেখানকার মানুষের আপনজন হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। সিলেটে তাঁকে ‘দুলাভাই’ বলে সম্বোধনের সামাজিক রসিকতাও বহুল পরিচিত।
রাজনীতির সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক টানছি না।বরং কথাটি বলছি একটি সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য বোঝাতে - সিলেটের ‘দামান’কে আপন করে নেওয়ার এই সামাজিক ভাষাটাই বেশ মজার।আমি নিজেও তার ছোট্ট একজন সাক্ষী।কিন্তু আমার অভিজ্ঞতাও চূড়ান্ত সত্য নয়।
এখানে একটি কথা অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে বলা প্রয়োজন।
আমি সিলেটি মানুষের কাছ থেকে ভালোবাসা পেয়েছি বলেই দাবি করব না যে পৃথিবীর প্রতিটি সিলেটি মানুষ একই রকম।সেটিও একটি generalisation হয়ে যাবে।
কোনো non-Sylheti ব্যক্তি ব্রিটেনে কোনো সিলেটির কাছ থেকে খারাপ আচরণ পেয়ে থাকতে পারেন। তাঁর সেই অভিজ্ঞতাকে অস্বীকার করার অধিকার আমার নেই।
কিন্তু আমার ইতিবাচক অভিজ্ঞতা দিয়ে যেমন লাখ লাখ সিলেটির চরিত্র নির্ধারণ করা যায় না, তেমনি কারও নেতিবাচক অভিজ্ঞতা দিয়েও পুরো British-Sylheti community-কে বিচার করা যায় না।এই জায়গাটিই মূল কথা।
একজন মানুষের আচরণের দায় সেই মানুষের। একটি পুরো জনগোষ্ঠীর নয়।
ব্রিটিশ-বাংলাদেশি ইতিহাসেও সিলেটকে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। ব্রিটেনে বাংলাদেশি কমিউনিটির ইতিহাস বলতে গেলে সিলেটিদের বাদ দিয়ে সেই ইতিহাস লেখা প্রায় অসম্ভব।প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সিলেটি জনগোষ্ঠী ব্রিটেনে বসতি গড়েছেন। ব্যবসা, রেস্তোরাঁ শিল্প, কমিউনিটি সংগঠন, স্থানীয় রাজনীতি, দাতব্য কার্যক্রম এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানে তাঁদের দৃশ্যমান উপস্থিতি রয়েছে।ব্রিটেনে থেকেও তাঁরা বাংলাদেশের সঙ্গে পারিবারিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক ধরে রেখেছেন।
এই diaspora-র কারণেই অনেক ব্রিটিশ নাগরিকের কাছে বাংলাদেশের প্রথম পরিচয়ও এসেছে কোনো না কোনো সিলেটি মানুষের মাধ্যমে।তাই British-Sylheti community নিয়ে সমালোচনা করা যাবে না - আমি এমন কথা বলছি না।অবশ্যই যাবে।যেকোনো কমিউনিটির ভেতরে সমস্যা, সংকীর্ণতা কিংবা পরিবর্তনের প্রয়োজন থাকতে পারে এবং তা নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত।
কিন্তু সমালোচনা আর stereotype এক নয়।
রাজনৈতিক নেতার কথার ওজন আলাদা
একজন সাধারণ মানুষ বন্ধুমহলে একটি আঞ্চলিক মন্তব্য করলে সেটিও অনুচিত হতে পারে। কিন্তু জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত একজন ব্যক্তি যখন টেলিভিশনের পর্দায় একটি পুরো অঞ্চলের ভাষা বা জনগোষ্ঠী সম্পর্কে সাধারণীকরণ করেন, তখন কথাটির সামাজিক প্রভাব অনেক বেশি।রাজনীতির দায়িত্ব বিভাজন তৈরি করা নয়।
