
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা টিম কুক কয়েক বছর আগে একটি গোপন সরকারি ব্রিফিংয়ে সম্ভাব্য বৈশ্বিক সংঘাতের বিষয়ে সতর্কবার্তা পেয়েছিলেন বলে জানা গেছে। ২০২৩ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার সিলিকন ভ্যালির একটি নিরাপদ কক্ষে এই ব্রিফিং অনুষ্ঠিত হয়েছিল বলে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
সেই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা প্রযুক্তি শিল্পের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে অবহিত করেন। উপস্থিতদের মধ্যে ছিলেন এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং এবং অ্যাডভান্সড মাইক্রো ডিভাইসেসের প্রধান লিসা সু। কোয়ালকমের প্রধান নির্বাহী ক্রিশ্চিয়ানো আমন ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বৈঠকে অংশ নেন। বৈঠকে ব্রিফিং দেন সিআইএ পরিচালক উইলিয়াম জে. বার্নস এবং যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক অ্যাভ্রিল হেইন্স।
ব্রিফিংয়ে মূল আলোচ্য বিষয় ছিল চীনের সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য উত্তেজনা। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর প্রধানদের সতর্ক করে বলেন, পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হলে ২০২৭ সালের মধ্যে চীন তাইওয়ানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে।
এই সতর্কবার্তার পেছনে অন্যতম কারণ হলো বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহে তাইওয়ানের বিশাল ভূমিকা। বিশ্বের প্রায় ৯৭ শতাংশ উন্নতমানের চিপ তাইওয়ানে উৎপাদিত হয়। ফলে দ্বীপটি অবরুদ্ধ হলে বা উৎপাদন ব্যাহত হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের এক আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট বলেন, বিশ্বের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো উন্নতমানের অধিকাংশ চিপ তাইওয়ানে তৈরি হয়। যদি দ্বীপটি অবরুদ্ধ হয় বা উৎপাদন ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে তা হবে এক বিশাল অর্থনৈতিক বিপর্যয়।
সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের ২০২২ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাইওয়ান থেকে চিপ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে তা গ্রেট ডিপ্রেশনের পর সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উৎপাদন প্রায় ১১ শতাংশ কমে যেতে পারে, যা ২০০৮ সালের বৈশ্বিক মন্দার চেয়েও বড় ধাক্কা হবে। একই পরিস্থিতিতে চীনের অর্থনীতিতেও প্রায় ১৬ শতাংশ পতন ঘটতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, অধিকাংশ প্রযুক্তি কোম্পানির কাছে মাত্র কয়েক মাসের সেমিকন্ডাক্টর মজুত থাকে। সরবরাহ বন্ধ হলে অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের উৎপাদন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে দেশেই সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। তবে এতে বৈশ্বিক উৎপাদনের মাত্র প্রায় ১০ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এর আগে ২০২১ সালে মার্কিন সিনেটের আর্মড সার্ভিসেস কমিটির সামনে বক্তব্য দিতে গিয়ে মার্কিন নৌবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা অ্যাডমিরাল ফিলিপ এস. ডেভিডসন সতর্ক করে বলেছিলেন, এই দশকের মধ্যেই তাইওয়ান ঘিরে উত্তেজনা তীব্র হতে পারে এবং ২০২৭ সালের মধ্যেই চীন সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে তাইওয়ান নির্ভরতা কমানোর আহ্বান জানানো হলেও অনেক প্রতিষ্ঠান এখনো সেখানে উৎপাদনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ চিপ নির্মাতা তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্রে নতুন কারখানা নির্মাণে বড় বিনিয়োগ করছে। তবে এসব কারখানার প্রযুক্তি এখনো তাইওয়ানের সর্বাধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তির তুলনায় এক ধাপ পিছিয়ে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তাইওয়ানের উন্নত চিপ উৎপাদন ব্যবস্থা বর্তমানে একটি “সিলিকন শিল্ড” হিসেবে কাজ করছে। এই প্রযুক্তিগত গুরুত্বই দ্বীপটিকে সামরিক সংঘাত থেকে কিছুটা সুরক্ষা দিয়ে রেখেছে। তবে বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলে গেলে এই সুরক্ষা কতদিন টিকবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।