সারা বিশ্ব

এপস্টেইনের অপকর্ম নিয়ে মিলল নতুন চাঞ্চল্যকর তথ্য

15189_IMG_1372.jpeg

বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী যৌন অপরাধী ও অর্থদাতা জেফরি এপস্টেইনের অপকর্ম নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। জানা গেছে, যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনের অভিজাত এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে নারী পাচার ও নির্যাতন কার্যক্রম চালিয়েছিলেন এপস্টেইন।

বিবিসির এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ব্রিটিশ পুলিশের নজরদারির দাবি সত্ত্বেও বছরের পর বছর ধরে কেনসিংটন এবং চেলসির মতো এলাকায় নারী ও তরুণীদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছেন এই মার্কিন ধনকুবের।

এমনকি ২০১৫ সালে তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ওঠার পরও সেখানকার পুলিশ তদন্ত না করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তার পরবর্তী সময়েও এপস্টেইন নির্বিঘ্নে এসব ফ্ল্যাটে ভুক্তভোগীদের নিয়ে যাতায়াত করেছিলেন।

অনুসন্ধানে প্রাপ্ত এপস্টাইন ফাইলসের রশিদ, ইমেইল ও ব্যাংক রেকর্ড বিশ্লেষণ করে চারটি বিশেষ ফ্ল্যাটের সন্ধান পেয়েছে বিবিসি। এসব ফ্ল্যাটে অবস্থান করা নারীদের মধ্যে অন্তত ছয়জন ইতোমধ্যে এপস্টেইনের হাতে নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন।

ভুক্তভোগীদের বড় একটি অংশ রাশিয়া, পূর্ব ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক। এপস্টেইনের অপকর্মের অন্যতম প্রধান ভুক্তভোগী ভার্জিনিয়া জিউফ্রে ২০১৫ সালে যখন লন্ডনে পাচার হওয়ার অভিযোগ করেছিলেন, মেট্রোপলিটন পুলিশ তখন বিষয়টি তদন্ত না করার সিদ্ধান্ত নেয়, ঠিক তারপরেই এই ৬ নারীকে লন্ডনে নেওয়া হয়েছিল।

যদিও লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশের দাবি, তারা সেই সময়ে তদন্তের যুক্তিসঙ্গত পথ অনুসরণ করেছিল। জিউফ্রের অভিযোগের পর তারা কয়েক দফায় তার সাক্ষাৎকার নেয় এবং মার্কিন তদন্তকারীদের সঙ্গে সহযোগিতা করে।

ফাইলগুলোতে থাকা ইমেইল অনুসারে, নথিপত্র অনুযায়ী, এপস্টেইন কেবল তাদের নির্যাতনই করতেন না, বরং লন্ডনের ফ্ল্যাটে থাকা কিছু নারীকে তার চক্রের জন্য নতুন নারী সংগ্রহ ও নিয়োগ দিতে বাধ্য করতেন। তাদের নিয়মিত ইউরোস্টার ট্রেনের মাধ্যমে প্যারিসে তার সঙ্গে দেখা করতে পাঠানো হতো।

২০১৯ সালে গ্রেপ্তার হওয়ার আগ পর্যন্ত এপস্টেইন অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে এই নেটওয়ার্ক পরিচালনা করেছেন। নারীদের যুক্তরাজ্যে আনা-নেওয়ার জন্য ইউরোস্টার ব্যবহার করতেন। জীবনের শেষ কয়েক বছরে তরুণীদের জন্য তার ট্রেনের টিকিট কেনার পরিমাণ বেড়েছিল।

বিবিসির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ২০১১ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে এপস্টেইন ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের মধ্যে নারীদের যাতায়াতের জন্য অন্তত ৫৩টি টিকিট কিনেছিলেন, যার অধিকাংশ ছিল ২৫ বছরের কম বয়সী তরুণীদের জন্য। অনেক ক্ষেত্রে তিনি ২৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য ইউরোস্টারের ‘ইউথ ফেয়ার’ বা কম ভাড়ার সুবিধা নিতেন।

আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, ব্রিটিশ পুলিশ বারবার দাবি করেছে, তারা তদন্তের যুক্তিসঙ্গত পথ অনুসরণ করেছে, কিন্তু বাস্তবে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। ২০২০ সালেও এক নারী লন্ডনে নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছিলেন।

তবে সেই অভিযোগের ভিত্তিতে পরবর্তীতে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না তা জানতে পারেনি বিবিসি। তবে একটি নথি অনুযায়ী বিবিসি জানিয়েছে, ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ ২০২০ সালেই জানতো—এপস্টেইন লন্ডনে অন্তত একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছিলেন।

মানবাধিকার আইনজীবী ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা পুলিশের এই উদাসীনতাকে নজিরবিহীন বলে অভিহিত করেছেন। হিউম্যান রাইটস আইনজীবী টেসা গ্রেগরি বিস্ময় প্রকাশ করে জানিয়েছেন, মানবপাচারের মতো গুরুতর ও নির্ভরযোগ্য অভিযোগ থাকার পরও রাষ্ট্রের আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল দ্রুত তদন্ত শুরু করা।

যুক্তরাজ্যের প্রথম স্বতন্ত্র দাসত্ববিরোধী কমিশনার কেভিন হিল্যান্ড সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কার সিদ্ধান্তে এই তদন্ত বন্ধ রাখা হয়েছিল। তিনি মনে করেন, লন্ডনের ফ্ল্যাটগুলোতে নারীদের রাখা এবং যাতায়াতের প্রমাণ একটি অপরাধী চক্র শনাক্ত করার জন্য যথেষ্টর চেয়েও বেশি ছিল।

এপস্টেইন গ্রেপ্তার হওয়ার কয়েক মাস আগেও লন্ডনে অবস্থানরত এক রুশ তরুণীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। নথিতে দেখা যায়, তিনি নিজেকে ওই নারীর ‘বাড়িওয়ালা’ হিসেবে পরিচয় দিতেন।

এপস্টেইন লন্ডনের একটি ফ্ল্যাটে থাকা ওই রুশ তরুণীর সঙ্গে স্কাইপিতে মেসেজ আদান-প্রদান করেছিলেন। এপস্টেইন তাকে একটি ছবি পাঠিয়েছিলেন এবং নিজেকে তার ‘বাড়িওয়ালা’ হিসেবে পরিচয় দেন। তবে তিনি রসিকতা করে বলেন, সাধারণ বাড়িওয়ালারা ভাড়া নিলেও তিনি উল্টো ভাড়া দিয়ে দেন।

পরবর্তীতে ওই নারী এপস্টেইনের কাছে লন্ডনে ইংরেজি শেখার ক্লাসের খরচ এবং আসবাবপত্র কেনার জন্য টাকা চেয়েছিলেন। এছাড়াও তিনি অন্য এক রুশ নারীর ভিসার বিষয়েও পরামর্শ চেয়েছিলেন।

২০১৯ সালের এই কথোপকথন থেকে বোঝা যায়, এপস্টেইন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত লন্ডনে থাকা নারীদের সঙ্গে কতটা নিবিড় যোগাযোগ রাখতেন এবং তাদের জীবনের খুঁটিনাটি বিষয়েও জড়িত ছিলেন।

মেট্রোপলিটন পুলিশ ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদের বাধ্যবাধকতা পালনের দাবি করলেও সমালোচকদের মতে, প্রভাবশালী ও ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের জড়িত থাকার আশঙ্কায় পুলিশ হয়তো এই বিশাল অপকর্মের দিকে চোখ বন্ধ করে ছিল।

সেন্টার ফর উইমেন’স জাস্টিস-এর প্রতিষ্ঠাতা হ্যারিয়েট উইস্ট্রিচ বলেন, ‘এপস্টেইনের এমন কর্মকাণ্ড ইঙ্গিত দেয়—ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পুলিশের মধ্যে এক ধরনের ‘‘ভয়’’ কাজ করছিল।’

সব মিলিয়ে, লন্ডনকে কেন্দ্র করে এপস্টেইনের যে গোপন অপরাধ জগৎ বিস্তৃত ছিল, তা ব্রিটিশ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা ও সদিচ্ছাকেই এখন বড়সড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

সর্বাধিক পঠিত


ভিডিও