সারা বিশ্ব

শিনজো আবেকে হত্যার দায়ে তেতসুয়া ইয়ামাগামির যাবজ্জীবন কারাদন্ড

13737_IMG_0961.jpeg

স্বামীর আত্মহত্যার পর এক ছেলে গুরুতর অসুস্থ হন। পরিবারের এমন দুর্দিন কাটাতে নিয়মিত চার্চে দান করা শুরু করেন জাপানের এক নারী। এক সময় পরিবারটি দেউলিয়া হয়। বিষয়টি জনসম্মুখে আনতে বিপজ্জনক এক সিদ্ধান্ত নিয়ে বসেন ওই নারীর আরেক ছেলে। গুলি করেন জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে। 

জাপানের ওই সাবেক প্রধানমন্ত্রীর নাম শিনজো আবে। ২০২২ সালের জুলাইয়ে নির্বাচনী প্রচারের সময় তাঁকে হাতে তৈরি বন্দুক গিয়ে গুলি করেন তেতসুয়া ইয়ামাগামি নামে এক তরুণ। ঘটনার তিন বছর পর বুধবার ইয়ামাগামিকে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।

বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আদালতে আইনজীবীর দেওয়া বয়ান তুলে ধরা হয়েছে। বিচার চলাকালে গত বছরের অক্টোবরে আদালতকে এক আইনজীবী জানান, ইয়ামাগামি ভেবেছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী আবের মতো প্রভাবশালী কাউকে হত্যা করলে তিনি চার্চের দিকে জনসাধারণের দৃষ্টি ফেরাতে পারবেন। 

আবে হত্যাকাণ্ডের পর জাপানে একটি গোপন ধর্মীয় গোষ্ঠীর ‘ইউনিফিকেশন চার্চ’ -এর সঙ্গে রাজনীতিবিদদের যোগাযোগের বিষয় সামনে আসে। ইয়ামাগামির পরিবার এই চার্চে দান করে দেউলিয়া হয়েছিল।

ইউনিফিকেশন চার্চ কী
বার্তা সংস্থা এপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোরীয় যুদ্ধের পর ১৯৫৪ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় চার্চটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন প্রয়াত সান মিয়ং মুন। তিনি নিজেকে ঈশ্বর কর্তৃক মনোনীত ব্যক্তি বলে দাবি করতেন। পাশাপাশি বাইবেলের নতুন ব্যাখ্যা দিয়ে পরিবারকেন্দ্রিক মূল্যবোধ প্রচার করেন।

চার্চটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের নাম দেয় ‘ফ্যামিলি ফেডারেশন ফর ওয়ার্ল্ড পিস অ্যান্ড ইউনিফিকেশন’। এটি বেশি পরিচিতি পায় গণবিবাহ অনুষ্ঠানের জন্য। বলা হয়, বিশ্বজুড়ে সংগঠনটির সদস্য সংখ্যা কয়েক লাখ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সদস্য জাপানের নাগরিক।

১৯৭০ ও ১৯৮০- এর দশকে চার্চটির বিরুদ্ধে প্রতারণার মাধ্যমে সদস্য সংগ্রহ এবং অনুসারীদের ‘ব্রেনওয়াশ’ করে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। চার্চটি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে তখন বলেছিল, নতুন অনেক ধর্মীয় আন্দোলনই শুরুর দিকে এ ধরনের অভিযোগের মুখে পড়ে।

চার্চে দানের জন্য উৎসাহ দিতে জাপানি অনুসারীদেরকে ঔপনিবেশিক শাসনের কথা বলা হয়। ১৯১০-১৯৪৫ সালে কোরীয় উপদ্বীপ জাপানের উপনিবেশ ছিল। অনুসারীদের বলা হয়, ওই সময় জাপানের পূর্বপুরুষরা পাপ করেছেন। সে পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে চাইলে চার্চে অর্থ দান করতে হবে। বিশ্লেষকদের ধারণা, চার্চটির বৈশ্বিক অর্থায়নের সিংহভাগই সংগ্রহ হতো জাপান থেকে।

শিনজো আবেকে হত্যার কারণ
এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, আদালতে আইনজীবীরা বলেছেন, ইয়ামাগামি শৈশব থেকে ‘ধর্মীয় নির্যাতনের’ শিকার হন। এটি শুরু হয়েছিল চার্চের প্রতি তাঁর মায়ের অন্ধ বিশ্বাসের কারণে। আদালতে দেওয়া বয়ান অনুযায়ী, ইয়ামাগামির বাবা আত্মহত্যার পর তাঁর মা গভীর হতাশায় পড়েন। আরেক ছেলেও গুরুতর অসুস্থ হন। এ অবস্থায় পরিবারকে ‘রক্ষা’ করার আশায় নিজের সব সম্পদ চার্চে দান করেন ইয়ামাগামির মা। শেষ পর্যন্ত মোট অনুদানের পরিমাণ ছিল প্রায় ১০ কোটি ইয়েন (তৎকালীন হিসাবে প্রায় ১০ লাখ ডলার)।

পরিবার দেউলিয়া হওয়ায় ইয়ামাগামিকে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন বাদ দিতে হয়। ২০০৫ সালে তিনি নিজে আত্মহত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। কিন্তু তাঁর অসুস্থ ভাই আত্মহত্যা করেন। এর বেশ কয়েক বছর পর ২০২০ সালে ইয়ামাগামি অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। নিজেই একটি আগ্নেয়াস্ত্র বানাতে শুরু করেন। বানানো শেষ হলে প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকায় গিয়ে সেটির পরীক্ষা চালান। 

২০২২ সালের ৮ জুলাই জাপানের পশ্চিমাঞ্চলের শহর নারা’তে নির্বাচনী প্রচারের জন্য যান শিনজো আবে। তিনি বক্তব্য দেওয়ার সময় হঠাৎ গুলিবিদ্ধ হন। সেদিনই ঘটনাস্থল থেকে আটক হন ইয়ামাগামি।

আবে হত্যাকাণ্ডের পর তদন্ত শুরু হলে একের পর এক ইউনিফিকেশন চার্চ ও এর সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) একাধিক নেতার ঘনিষ্ঠতার কথা সামনে আসে। এর জেরে চারজন মন্ত্রী পদত্যাগ করেন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে গত বছরের অক্টোবরে বিচার কাজ শুরু হয়। তখন আবেকে হত্যার দায় স্বীকার করেন ইয়ামাগামি। তবে অন্য কয়েকটি অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।

বুধবার রায় ঘোষণার সময় বিচারক শিনিচি তানাকা বলেন, বর্তমানে ৪৫ বছর বয়সী ইয়ামাগামি সাবেক প্রধানমন্ত্রী আবেকে গুলি করার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। নির্বাচনী প্রচারের সময় পেছন থেকে আবেকে গুলি করা হয়েছিল।

শিনজো আবে পরপর তিন মেয়াদে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। সবশেষ মেয়াদ ছিল ২০১৭ সালের নভেম্বর থেকে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।

সর্বাধিক পঠিত


ভিডিও