বাংলাদেশকে তার বৈচিত্র্যসহ ধারণ করা।ঢাকার প্রমিত উচ্চারণই একমাত্র বাংলাদেশ নয়।সিলেটের ভাষাও বাংলাদেশ।চট্টগ্রামের ভাষা বাংলাদেশ।নোয়াখালীর ভাষা বাংলাদেশ।বরিশাল, রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহের কথ্যরীতিও বাংলাদেশ।আমাদের উচ্চারণ আলাদা হতে পারে, খাবার আলাদা হতে পারে, আঞ্চলিক শব্দ আলাদা হতে পারে।কিন্তু এই পার্থক্যগুলো মুছে ফেললেই বাংলাদেশ সুন্দর হবে - এমন নয়।
বরং এই পার্থক্যগুলো নিয়েই বাংলাদেশ এত সুন্দর।
সিলেটকে একটি উচ্চারণ দিয়ে চিনবেন না
সিলেটকে জানতে হলে তার মানুষের মুখের কয়েকটি শব্দ শুনে থেমে গেলে চলবে না।নাগরীর অক্ষরের দিকে তাকাতে হবে।হাসন রাজার দর্শন শুনতে হবে।রাধারমণের সুরে কান দিতে হবে।শাহ আবদুল করিমের গানে মানুষের কথা শুনতে হবে।সৈয়দ মুজতবা আলীর লেখার দিকে তাকাতে হবে।শাহজালাল ও শাহপরানের স্মৃতিবিজড়িত আধ্যাত্মিক ইতিহাস জানতে হবে।শ্রীচৈতন্যের পৈতৃক ভিটার ইতিহাস জানতে হবে।চা-বাগানের সবুজের মধ্যে হাঁটতে হবে, হাওরের দিকে তাকাতে হবে, বৃষ্টিভেজা সিলেট দেখতে হবে।আর সম্ভব হলে সিলেটের মানুষের সঙ্গে কিছুদিন মিশতে হবে।তখন হয়তো বোঝা যাবে - একটি জনপদের পরিচয় তার উচ্চারণের চেয়ে অনেক বড়।
শেষ কথা
অ্যাডভোকেট হুমায়রা নূরের রাজনৈতিক মতাদর্শ কিংবা তাঁর দলের রাজনীতি এই লেখার বিষয় নয়।তাঁর বক্তব্যই আমার আলোচনার বিষয়।আমি তাঁর মন্তব্যের নিন্দা করি, কিন্তু তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করতে চাই না।
বরং তাঁর বক্তব্যটি আমাদের সবার জন্য একটি উপলক্ষ হোক নিজেদের প্রশ্ন করার -আমরা বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষা ও পরিচয়গুলোকে কতটা সম্মান করতে শিখেছি?সিলেটের মানুষকে প্রমাণ করতে হবে না যে তাঁরা ‘শুদ্ধ বাংলা’ বলতে পারেন।যে ভাষার নিজস্ব ঐতিহাসিক নাগরী লিপি রয়েছে, যে জনপদের রয়েছে শতাব্দীব্যাপী সাহিত্য-সংগীতের ঐতিহ্য, সেই ভাষার মর্যাদা কোনো টেলিভিশন টকশোর মন্তব্যে তৈরি হয়নি - আবার সেই মন্তব্যে নষ্টও হবে না।
আমি সিলেটি নই।কিন্তু প্রায় দেড় যুগ ধরে ব্রিটেনে সিলেটি মানুষের সঙ্গে মিশে তাঁদের কাছ থেকে যে মায়া পেয়েছি, তার কারণে সিলেট আমার কাছে আর শুধু বাংলাদেশের একটি অঞ্চল নয়।আমার শ্বশুরবাড়ির ভূমি বলে নয়।দামান বা ‘দুলাভাই’ বলে তাঁরা আমাকে ডাকেন বলেও নয়।বরং মানুষকে আপন করে নেওয়ার যে অসংখ্য ছোট ছোট অভিজ্ঞতা তাঁদের কাছ থেকে পেয়েছি, সেই কারণেই।কারণ ভাষা শুধু ব্যাকরণ নয়।ভাষা স্মৃতি, ভাষা পরিচয়, ভাষা সংস্কৃতি, ভাষা মানুষের আবেগ।সিলেটের ভাষাকে ‘শুদ্ধ’ করার প্রয়োজন নেই।প্রয়োজন আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও শুদ্ধ করার।